শুক্রবার | মে ০৭, ২০২১ | ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

বিকল্প চ্যানেলে এসএমইদের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণের উদ্যোগ

প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে অর্থ পৌঁছে দেয়া হোক

প্রণোদনার প্রথম প্যাকেজের আওতায় কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা সন্তোষজনক না হওয়ায় কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন প্রণোদনা তহবিলের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), মাইক্রো ফিন্যান্স ইনস্টিটিউট (এমএফআই), পিকেএসএফ, এসএমই ফাউন্ডেশন, বিসিকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিতরণ করবে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এবার করোনার দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ সুবিধা পাবেন। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের দ্বিতীয় দফার প্রণোদনার আওতায় সিএমএসএমইকে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দিতে যাচ্ছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এরই মধ্যে ১১টি ব্যাংক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ শুরু হয়েছে। এর আগে দুই দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও সিএমএসএমইদের জন্য সরকার ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রথম দফা ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজের অর্ধেকও বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম করেও ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দিতে আগ্রহী করে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। অবস্থায় সিএমএসএমইদের কাছে প্রণোদনার ঋণ বিতরণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিতপূর্বক অর্থ পৌঁছে দেয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।  

একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনায় বড় শিল্পের তুলনায় ক্ষুদ্র শিল্প অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পই আবার সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তাই এর সুরক্ষা দেয়াই সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না, এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়ও জড়িত। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকের সঙ্গেই আর্থিক খাতের কোনো যোগাযোগ নেই। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার বা ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালান। আবার অনেকের স্থায়ী কোনো ঠিকানাও নেই। তাদের অনেকেই সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে অবগতও নন। বর্তমান বাস্তবতায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন। ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ প্রদানের চেষ্টা করে এক্ষেত্রে সফল হওয়া যায়নি। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংক যেসব নিয়ম বিধি অনুসরণ করে, তা মেনে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আবেদন করা কঠিন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের জন্য প্রণোদনার টাকা পেতে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে, তা পূরণ করে টাকা পাওয়া অনেক কঠিন। কারণ ৬২ শতাংশ উদ্যোক্তা কখনো ব্যাংকে যাননি। ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পে আর্থিক সহায়তা না পৌঁছানোর কারণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা নেয়ার পদ্ধতিগত জ্ঞানের অভাব এবং আনুষ্ঠানিকতা। ক্ষুদ্র মাঝারি খাতে অর্থায়নের প্রায় ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে অনানুষ্ঠানিক, যার কারণে আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের পলিসির সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা কম। এক্ষেত্রে শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া ভিয়েতনাম করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত সিএসএমইদের তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের সমস্যাগুলোর ধরন লিপিবদ্ধ করেছে সর্বাগ্রে। কারো অর্থের সমস্যা, কারো আবার পণ্য বাজারজাতের সমস্যা। তাই দেশগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সমাধানের পথ অনুসরণ করেছে। এছাড়া ভিয়েতনাম খাতভিত্তিক স্বতন্ত্র পদক্ষেপ নিয়েছে। এর সুফলও তারা ঘরে তুলছে রফতানি বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশের এসএমই খাতের রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও স্থান খাতভিত্তিক সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চিহ্নিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, অফিস এনজিওদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। ঋণের অপব্যবহার রোধে নজরদারিও জোরদার করতে হবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনার প্রভাবে বিভিন্ন খাত কতটা ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ঋণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিপর্যস্ত সময়কে মোকাবেলা করতে সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখা স্বাভাবিকভাবেই অপরিহার্য। বলা হচ্ছে প্রান্তিক উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, নতুন গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া হবে এবং এসএমই ফাউন্ডেশন যাদের নাম সুপারিশ করবে, তারাই ঋণ পাবে। প্রান্তিক উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, নতুন গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি তাদের কাজের প্রতি যেমন আগ্রহী করে তুলবে, তেমনিভাবে বিপর্যস্ত সময়কে মোকাবেলা করতে শক্তি জোগাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। তবে প্রকৃত অর্থে প্রাপ্যরা যেন ঋণ পান, এটি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র মাঝারি খাতে ঋণপ্রাপ্তিতে যে সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। একটি বিষয় নিয়ে নীতিনির্ধারকদের চিন্তা করা প্রয়োজন, তা হলো ক্ষুদ্র মাঝারি খাতে ঋণের সুদের চেয়ে ঋণটাই প্রাধান্য পায়। উদ্যোক্তারা কত সুদে পেলেন, সেটা তাদের সমস্যা নয়। ঋণ পাওয়াটাই হচ্ছে সমস্যা। এতে কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখে খাত পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। নইলে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প খাতকে বিকাশের ধারায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে যাবে। বাংলাদেশে সিএমএসএমইদের ক্লাস্টারভিত্তিক একটি ডেটাবেজ রয়েছে, আছে তাদের সংগঠনও। ফলে তাদের সহায়তায় করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের তালিকা প্রণয়ন কঠিন হবে না। ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়নও সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এনজিও ছড়িয়ে রয়েছে। প্রণোদনার ঋণ প্রদানে তাদের সহায়তাও নিতে পারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এসএমই ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফের সমৃদ্ধ একটি তালিকা রয়েছে, তা ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি এসব তালিকার বাইরে থাকা উদ্যোক্তাদের ঋণ পৌঁছে দিতেও উদ্যোগ নিতে হবে।

সিএমএসএমইদের আয় সঞ্চয় সীমিত হওয়ায় যেকোনো অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতাও কম। আশা করা যায়, নতুন পদক্ষেপে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পে ঋণ দ্রুতই বিতরণ সম্ভব হবে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে তদারকি বাস্তবায়ন দক্ষতার ওপরই। এক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন দ্রুত প্রণোদনার অর্থ বিনা প্রতিবন্ধকতায় পান, তা নিশ্চিত করা চাই। এছাড়া খাতভিত্তিক বিভাজনকে আরেকটু নমনীয় করে দেখা যেতে পারে। এসএমই ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা সিএমএসএমইদের প্রণোদনার ঋণ বিতরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা। তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ডাটাবেজ। এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটিও খেয়াল রাখা দরকার, যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্ত নন, তারাও যেন ঋণের সুবিধাবঞ্চিত না হন। স্থানভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনাপূর্বক বস্তুনিষ্ঠ তালিকা প্রণয়ন করা গেলে ঋণ বিতরণে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ঋণ বিতরণে কাগজপত্রের জটিলতা বন্ধকি প্রথা এড়িয়ে চলার বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক, ডিলার, জোগানদারসহ যেকোনো অর্থ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জ্ঞাত স্থিতিশীল মূল্যমানের জামানত গ্রহণ করতে আগ্রহী হওয়ার জন্য আধুনিক আইন উৎসাহিত করবে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ ইনভেন্টরি, গ্রহণযোগ্য হিসাব, বাণিজ্যিক পেপার প্রভৃতিকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করার পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। ধরনের পদক্ষেপ ঋণের বিপরীতে জমিকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা হ্রাস করবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন