শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

টকিজ

মিয়া ভাইয়ের বর্ণাঢ্য জীবন

কুদরত উল্লাহ

মিয়া ভাই মিয়া ভাই, বলে ডাকা মানুষের মুখে আজ কোনো ভাষা নেই। ভাষা জানা থাকলেও সেই মিয়া ভাই এখন কাছে নেই। সুদূর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। বলছি, বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান দুলু কথা। যাকে এক নামে সবাই চেনেন নায়ক ফারুক হিসেবে। তার ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য বাংলা চলচ্চিত্র। যার বেশির ভাগই ব্যবসাসফল। অংশ নিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। কিশোর বয়স থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ব্যক্তিগতভাবে এসবের বাইরে তিনি একজন ব্যবসায়ী। মানিকগঞ্জের জন্ম নেয়া গুণী মানুষটি পুরান ঢাকাতেই কাটিয়েছেন জীবন। পরবর্তী সময় উত্তরার নিজস্ব বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।  তার বর্ণাঢ্য জীবন নিয়েই বণিক বার্তার বিশেষ আয়োজন।

শৈশবকাল: ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট ফারুক নামে পরিচিত আকবর হোসেন পাঠান দুলু জন্মগ্রহণ করেন মানিকগঞ্জে। জন্ম নেয়ার পর পরই পুরান ঢাকায় বসবাস শুরু করেন পরিবারের সঙ্গে। সবার ছোট হওয়ায় পেয়েছেন খুব আদর। ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন তিনি। স্ট্রেট কথা বলায় অভ্যস্ত চিত্রনায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভক্ত ছিলেন। তাই তো ১৫ আগস্টের সে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আর কখনই নিজের জন্মদিন পালন করেননি। ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন। পার করেন কৈশর জীবন। স্কুলে থাকতেই যোগ দেন রাজনীতিতে। পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর আদর। তাই তো ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ছয় দফা আন্দোলনে যোগ দেন। প্রচুর পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছিলেন সে সময়। তার নামে ৩৭টি মামলা দেয়া হয়েছিল। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ফারুক যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। অভিনয়ের প্রতি ছিল তার ভীষণ নেশা। কিন্তু দেশের মানুষের মুক্তির জন্য অভিনয় ছেড়ে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপ দিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

অভিনয় জীবন: যুদ্ধে যাওয়ার আগেই মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে প্রথম চলচ্চিত্র জলছবি। তার বিপরীতে অভিনয় করেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী কবরী। পরিচালনা করেছিলেন এইচ আকবর। এরপর চলে যান যুদ্ধে। যুদ্ধ যখন চলছে তখনই তিনি নায়ক। দেশ স্বাধীন করার নেশা ভর করে তার মাথায়। কিন্তু অভিনয় থেকে যায় মাথায়। এজন্য যুদ্ধের ময়দান দাঁপিয়ে, দেশ স্বাধীন করে যোগ দেন আবার চলচ্চিত্রে। রুপালি পর্দায় হয়ে যান নিয়মিত। এরপর ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ , ১৯৭৪ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত আলোর মিছিল- অভিনয় করে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চলচ্চিত্রাঙ্গণে। ১৯৭৫ সালে সুপার ডুপার হিট সুজন সখি লাঠিয়াল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। দুটো চলচ্চিত্রই ব্যবসাসফল হয়েছিল। সঙ্গে ছিল ফারুকের নিপুণ অভিনয়। কারণেই সে বছর লাঠিয়াল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব চরিত্রে অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তারপর ১৯৭৬ সালে সূর্যগ্রহণ নয়নমনি, ১৯৭৮ শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস থেকে নির্মিত সারেং বৌ, আমজাদ হোসেনের গোলাপী এখন ট্রেনেসহ অনেক কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে সামগ্রিক অবদান রাখার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন ২০১৬ সালে।

চলচ্চিত্রে মিয়া ভাইয়ের নায়িকারা: তখনকার সময়ে এমন সুদর্শন যুবক নিপুণ অভিনয় দেখে ফারুক খুব সহজেই প্রবেশ করেন বড় পর্দায়। নজর কাড়েন অন্যসব পরিচালকদের। কিংবদন্তি অভিনেত্রী কবরী তখন হিট। প্রথম চলচ্চিত্রে যখন অভিনয় করেন ঠিক তখনই অন্য নায়িকাদের সঙ্গেও নতুন নতুন চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। একে একে উপহার দিয়েছিলেন ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। তার বিপরীতে অভিনয় করেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি সব অভিনেত্রী। তার মধ্যে রয়েছেন কবরী, ববিতা, সুচরিতা, রোজিনা, সূচন্দা, অঞ্জুঘোষ, অঞ্জনা, শাবানা, নিপা মোনালিসা, সেনেত্রাসহ আরো অনেক নায়িকারা। সত্তর আশির দশকের সব শীর্ষ নায়িকার বিপরীতে কাজ করলেও ববিতা-ফারুক জুটিই ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। তাদের পর্দারসায়ন এত চমত্কার ছিল যে পর্দার বাইরে তাদের প্রেম চলছে এমন গুঞ্জনও আশির দশকের ফিল্মি ম্যাগাজিনগুলোয় প্রকাশিত হয়। যদিও তারা কেউই বিষয়ে কখনো মুখ খোলেননি। নব্বই দশকের শেষে কয়েকটি চলচ্চিত্রে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে দেখা যায় ফারুককে। তবে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক ব্যস্ততার জন্য তিনি রুপালি পর্দা থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। শেষ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ২০০৮ সালে। আজাদী হাসানাত ফিরোজের পরিচালনায় ঘরের লক্ষ্মী চলচ্চিত্রটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন নায়িকা সুচরিতা।

অভিনয়ের বাইরে তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: প্রায় পাঁচ দশক ঢালিউডে অবদান রেখেছেন অভিনেতা ফারুক। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে গাজীপুরে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ফারুক নিটিং ডায়িং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন দীর্ঘদিন। যেহেতু রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। এজন্য পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য, সে সূত্রে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে ঢাকা-১৭ আসনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

অসুস্থতা: ২০১২ সালের জুলাই থেকে নায়ক ফারুক এক মাস ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ফারুক দীর্ঘদিন ধরে কিডনিজনিত রোগে ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০১৩ সালের ৩০ আগস্ট সিঙ্গাপুরে যান সেখানকার মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে ভর্তি হন। চিকিৎসা শেষে ২০১৪ সালের জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তী সময় কিছু বছর ছিলেন সুস্থ। এরপর আবার ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভীষণ জ্বর নিয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। তারপর থেকেই কিছুদিন সুস্থ আবার অসুস্থ এভাবে চলতে থাকে মিয়া ভাইয়ের জীবন। শেষমেশ  হঠাৎ খবর আসে নিয়মিত চেকআপের জন্য মার্চের প্রথম সপ্তাহে সিঙ্গাপুর যান ফারুক। চেকআপের মধ্যেই শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়ায় ১৩ মার্চ থেকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর দুদিন পর খিঁচুনি ওঠায় তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ১৮ মার্চ কেবিনে ফিরে আসেন তিনি। ২১ মার্চ হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললে দ্বিতীয় দফায় তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। তার রক্তে সংক্রমণের পাশাপাশি পাকস্থলিতে রক্তক্ষরণ হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ দিন অচেতন থাকার পর জানা যায় অভিনেতা ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য ফারুকের জ্ঞান ফিরেছে। তিনি এখন মোটামুটি ভালো আছেন। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে আগের চেয়ে। তিনি এখন হাত-পা নাড়ছেন।

ফারুকের ছেলে রওশন হোসেন পাঠান এপ্রিল রাতে বণিক বার্তাকে তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বাবা এখন হাত-পা নাড়তে পারছেন। খুব বেশি না হলেও তার উন্নতি মোটামুটি হয়েছে। তিনি এখনো সুস্থ আছেন। তবে বাবা স্বাভাবিক খাবার খেতে পারছেন না। খাবার খেতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। বাবা এখনো সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আছেন। তাকে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। . লাই চুংয়ের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে। ফারুকের ভাতিজি আসমা পাঠান রুম্পা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, চাচা এখন আগের থেকে ভালো আছেন। চিকিৎসকরা চাচার অবস্থা ভালোর দিকে বলেছেন। তিনি সুস্থ আছেন। অকারণে গুজব থেকে দূরে থাকুন। চাচার জন্য দোয়া করুন। নিশ্চয়ই চাচা আমাদের মাঝে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। আমরা সবসময় খোঁজখবর রাখছি।

এদিকে চিত্রনায়ক ফারুকের সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন গোটা মিডিয়াবাসী তার ভক্তকুলরা। তার সুস্থতা কামনায় বিএফডিসিতে হয়েছে মিলাদ মাহফিল। তিনি ফিরে আসবেন সবার মাঝে এমনটাই মনে করছেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন