রবিবার | মে ০৯, ২০২১ | ২৬ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক ক্লাবের সদস্যপদের অর্থনীতি

ড. এ. কে. এনামুল হক

অনলাইনে ক্লাস চলছে। কভিডের সুবিধা হলো, ছাত্র-শিক্ষক এক দেশে না থেকেও কিন্তু ক্লাস করতে পারে। সময় মিলিয়ে নিলেই হলো। ক্লাসের পর এক ছাত্র শিক্ষককে মেসেজ পাঠাল, আমার দেশের পরিস্থিতি খুব ভালো না, ইন্টারনেট প্রায়ই বন্ধ থাকে। তাই মিড টার্ম পরীক্ষা না- দিতে পারি। তখন কী হবে? শিক্ষক বিরক্তিভরে উত্তর দিলেন, দেখো, ক্লাস না করে পরীক্ষা দিলেও খুব একটা লাভ হবে না। একান্তই না দিতে পারলে তোমাকে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হবে। তোমার ফাইনাল পরীক্ষার মার্কস তো মাত্র ৬০ শতাংশ। আমার মনে হয় না ফল খুব ভালো হবে। তোমার ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান বিশ্ববিদ্যালয় করবে না। এটুকু লেখার পর নোট আকারে বললেন, আমি জানতাম না করোনাভাইরাস ইন্টারনেটের ওপরও আঘাত করতে পারে! ছাত্র বুঝতে পারল যে শিক্ষক তাকে ভুল বুঝেছেন। তাই পরিষ্কার করার জন্য আবার জানাল, দেখুন, আমার বাসার চারদিকে পুলিশি তত্পরতা বেড়েছে। চারদিকে লোকজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। গুলি চলছে। মাঝেমধ্যে ফেসবুক, ইন্টারনেটও বন্ধ করে দিচ্ছে, তাই জানতে চাইছিলাম। কভিডের কারণে নয়। শিক্ষক উত্তর দিলেন, পুলিশ অন্যায় করে না। তোমার ভয় কিসে? অপরাধীদের ধরতে পুলিশ তত্পরতা চালাতেই পারে। বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট নয়। তবে হ্যাঁ, কেবল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারবে না। ছাত্র এবার জানাল, দেখুন, আপনি হয়তো সঠিক পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন না। আমি যে শহরে বাস করি, সেখানে পুলিশ সব যুবককে খুঁজছে। জেলে পুরছে। তাই আমি চিন্তিত। শিক্ষক পাল্টা উত্তর দিলেন, বিশ্বের কোনো দেশেই পুলিশ নিরপরাধ লোককে হয়রানি করে না। তুমি অপরাধ না করলে ভয়ের কোনো কারণ আমি দেখি না। ঘটনাটি কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়টি কানাডায় আর ছাত্রটি বসবাস করে মিয়ানমারে। বুঝতেই পারছেন, ক্রমাগত অজ্ঞতা আমাদের গ্রাস করেছে। শিক্ষকের এমন কাণ্ড বুঝিয়ে দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিশ্বজ্ঞান কতটা কম! তবে আমার বক্তব্য তাকে নিয়ে নয়। শিক্ষক এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যার আন্তর্জাতিক মানক্রম একেবারে খারাপ নয়। মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে আমি সবসময়ই সন্দিহান। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড কীভাবে তৈরি হয়, তা শুনলে আপনি বলবেন, মানদণ্ডে মানের চেয়ে দণ্ডের প্রাধান্য বেশি। মান কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। মানদণ্ডগুলো তৈরির পদ্ধতিগুলোও বেশ চমকপ্রদ। আর সেই দণ্ডে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থান পেতে হলে আরো দণ্ড দিতে হবে। দণ্ড না দিয়ে মান পাওয়া যাবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কী করে তৈরি হয়, তা নিয়ে আমার কৌতূহল বহুদিনের। শিক্ষার মান কী করে তৈরি হয়? তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার অন্ত নেই। সংক্ষেপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান ভর্তির সময় ছাত্রের মানের ওপর নির্ভর করে না, তবে ভালো ছাত্র ভর্তি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যে ভালোই হবে, তা বলা বাহুল্য। শিক্ষার মান মূলত নির্ভর করে শিক্ষকের মান, শিক্ষাঙ্গনের সুযোগ-সুবিধা, আর পাসের পর ছাত্রদের সামাজিক, অর্থনৈতিক পেশাদারি অবস্থানের ওপর। অর্থাৎ মনে করা হয়, শিক্ষার বিষয়বস্তুতে এমন বিষয় সন্নিবেশিত হবে, যাতে পাস করার পর ছাত্ররা সমাজে সমাদৃত হবে। কেন হবে? কারণ তারা সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখবে। কীভাবে অবদান রাখবে? তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সমাজের সমস্যার সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবে। তাই শিক্ষার মানে কখনো পরীক্ষা পদ্ধতি কিংবা শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রাধান্য পায় না, পায় জ্ঞানার্জন।

এর বিপরীতে একটি ঘটনা বলি। কয়েক দিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নিয়ে একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। তাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থার কর্মকর্তারা শিক্ষকদেরজ্ঞানদিতে আসেন। মান সম্পর্কিত বক্তৃতার এক পর্যায়ে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অধ্যাপকদের বিশ্বাস করা যায় না।আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না, তবে আমার সহকর্মীদের অনেকেই ছিলেন। তারা নীরবে হজম করেছেন এমন বক্তব্য। তাদের গায়ে লেগেছে কিন্তু কিছু বলেননি। তাই তারা নিজেদের দুঃখ লাঘব করতেই আমাকে জানালেন। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, তাদের ধারণা আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষকরা প্রশ্ন ফাঁস করে দেন, তাই তাদেরকে পরীক্ষা বিষয়ে বিশ্বাস করা কঠিন। মনে পড়ে গেল বহুদিন আগে আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাকে বড়নিয়ে একটি আন্দোলন করেছিলেন সেই কথা। তাদের মনে প্রশ্ন এসেছিল, সরকারি সচিব বড় না অধ্যাপকরা বড়? আমি তখন একজনকে বলেছিলাম, দেখেন সরকারের সচিবকে সরকার বিশ্বাস করে। দায়িত্ব দেয়। কিন্তু শিক্ষকরা নিজেদেরকেই অবিশ্বাস করেন, অসাধু মনে করেন। তাদেরকে মর্যাদা দেয়া কি ঠিক হবে? যাকে বলেছিলাম, তিনিও একজন শিক্ষক। আমার একথা সহ্য হয়নি। রেগেমেগে বললেন, কী বলেন? আমি জানালাম, শিক্ষা ব্যবস্থার শুরুই হয় শিক্ষককে মর্যাদা দিয়ে। শিক্ষকই বলতে পারেন ছাত্রটি পাসের উপযুক্ত হয়েছে কিনা। তা- ছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থায়দেশীশিক্ষকদের বিশ্বাস করা যায় না বলেই তখন চালু হয়েছিল প্রশ্ন মডারেশনের মতো অবিশ্বাসের যন্ত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভবত একমাত্র আইবিএ ছাড়া কেউই নিয়ম বদলাতে পারেনি। তাতেই বোঝা যায় যে বিভাগগুলো তার শিক্ষককে বিশ্বাস করে না। হয়তোবা মনে করে শিক্ষকের প্রশ্ন করার মতো উপযুক্ততা নেই কিংবা মনে করে শিক্ষকের চরিত্রে সমস্যা রয়েছে। একদিকে শিক্ষকরা যখন নিজেদের এভাবে মূল্যায়ন করেন আবার অন্যদিকে তারা নিজেদের সচিবের মর্যাদার সঙ্গে সমতলে থাকার আন্দোলন করেন, তখন তা আমার বোধগম্য হয় না। কিন্তু দেখুন, শিক্ষক প্রশ্ন ফাঁস করেছেন, এমন ঘটনা আবিষ্কার করা কঠিন। এর কারণ একটিশিক্ষক তার ছাত্রের কাছে যে মর্যাদার আসনে থাকেন, সেখান থেকে কাজটি করা কঠিন। অথচ ইংরেজদের বিতাড়নের এত বছর পরও আমরা নিয়ম বদলাইনি। আমি আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ম বদলাবে।

কথাগুলো বললাম সেই সংস্থার কর্মকর্তার কথার সূত্র ধরে। তিনিও হয়তো ভাবেন, ‘ছাপোষাশিক্ষকরা ছাত্রদের কাছে বিক্রি হয়েই থাকেন। আর তাই যদি সত্যি হয়, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে না। শিক্ষকের কাজ পাঠক্রম অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করা। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকরা হচ্ছেন পাঠক্রমের গুটি। তাতে তাদের দায় থাকে না। তারা শিক্ষাঙ্গনে দায়হীনভাবে কেবল কেরাম বোর্ডের গুটি হিসেবে এক কোণ থেকে অন্য কোণে যাবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্থার কর্মকর্তার বক্তব্যে বোঝা যায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা হব তাদের গুটি আর সংস্থাটি হবে স্ট্রাইকার! বিশ্বের খ্যাতিমান কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম চালু রয়েছে, তা জানতে আমার খুব ইচ্ছা করছে। নিজেদের অসম্মান করার প্রবণতাকে আমি সবসময়ই ঘৃণা করি, আর তাই বিষয়টি নজরে আনলাম।

বলছিলাম শিক্ষার মান কী দিয়ে নির্ধারিত হয়। শিক্ষার মান পরীক্ষা পদ্ধতিতে হয় না। পাঠদান পদ্ধতিতে হয় না। তাহলে কী করে মান তৈরি হয়। মান মূলত শিক্ষকের মান শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল। যদি জানতে চান শিক্ষকের মান কী দিয়ে নির্ধারিত হয়? তাহলে জানবেন তা নির্ভর করে তাদের গবেষণার মানের ওপর। গবেষণার মান কী দিয়ে নির্ধারিত হয়? গবেষণার মান নির্ভর করে প্রকাশনার মানের ওপর। অর্থাৎ আপনার গবেষণাটি কী মানের গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হলো, তার ওপর। নিয়ে বিশ্বে কয়েকটি ক্লাব রয়েছে। একটি হলো স্কপাস। মান নিয়ন্ত্রণ ক্লাবগুলোয় আমাদের অনেক স্বনামধন্য অধ্যাপকের স্থান হয় না। এর কারণ এই নয় যে তারা অনুপযুক্ত। এর মূল কারণ তাদের সঙ্গে ক্লাবগুলোর যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক নেই। বলতে পারেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খ্যাতিমান শিক্ষকরা কেন এসব নেটওয়ার্কের সদস্য হচ্ছেন না? উত্তর খুব সহজ। বিদেশ থেকে পিএইচডি শেষ করে যারা দেশে এসেছেন, তাদের মৃত্যু হয় নিজেদের দেশে। কারণ নেটওয়ার্ক বলতে তাদের কিছু থাকে না। তারা বিদেশে গেছেন ছাত্র হয়ে আর দেশে এসেছেন পাস করে। ফলে গুটিকয়েক সৌভাগ্যবান ছাড়া আর কারো সেই নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ থাকে না। নেটওয়ার্ক তৈরি হয় গবেষণা নিবন্ধ বিভিন্ন সম্মেলনে উপস্থাপনের মাধ্যমে। সেখানে গবেষকরা পরস্পরকে জানেন, বোঝেন শ্রদ্ধা করতে শেখেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা কিংবা সম্মেলনে যোগদানের জন্য কোনো অর্থ প্রদান করে না। অথচ দেখুন হাজার হাজার ডলার চাঁদা দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা এখন বলছে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে মান নিয়ন্ত্রণ ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ করতে। এটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার মতো। এই একই সংস্থা শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের তৈরি দশটি মানদণ্ডের দিকে মনোযোগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রভাবিত করছে না। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তৈরি না করে ধরনের বাধ্যবাধকতা আমাদের বিদ্যাপীঠগুলোকে আরো অপদস্থ করবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমে তাদের জৌলুশ হারাবে। আর সেই স্থান দখল করবে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দেশে ক্রমে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শাখা খুলবে। শিক্ষকদের অপদস্থ করার এমন কৌশল শেষ পর্যন্ত দেশকেই বিব্রত করবে, তা বোঝার মতো জ্ঞান তাদের হবে বলে আশা করি।

একবার আমি এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে বলেছিলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতিসহজেই বিশ্বমান তৈরি করতে পারে। তিনি বললেন, কী করে? বললাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি তার শিক্ষকের গবেষণার মান বিশ্বব্যাপী তার পরিচিতির ওপর নির্ভর করে। তাই আপনাকে দুটো কাজ করতে হবে। প্রথমত, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের তুলনায় তা খুব বেশি নয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষককে বিশ্বের বিভিন্ন সম্মেলনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। কী রকম? ধরুন, আপনি নিয়ম করে বললেন, আপনার শিক্ষকরা প্রতি বছর তাদের মূল বেতনের সমান পরিমাণ অর্থ বোনাস পাবেন যদি তিনি কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বললেন, নিয়ম তো রয়েছে। আমার কাছে যিনিই আবেদন করছেন, আমি তাকেই বরাদ্দ দিচ্ছি। তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। বললাম, দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটিতে আপনার কাছে আবেদন করে করুণা গ্রহণ করতে হবে। অনেকেই তা করবেন না। অন্যটিতে আপনি বলছেন, তিনি একটি বোনাস পাবেন না, যদি তিনি ওই বছর কোনো গবেষণাপত্র কোথাও উপস্থাপন করতে না পারেন। সেখানে করুণা নেই, রয়েছে ব্যর্থতা। মনে হবে, আহা গবেষণা না করায় আমি বোনাসটি মিস করলাম। তখন দেখবেন নিজেদের মধ্যে তাগিদ তৈরি হবেপ্রতি বছর তারা যেন গবেষণা করেন এবং তা কোথাও না কোথাও উপস্থাপন করেন। প্রতিযোগিতা আপনার বিশ্ববিদ্যালয়কে খুব অল্প সময়েই খ্যাতির শিখরে নিয়ে যাবে। প্রতিটি গবেষণা তার উপস্থাপন তাদের বিশ্বের গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেবে। আর তাতে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় লাভবান হবে। তখন দেখবেন শিক্ষকরা গবেষণার অর্থ পাওয়ার জন্য ক্রমাগত পরিশ্রম করবেন। একবার ভাবুন আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন শিক্ষক প্রতি বছর বিশ্বের ১০০টি সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন কিংবা সম্মেলনে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন, তাতে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় যাবে। আমার উত্তরে তিনি হাসলেন, অবিশ্বাসের হাসি নাকি করুণা করার ক্ষমতা হারাবেন না বলে মুচকি হাসলেন তা বুঝিনি। তবে তিনি আমার কথায় গা করেননি। এখন পর্যন্ত আমি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম চালু করাতে পারিনি। অথচ ভেবে দেখুন কত অল্প বিনিয়োগে তারা বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেন।

বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান শিক্ষককেন্দ্রিক। শিক্ষকরা গবেষণার অর্থে তৈরি করেন নিজেদের ল্যাবরেটরি, নিজেদের গবেষণা ফান্ড। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফান্ডের একটি অংশ নিজেদের বলে দাবি করে। কারণ তারা মনে করে অনেক ক্ষেত্রেই অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব খ্যাতির জন্য আসে। অর্থাৎ আপনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেই আপনাকে অনেকেই গবেষণার অর্থ দিয়ে থাকে। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনে করে যে এর মাধ্যমে তারা নতুন অর্থের সন্ধান পাবে। তারা যে অক্সফোর্ড নয় কিংবা তাদের খ্যাতির জন্য যে গবেষণার অর্থ আসে না, তা তারা ভাবতেই চান না। তাই তারাও একই নিয়ম রেখেছেন। অথচ ভাবনাটি উল্টিয়ে দিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লাভবান হতে পারে। বিষয়টি রকম, অধ্যাপকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অর্থ আনলেই তা থেকে ছাত্রদের উপকার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণা অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা কমে। তাই অর্থকে আমাদের বর্তমান অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উৎস হিসেবে না দেখাই ভালো। কিন্তু তাও চালু করা সম্ভব হয়নি। কারণ? কারণ আমরা নিয়ম চালুর সময় নিয়মের পেছনের বিষয়গুলো ভেবে দেখি না। আমাদের শিক্ষাঙ্গনের কর্মকর্তাদের (অধিকাংশ উপাচার্য নিজেদের কর্মকর্তা মনে করতেই ভালোবাসেন বলে আমি শব্দ ব্যবহার করছি) মনে কয়েকটি শব্দ বাসা বেঁধে আছে। সেগুলো হলো নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। তারা ক্ষমতার ব্যবহার দেখাতে গিয়ে যে অপব্যবহার করছেন, তা আজকাল পত্রপত্রিকায় দেখা যায়। একজন অধ্যাপক সারা জীবন সৎ থেকে শেষ পর্যন্ত উপাচার্য হয়ে অসতের খাতায় কেন নাম লেখাচ্ছেন তা বোধগম্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের অন্য উপকরণের মধ্যে রয়েছে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করলে মনে হবে আপনি পঞ্চাশের দশকে ফেরত চলে গেছেন। সে স্থানেই পড়ে আছে। খাবার ব্যবস্থাপনা দেখলে মনে হবে আপনি সত্তরের দশকে রয়েছেন। শিক্ষকের কক্ষ দেখলে মনে হবে ষাটের দশকে আছেন। ছাত্রদের বসার অবস্থাও দেখার মতো। তারা শিক্ষাঙ্গনের ভেতরের চেয়ে বাইরে থাকতেই বেশি তৃপ্তি পায়। একবার আমি এক উপাচার্যকে বলেছিলাম, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের খাবারের মান বাইরের দোকানের খাবারের মানের চেয়ে খারাপ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ছাত্রদের মায়া তৈরি হবে না। আমরা যারা বিদেশে গিয়েছি, তারাই দেখেছি কী করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মান উন্নত করে। শিক্ষাঙ্গনের প্রতি ছাত্রদের মায়া না জন্মালে কিংবা গর্ববোধ না থাকলে সে বিশ্ববিদ্যালয় সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় নাম লেখাতে পারে না। তিনি হেসেছেন। তার মনে কী ছিল বুঝিনি। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষাদান ছাড়াও নানা সুযোগ-সুবিধা থাকে। কারণ তাতে ছাত্রদের ভালোবাসা শ্রদ্ধা জন্মে। বেশি দূর যেতে হবে না। অঞ্চলে যেকোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেই আপনার মনে হবে এক অন্য জগতে আপনি প্রবেশ করেছেন। সেটি ভারত কিংবা পাকিস্তান যেকোনো দেশেই। কিন্তু তা আমরা আমাদের দেশে করতে পারিনি। অথচ দেখুন, শিক্ষাঙ্গনকে তৈরি না করে বিদেশে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের কিছু ক্লাবের সদস্যপদ লাভের জন্য আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সংস্থা এখন রীতিমতো পত্র পাঠাচ্ছে। তাতে প্রতি বছর দেশ অপদস্থ হচ্ছে। আমি গত ১০ বছরে পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়ার যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি, তাদের শিক্ষাঙ্গন তার পরিবেশের কাছে আমাদের কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়াতে পারবে না। অথচ আমরা ভাবছি আমরা খ্যাতিমান হব প্রয়োজনীয় কাজটি না করে কেবল ক্লাবের সদস্যপদ নিয়ে! তাই আমার নিবেদন, শিক্ষার পরিবেশ গবেষণার দিকে নজর দিন। সব শেষে একটি তুঘলকি নিয়ম নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এক খণ্ড জমিতে স্থাপন করতে হবে। জমি এক খণ্ড নাকি দ্বিখণ্ড তা দিয়ে কী করে শিক্ষার মান তৈরি হয়, তা আমার বোধগম্য হয়নি। যারা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে গিয়েছেন তারা ভালো জানেন যে স্কুলটি লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে কত খণ্ড জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত! তাতে কি তাদের মান কমেছে? আশা করি ভাববেন।

 

. . কে. এনামুল হক: ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক পরিচালক, এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন