শুক্রবার | মে ০৭, ২০২১ | ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

প্রথম পাতা

ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেড ও ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি

লগ্নিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নয় শুধু এসেছে সাইনবোর্ড

রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠানের ৪৬০ কোটি টাকা আটকে আছে

হাছান আদনান ও মেসবাহুল হক

প্রায় এক দশক আগে অনুমোদন পায় মাইশা গ্রুপের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৪৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী জনতা ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) লগ্নীকৃত ঋণ বা ঋণের সুদের কোনো কিস্তিই পরিশোধ করেনি ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেড ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি নামের বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি। অন্যদিকে প্রকল্প এলাকায় পাওয়া গিয়েছে শুধু সাইনবোর্ড ছোটখাটো কিছু অবকাঠামো।

বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি প্রয়াত সাংসদ আসলামুল হকের মালিকানাধীন মাইশা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১০৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেড নামের আইপিপিভিত্তিক কেন্দ্রটি অনুমোদন পায় এক দশক আগে। দীর্ঘ সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অগ্রগতি কেবলই একটি সাইনবোর্ড।

ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি নামে আরেকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) চুক্তি হয় ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর। চুক্তির পর নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমান হয়নি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অস্তিত্ব।

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটিতে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ঋণ ৩৮০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেডে অগ্রণী ব্যাংক আইসিবির ঋণ রয়েছে ৮০ কোটি টাকা।

এসব ঋণ নিয়ে এখন বিপাকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন পর্যন্ত ঋণের কিস্তি বা সুদ কোনো কিছুই পরিশোধ করেনি বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি। এতে সুদ যুক্ত হয়ে প্রতিনিয়ত বেড়েছে ঋণের পরিমাণ। অন্যদিকে নির্মাণ শেষে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি উৎপাদনে আসবে এমন কোনো সম্ভাবনাও দেখছে না বিপিডিবি। এজন্য দুটি কেন্দ্রেরই অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি নিয়েও মামলা চলছে সরকারের সঙ্গে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের দাবি, বুড়িগঙ্গা তুরাগ পারের ৫৪ একর জায়গা দখল করে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। এজন্য কয়েক দফায় বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হয়েছে। অন্যদিকে বিবদমান জমিই জামানত রাখা হয়েছে ব্যাংকের কাছে। সব মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস-উল-ইসলাম বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেডে ২৫৬ কোটি টাকা প্রকল্প ঋণ দেয়ার কথা ছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৮ সালে আমরা ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় দিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জমি নিয়ে বিরোধসহ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অগ্রগতি না হওয়ায় আমরা আর কোনো কিস্তি ছাড় দিইনি। ছাড়কৃত অর্থের সঙ্গে সুদ যুক্ত হওয়ায় ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (ইসিবি) ওপর সম্প্রতি বিশদ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই পরিদর্শন প্রতিবেদনে আইসিবির ঋণ বিতরণে গুরুতর অনিয়মগুলো তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেডকে দেয়া ঋণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেডের প্রস্তাবিত প্রকল্পে ডিবেঞ্চার সহায়তা দিতে ২০১৭ সালের ২০ মার্চ আইসিবি ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ মঞ্জুরি করে। সিন্ডিকেশন ব্যবস্থার আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে বিনিয়োগের লিড অ্যারেঞ্জার হয় অগ্রণী ব্যাংক। এতে মোট বিনিয়োগ ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৯৩৮ কোটি টাকা। ঋণ ইকুইটির অনুপাত ৭০ঃ৩০ ধরে অগ্রণী ব্যাংক আইসিবি মোট ৬৫৬ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে আইসিবি ঋণ দেবে ৪০০ কোটি টাকা। বাকি ২৫৬ কোটি টাকা জোগান দেবে অগ্রণী ব্যাংক। 

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আইসিবির মঞ্জুরীকৃত ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রথম কিস্তি বাবদ কোটি ১৫ লাখ টাকা ছাড় হয় ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ২০১৯ সালের মার্চ দ্বিতীয় কিস্তি বাবদ ছাড় হয় ১৩ কোটি লাখ টাকা। সব মিলিয়ে আইসিবির ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ঋণের তৃতীয় কিস্তি ছাড়ের আগে আইসিবি অগ্রণী ব্যাংক যৌথভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অবস্থা পরিদর্শনের জন্য পরিদর্শক দল পাঠায়। ওই পরিদর্শক দলের সুপারিশ থেকে দেখা যায়, দ্বিতীয় কিস্তির টাকার কোনো অংশই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ব্যয় হয়নি। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে উদ্যোক্তার বিনিয়োগের অংশ, অগ্রণী ব্যাংক আইসিবি থেকে ছাড়কৃত অর্থের সদ্ব্যবহার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর চিঠি দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে আর টাকা না দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতুর মাধ্যমে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ঘটেছে কেরানীগঞ্জের। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি বছিলা ব্রিজ নামে বেশি পরিচিত। সেতু থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে চোখে পড়ে আরিশা অর্থনৈতিক অঞ্চল। আসলামুল হকের মালিকানাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলেই তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে কেবল সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের নামের ১০৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নামে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ রয়েছে হাজার ৫৭০ কোটি টাকা।

বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে নির্মিত ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলের বড় অংশে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। গতকাল সরেজমিন আরিশা অর্থনৈতিক অঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, শুনশান নীরবতা। বিআইডব্লিউটিএর চালানো উচ্ছেদ অভিযানের চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান। বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। পুরো অর্থনৈতিক অঞ্চলের কোথাও কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি।

একাধিক নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে অর্থনৈতিক অঞ্চল এলাকায় সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে। ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেডের কোনো অবকাঠামো দাঁড়ায়নি। বিআইডব্লিউটিএর চালানো উচ্ছেদ অভিযানের পর থেকে সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদনও বন্ধ।

এ বিষয়ে চেষ্টা করেও মাইশা গ্রুপের দায়িত্বশীল কারো সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে প্রয়াত আসলামুলের হকের স্ত্রী কোম্পানির সব কার্যক্রম বুঝে নিচ্ছেন বলে তার পরিবার থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। সহসাই তিনি সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

অনুমোদন প্রাপ্তির নয় বছরেও অস্তিত্বের জানান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি কোম্পানি লিমিটেডে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা। ঋণের বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ২০১৪ সালের দিকে ঋণপত্র খোলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অগ্রগতি বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা নিয়ে মামলা চলছে বলে শুনেছি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, প্রয়াত সাংসদের দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে অনেকবার পর্ষদ সভায় আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্তও কেন্দ্র দুটির অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগকে জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি নিয়েও ঝামেলা চলছে। মাইশা গ্রুপের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান পরিবর্তনের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত কেন্দ্র দুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। করোনাভাইরাস সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে বেশকিছু সিদ্ধান্ত আটকে আছে। তবে দ্রুতই বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

প্রসঙ্গত, এপ্রিল রোববার ঢাকা-১৪ আসনের এমপি আসলামুল হক মারা যান। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি রিয়েল এস্টেট, নির্মাণ ট্রেডিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। প্রয়াত সাংসদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো মাইশা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে হাজার ৭৪ কোটি টাকার বেশি ব্যাংকঋণ রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন