শুক্রবার | মে ০৭, ২০২১ | ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

শেষ পাতা

রফতানিমুখী পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্প

কভিডে কর্মচ্যুতদের নগদ সহায়তার অর্থছাড় ১ শতাংশেরও কম

বদরুল আলম

কভিড-১৯-এর প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বিপুল পরিমাণ শ্রমিক। তাদের আপত্কালে সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি উদ্যোগে হাত বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। নীতিমালার আওতায় সমন্বিত ওই কর্মসূচিতে তহবিল রয়েছে হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। এখন পর্যন্ত তহবিলের অর্থছাড়ের হার দশমিক শতাংশ।

২০২০ সালের মার্চে বাংলাদেশে প্রথম কভিড-১৯-এর সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর সাধারণ ছুটির নামে অঘোষিত লকডাউনে অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এপ্রিল থেকে জুন সময়ে কার্যাদেশের অভাবে অনেক কারখানা সাময়িক স্থায়ী বন্ধ হয়ে যায়। কর্মচ্যুত হন অনেক শ্রমিক। একদিকে করোনা অন্যদিকে বেকারত্ব, জীবন জীবিকার টানাপড়েনে বিপর্যস্ত শ্রমিকদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে আগ্রহী হন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের পক্ষে গত বছরের অক্টোবর একটি নীতিমালা জারি করে শ্রম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। রফতানিমুখী পোশাক, চামড়াজাত পণ্য পাদুকা শিল্পের শ্রমিকদের মাসে সর্বোচ্চ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়া হবে, এমন বিধান রেখে জারি হয় নীতিমালা। রফতানিমুখী তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য পাদুকা শিল্পের কর্মহীন হয়ে পড়া দুস্থ শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২০ শীর্ষক ওই নীতিমালাটি অবিলম্বে কার্যকরের ঘোষণাও দেয়া হয়।

নীতিমালায় বলা হয়, কার্যক্রমের আওতায় নির্বাচিত প্রত্যেক শ্রমিককে মাসিক হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়া হবে। একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ তিন মাস নগদ সহায়তা পেতে পারেন। তবে নির্বাচিত শ্রমিক তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পূর্বতন কারখানায় বা অন্য কোথাও নতুন কর্মে নিযুক্ত হলে ওই মাস থেকে আর নগদ সহায়তা প্রাপ্য হবেন না। কর্মসূচিতে অর্থায়নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জার্মান সরকারের পাশাপাশি অংশ নেয় বাংলাদেশ সরকার।

গত মাসে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: মুভিং ফরোয়ার্ড কানেক্টিভিটি অ্যান্ড লজিস্টিকস টু স্ট্রেনদেন কম্পিটিটিভনেস শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কভিড-১৯-এর রেসপন্স কর্মসূচি অর্থছাড়ের পরিমাণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থসহায়তার প্রায় দুই ডজন কর্মসূচির পাশাপাশি পোশাক এবং চামড়া চামড়াজাত পণ্য খাতে কর্মহীনদের সহায়তার অর্থছাড়ের বিশ্লেষণও উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোশাক এবং চামড়া চামড়াজাত পণ্য খাতে কর্মহীনদের সহায়তার পরিমাণ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ডলারে যার পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে ২৩ কোটি ৫০ লাখ। ছাড়ের ক্ষেত্রে উল্লেখ রয়েছে দশমিক শতাংশ।

প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গতকাল শ্রম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল লতিফ খান এনডিসি বণিক বার্তাকে বলেন, কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত হাজার ৩১ জন শ্রমিককে সহায়তা দেয়া গেছে। টাকা আছে। ধারাবাহিকভাবে দেয়া হবে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। বেকার হলেই শ্রমিকরা টাকা পাবেন। 

সূত্র জানিয়েছে, কর্মসূচিটির আওতায় এখন পর্যন্ত হাজার ৩১ জন শ্রমিককে কোটি ৪৮ লাখ টাকা সহায়তা দেয়া হয়েছে। আবেদন জমা পরেছিল সাড়ে ১২ হাজার। আবেদনে নাম থাকা অনেক শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল ছিল। ধরনের ভুলত্রুটি সংশোধনে কয়েক দফায় যাচাই-বাছাই হয়। সর্বশেষ হাজার ৩১ জন চূড়ান্ত হন সহায়তার জন্য। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর তিন মাস হাজার ৩১ জন কর্মহীন ছিলেন নিশ্চিত হয়ে তাদের সহায়তা দেয়া হয়েছে।

হাজার ৩১ জনের মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানার। বাকিরা পোশাক খাতের আরেক সংগঠন বিকেএমইএর সদস্য এবং চামড়া চামড়াজাত পণ্য খাতের সংগঠন এলএফএমইএবির সদস্য কারখানার শ্রমিক।

অর্থছাড়ের পরিমাণ এত কম কেন, এর কারণ জানতে শ্রম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, যদি মুহূর্তে ১০ হাজার শ্রমিকের আবেদন জমা পড়ে, যতক্ষণ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় কারখানা কর্তৃপক্ষ থেকে শ্রমিকের নাম নিশ্চিত করা না হবে, ততক্ষণ কোনো শ্রমিক সহায়তার অর্থ পাবেন না। দেখা গেছে, কিছু কারখানা বন্ধ। ধরনের কারখানার শ্রমিকের নাম চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। যে কারখানাগুলো সচল আছে তারা তাদের কাজের ব্যস্ততার অজুহাতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় শ্রমিকের নাম নিশ্চিত করছে না। মালিক পক্ষের ধরনের নেতিবাচক সাড়া পাওয়ার ফলেই শ্রমিকদের সংখ্যা অনেক কম। 

শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মসূচিটি চলবে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। সে সময় পর্যন্ত ন্যায্য দাবিদার পেলে সহায়তার অর্থ ছাড় করা যাবে। কোনো কারণে খরচ না হলে কর্মসূচিটি স্থায়ী রূপ পাবে। শিল্প শ্রমিক যারা বেকার থাকবেন, তাদের সহায়তার স্থায়ী বন্দোবস্ত হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোর আদলে স্থায়ী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছে সরকার।

এদিকে কভিড-১৯-এর প্রভাবে দেশের শিল্প খাতে বিপুল পরিমাণ শ্রমিকের কর্মচ্যুতির ঘটনা ঘটলেও এর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করেনি সরকার বা মালিক পক্ষ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যে দেখা যায়, সব খাত মিলিয়ে দুই লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে শ্রমঘন শিল্প খাতগুলোর কাজ হারানো শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট কিছু সংখ্যা পাওয়া যায় শিল্প এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা তদারকিতে নিয়োজিত শিল্প পুলিশের কাছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ময়মনসিংহ ছয় শিল্প এলাকায় কর্মচ্যুত হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৫৩৮।

কর্মচ্যুত শ্রমিকদের সহায়তার কর্মসূচির প্রথম ধাপের অর্থ ছাড় হয় ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর। তখন সহায়তা পান হাজার ৭৯৪ শ্রমিক। কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পাশাপাশি সহায়তার অর্থ প্রদান করেন শ্রম কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, করোনা মহামারীর কারণে তৈরি পোশাক এবং চামড়া পাদুকা শিল্পে কর্মহীন দুস্থ শ্রমিকদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেয়। কার্যক্রমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জার্মান সরকার অর্থায়ন করেছে।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, কর্মহীন শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমটি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে সরকার গঠিত কমিটি, সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সহযোগিতায় যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রাপ্ত হাজার ৭৯৪ জন কর্মহীন শ্রমিককে প্রথম পর্যায়ে জনপ্রতি হাজার টাকা করে নগদ অর্থসহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা হলো। কার্যক্রমের মাধ্যমে চারটি শিল্প সেক্টরের কর্মহীন শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। তারা নিজ নিজ কারখানায় গিয়ে প্রণীত ইলেকট্রনিক পদ্ধতির চাহিদামতো তাদের সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি আপলোড করবেন। এতে প্রকৃত উপকারভোগীর সংখ্যাও অনেক বাড়বে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন