শনিবার | মে ১৫, ২০২১ | ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

বাখ আর ইএফটি আতঙ্ক

ড. এম এ মোমেন

জার্মান সুরসম্রাট সেবাস্টিয়ান বাখের কথা আমরা অনেকেই জানি। জন্ম ১৬৮৫, মৃত্যু ১৭৫০ সালে। তার বিষণ্ন পিয়ানোর সুর আর বিষণ্ন ক্ল্যাসিক্যাল ঘণ্টার (+) বাদন ইউটিউবে যেকোনো সময়েই শুনতে পাওয়া যাবে। ১৭৫০ সালে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। তার চিকিৎসা করেন খ্যাতিমান ব্রিটিশ চিকিৎসক জন টেয়লর (১৭০৩-৭২) চোখে কিছু কাটাছেঁড়া করেন, জটিলতায় তার মৃত্যু হয়। জার্মান সুরস্রষ্টা হ্যান্ডেলের চিকিৎসকও জন টেয়লর, চিকিৎসা জটিলতায় তার মৃত্যু হয়। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, জন টেয়লর ছিলেন একজন হাতুড়ে ডাক্তার। তার পাল্লায় পড়ে অন্তত ১০০ বিখ্যাত ব্যক্তিসহ প্রায় এক হাজার রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। বাখ আতঙ্ক নয়, আতঙ্কের নাম জন টেয়লর।

বাংলাদেশেও বাখ আছে, জন টেয়লরের না থাকার কারণ নেই। বিপাকে পড়ে করোনাক্রান্ত লকডাউনের দিনে বাংলাদেশী বাখের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। বাখ সংক্ষেপে, পুরোটা বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ (বিএসিএইচ) দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক সিস্টেমের অপারেটর। বাখ দুটো পদ্ধতির সমন্বয়একটি হচ্ছে এসিপিএস (অটোমেটেড চেক প্রসেসিং সিস্টেম), অন্যটি ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার)

১৯৮৮ সালের একেবারে শুরুর দিকে মাঠ থেকে বদলি হয়ে সচিবালয়ে চাকরি করতে এলাম। মাসের বেতনের চেক পাওয়ার আগেই সচিবালয়ের দেয়ালঘেঁষা সোনালী ব্যাংকের (এখন রমনা করপোরেট শাখা নাম) সহকারী মহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে সচিবালয়েই সাক্ষাৎ। তিনিই বললেন, দূরত্ব বিবেচনায় আমিই আপনার কাছে (দ্বিতীয় নিকটবর্তীটি প্রেস ক্লাবে অগ্রণী ব্যাংক) সুতরাং আপনার অ্যাকাউন্ট এখানেই হতে হবে। সে সময় কেবল বেতনজীবী চাকুরেরাও ব্যাংকারদের কাছে গুরুত্ব পেতেন। কালে অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন চাকুরে মানি লন্ডাররা। ব্যবসায়ীরা ব্যাংকারের কাছে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। সেই থেকে আমার সঞ্চয়ী হিসাবটি এখনো সচল আছে। আমার বাসার ২৫০ মিটারের মধ্যে একটি ব্যাংক এবং আড়াই হাজার মিটারের মধ্যে একটি সোনালী ব্যাংকের ব্রাঞ্চ থাকার পরও ১১ কিলোমিটার দূরের সেই ব্রাঞ্চটিতেই এখনো আসা-যাওয়া অব্যাহত রেখেছি।

মাস্ক পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সর্বশেষ সেখানে যাই বাংলা নববর্ষের আগের দিন ১৩ এপ্রিল। সহধর্মিণীর সূত্রে পাওয়া একটি চেক জমা দিই বেলা ১১টার দিকে। অভ্যাসবশত পল্টনের পুরনো বইয়ের দোকান ঘুরে বাড়ি ফিরি। ৩টা মিনিটে সোনালী ব্যাংকের খুদে বার্তা পাই যে আমার জমা দেয়া চেকের টাকা আমার অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে (ব্যাংকের ভাষায় ক্রেডিটেড) এবং সংগত কারণে তা পূর্বস্থিতির সঙ্গেও যোগ হয়েছে। আমিও আশ্বস্ত হয়ে চেকদাতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিই। পরদিন দেশজুড়ে পালিত হয় ঘরে থাকার নববর্ষবৈশাখের প্রথম দিন। আমি ব্যাংকের শেষ বার্তাটির দিকে চোখ মেলি, এটাই আমার হালখাতা। শুভ হোক আমার ১৪২৮ বঙ্গাব্দ।

১৪২৮ বঙ্গাব্দের প্রথম কর্মদিবস বৈশাখ ইংরেজির ১৫ এপ্রিল  বেলা ১১টা ১৪ মিনিটে মাথায় বাজ পড়ার চেয়েও ভয়ংকর একটি বার্তা পাঠায় সেই সোনালী ব্যাংক। নববর্ষের শুভকামনা নয়, করোনামুক্ত থাকার প্রার্থনা নয়। বার্তায় সাফ সাফ বলে দেয় আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে বেশকিছু টাকা (আমার জন্য বেশকিছু, অর্থ ব্যবস্থাপকদের জন্য চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকাও পিনাট) ওঠানো হয়েছে (ব্যাংকের ভাষায় ডেবিটেড), তাতে আমার স্থিতি নেমে আগের জায়গায় চলে এসেছে। ব্যাংক ফ্রড কাহিনীর সঙ্গে আমিও অপরিচিত নই, সবার আগে চেক করলাম চেক বইটা ঠিকঠাক আছে তো?

আশ্বস্ত হই, ঠিকই আছে। কিন্তু টাকাটা কে তুলে নিল! সীমিত অর্থের মানুষ বলেই হয়তো হূত্কম্পন বেড়ে গেল; পর্যায়টি এমনই ক্রিটিক্যাল যে হার্ট অ্যাটাকও অসম্ভব নয়। যে নম্বর থেকে সোনালী ব্যাংক বার্তা পাঠিয়েছে, সেই নম্বরে পুনর্বার্তা পাঠাতে চেষ্টা করিকে তুলেছে আমার টাকা? আমি তো কাউকে কোনো চেক দিইনি কিংবা টাকা তুলতে নিজেও আসিনি। কিন্তু ফেরত বার্তা এলফেইলড টু ডেলিভার ইউর মেসেজ। তার মানে এটা ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক। তারপর ব্যাংকের ফোন নম্বরে প্রবেশ করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। তারপর ব্যাংকের করপোরেট -মেইলে আমার দুর্ভাগ্যের কাহিনী লিখে পোস্ট করলাম। কঠোর লকডাউন চলছে, যাব যে তারও উপায় নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কোনো জবাব নেই, পরে বুঝলাম এটাও সম্ভবত ওয়ানওয়ে ট্রাফিক কিংবা বোথওয়ে হলে কেবল হলমার্ক জাতীয় কাস্টমাররাই সাড়া পেয়ে থাকেন।

আমার সর্বশেষ সুপরিচিত সোনালী ব্যাংকের এমডি আমিনুর রহমান খান এখন নেই। এখন কে আছেন নামও জানা নেই যে প্রতিকার চাইব। মরিয়া হয়ে ভাবলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের সাক্ষাত্প্রার্থী হব। যদি তারা সহায়তা করেন।

অতঃপর ঘটনাচক্রে সোনালী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে বললাম, আমি খুবই উদ্বিগ্ন অবস্থায় আছি, আমাদের কী করণীয়, যদি সঠিক পরামর্শটি দেন তাহলে উপকৃত হতাম। বিকাল ৫টা ৩২ মিনিটে তিনি আমাকে কলব্যাক করে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। বুঝেই হোক না বুঝেই হোক, আমার হত্কম্পন কিছুটা কমে এল।

আমার অপেক্ষা নিশ্চয়ই বাংলাদেশ ব্যাংকেরসিস্টেম রেস্টোরডহবে, আমার টাকাটা আমার অ্যাকাউন্টে পুনঃপ্রবেশ করবে। তারপর নির্বাক কেটে গেল ১৬ এপ্রিল। খবরের কাগজে সেন্ট্রাল ব্যাংকের সিস্টেম বিপর্যয়ের কথা পড়েছি। পেরিয়ে গেল আরো একটি দিন ১৭ এপ্রিল। আমি বিস্মিত, কোনো সাড়া নেই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই দিনু ডাক হরকরার আমলে ফিরে গেলাম নাকি? ঝুঁকি সে আমলেও ছিল, সেটি ডাকাতের। আমলে ঘরের বাইরের হ্যাকারের।

১৮ এপ্রিল বেলা ৩টা ৩৮ মিনিটে আশ্বস্ত হলাম সোনালী ব্যাংকের বার্তা পেয়েআমার টাকা ফিরে এসেছে এবং আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে।

প্রায় ছয়দিন দেশের ব্যাংকিং সিস্টেম ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। এজন্য কেউ দুঃখ প্রকাশের প্রয়োজনও বোধ করলেন না?

সৌভাগ্যবশত, বর্ণিত সময়ের মধ্যে আমার টাকা কোথাও পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল না যে টাকা দিতে না পারলে সম্পদ নিলামে উঠবে কিংবা জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু যাদের বাধ্যবাধকতা ছিল এবং যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য কী প্রতিকার রাখা হয়েছে? আমরা যে তোতাবুলির ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে যাচ্ছি। এটার মানে বহুগুণ বেশি দামে সরকারের কাছে ল্যাপটপ গছিয়ে দেয়া নয়। আমি ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থজগতের ভেতরের কেউ নই। আমি হূদযন্ত্রের ওপর যে চাপ অনুভব করেছি, আঁচ করতে পারি বড় অংকের অর্থের লেনদেনকারীদের জন্য সংকটটি কতটা ভয়াবহ ছিল।

হতে পারে সংকটের ধরনটি ব্যাংকিং পেশাজীবী নই বলে আমি হয়তো বুঝতেই পারিনি। কিন্তু ১৫ এপ্রিল ঘণ্টারও অধিক সময় যে দুঃসহ চাপ আমার হূদযন্ত্রের ওপর পড়েছে, সেটা তো পুরোটাই আমাকে সইতে হয়েছে। এটা কি এড়ানো যেত না? অবশ্যই যেত। শুধু বার্তাটির সঙ্গে একটি বা দুটি শব্দ যোগ করলেই হতো—‘অনিবার্য প্রযুক্তিগত কারণেযোগ করলেই গ্রাহকের হার্ট অ্যাটাকের যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি হতো না। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে সিস্টেম অপারেটর পর্যন্ত কারো চিন্তায় কি বিষয়টি প্রবেশ করেনি? কেবল সোনালী নয়, দেশের সব সরকারি বেসরকারি ব্যাংককে একই সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছে।

দেরিতে হলেও আমাকে যিনি চেক দিয়েছেন, তার ব্যাংক (ঘটনাক্রমে সেটি সরকারি নয়) তাকে বার্তা দিয়েছে যে বাখ সিস্টেমের কারণে তার চেকটি বাতিল হয়েছে। তিনি যেন চেকের উপকারভোগীকে পুনরায় তা উপস্থাপন করতে অনুরোধ জানান। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে বেনিফিশিয়ারি সরকারি ব্যাংক গ্রাহককে ধরনের একটি বার্তা দেয়ার কথা চিন্তাই করল না।

ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের আচরণ কী হবে ব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে তার উল্লেখ থাকতে হবে।

বাখ সিস্টেমের ত্রুটির কারণে আমার আর্থিক ভোগান্তি কম হলেও মানসিক ভোগান্তি হয়েছে ভয়ংকর। এজন্য কি ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কারোর কাছ থেকে আমরা দুঃখিত এমন একটি সামান্য বার্তাও আমি প্রত্যাশা করতে পারি না? ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটির ইতিহাস খুব পুরনো নয়, ১৯৭৮ সালের ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার অ্যাক্ট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এর যাত্রা। বাংলাদেশকে সাধুবাদ যে আমরাও প্রযুক্তির ভাগীদার হতে পেরেছি। ইএফটি কার্যপরিধি অনেক বড়। প্রযুক্তিনির্ভর জটিলতা মাথায় রেখেই মেরামতের প্রস্তুতিসহ এগোতে হবে। স্বল্পমেয়াদের সংকট গ্রাহক মেনে নেন, যদি গ্রাহককে সংকটের ধরনটা জানানো হয়। আমি ধরে নিচ্ছি, এবারের বাখ ইএফটি ফেইলিউর বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলভুক্ত সব ব্যাংককে একটি ওয়েকআপ কল দিয়ে যাবে।

 

. এম মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন