বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অসমতা হ্রাসে যে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি

ড. শামসুল আলম

সকলের সাথে সমৃদ্ধির পথে’— মূলমন্ত্রকে ধারণ করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে সরকার জুলাই ২০২০  থেকে জুন ২০২৫ মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে সম্প্রতি। রূপকল্প-২০৪১-এর ওপর ভিত্তি করে প্রণীত দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) বাস্তবায়নে গৃহীতব্য চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম পরিকল্পনা এটি, পাশাপাশি জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। আবার বাংলাদেশের -দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ অনুমোদন-পরবর্তী প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও এটি। পরিকল্পনা এমন এক সময়ে প্রণীত হলো, যখন বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের বিজয় বার্তা নিয়েই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছর শুরু হলো।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত, গত এক যুগে অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশের সাফল্য বেশ ঈর্ষণীয়। সরকারের পরিকল্পিত কৌশল গ্রহণের ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯- প্রথমবারের মতো ছাড়িয়ে যায় শতাংশ ( দশমিক ১৫ শতাংশ) সময়ে দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ২০ দশমিক শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ১০ দশমিক শতাংশ। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়ায় হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বের প্রতিটি দেশের ন্যায় বাংলাদেশের অগ্রগতিও হঠাৎ হোঁচট খায়। ২০২০- জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসে দশমিক ২৪ শতাংশে। কর্মসংস্থানেও দেখা যায় ঋণাত্মক প্রভাব। ফলে সাময়িক দারিদ্র্য যায় বেড়ে। যদিও সরকারের বেশকিছু দ্রুত সাহসী পদক্ষেপে অতি অল্প দিনেই বাংলাদেশ ফের উন্নয়নের ট্র্যাকে উঠে আসতে সক্ষম হয়। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কভিড-১৯-এর প্রভাবকেও বিবেচনায় নেয়া হয়।

গত এক যুগের বাংলাদেশের এমন সাফল্য সত্ত্বেও অস্বস্তি রয়ে যায় অসমতার ক্ষেত্রে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে অসমতা দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্যকে ম্লান করে দেয়। আর তাই সরকার সপ্তম এবং সর্বশেষ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার স্লোগান থেকেও তা পরিষ্কার বোঝা যায়, Promoting Prosperity and Fostering Inclusiveness বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশ্বজুড়েই সাম্প্রতিক বিতর্কের অন্যতম ইস্যু হলো অসমতা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্ডা এসডিজিতে অসমতা দূরীকরণের একটি সুনির্দিষ্ট অভীষ্ট গ্রহণের মধ্য দিয়ে এটি প্রতিভাত হয়েছে। সাম্প্রতিক নানা আলোচনা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে অসমতা হ্রাস পায়নি। কিছুু অঞ্চলে বরং তা বেড়েছে, বিশেষ করে উন্নত বিশ্ব এবং কিছু উন্নয়নশীল দেশে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য হ্রাসে ব্যাপক ভূমিকা পালন করলেও অসমতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়েছে ঠিক তার উল্টো।

অসমতার হার পরিমাপের একটি মাধ্যম হলো জিনি সহগ। জিনি সহগের মান কম হলে তা অপেক্ষাকৃত বেশি আয় সমতা বোঝায় আর জিনি সহগের মান বেশি হলে তা কম আয় সমতা বোঝায়। তবে কোনো দেশ ব্যাপক দারিদ্র্যক্লিষ্ট হলে আয় অসমতা কম থাকে। অসমতা বাড়তে থাকে ধনী হওয়া শুরু হলে, কেননা বেশির ভাগ লোক একসঙ্গে ধনী হয় না। বাংলাদেশে আয়বৈষম্যের ক্ষেত্রে জিনি সহগ ২০০৫ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৬৭। ২০১০ সালে তা সামান্য কমে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৫৮। পরবর্তী সময়ে তা আবার বেড়ে ২০১৬ সালে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৮৩। তারপর খানা আয়-ব্যয় জরিপ (HIES) না হওয়ার ফলে সাম্প্রতিক ডাটা আর পাওয়া যায়নি। অসমতার হার পরিমাপের আরেকটি গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হলো পালমা অনুপাত পালমা অনুপাতও বাংলাদেশের অসমতার ক্ষেত্রে প্রায় একই ফলাফল প্রদর্শন করে। পালমা অনুপাত হলো জনসংখ্যার সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের দেশের মোট আয়ের শেয়ার সবচেয়ে নিচের ৪০ শতাংশের মোট আয়ের শেয়ারের অনুপাত।  বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পালমা অনুপাত ১৯৯৫-৯৬-এর দশমিক ২৩ থেকে বেড়ে ২০০৫- এসে দাঁড়ায় দশমিক ৬২- এবং আরো বেড়ে তা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়ায় দশমিক ৯৩-এ। এটি নির্দেশ করে যে দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েছে। বাংলাদেশে গত দশকে প্রবৃদ্ধির হার দ্রুত বেড়েছে, উচ্চবিত্ত উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সম্পদ সৃষ্টিতে নিম্নবিত্ত দরিদ্র শ্রেণী থেকে দ্রুত এগিয়ে গেছে স্বাভাবিক ধারায়। অবশ্য ভোগ জিনি সহগ এক্ষেত্রে একটু ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়।  ভোগ ব্যয় জিনি সহগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৫ সাল থেকে তা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে শূন্য দশমিক ৩২-এ। সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় বৃদ্ধি এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যা ভোগ ব্যয়ে বৈষম্য কমিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে; যা ইতিবাচক।

বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ছয়টি নীতি ক্ষেত্র অসমতা হ্রাসে কার্যকর হতে পারে. শিশুদের বিকাশ পুষ্টি চাহিদা পূরণে ব্যয়; . সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুবিধা; . মানসম্মত শিক্ষায় সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা; . দরিদ্র পরিবারের কাছে সরাসরি অর্থসহায়তা প্রদান; . গ্রামীণ অবকাঠামো, বিশেষত রাস্তাঘাট বিদ্যুৎ সুবিধার উন্নয়ন; . প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার প্রবর্তন। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিয়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অসমতা হ্রাসের লক্ষ্যে নীতি ক্ষেত্রগুলো বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কভিড-পূর্ব দারিদ্র্য হ্রাসের গতি ফিরিয়ে আনতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি অসমতা হ্রাসে মূলত নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর বিশেষভাবে জোর দেয়া হয়েছে

প্রথমত, প্রবৃদ্ধি কৌশলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ফোকাস থাকবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালীন মোট কর্মসংস্থান হবে ১১ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন, যার মধ্যে দেশজ কর্মসংস্থান হবে দশমিক শূন্য   মিলিয়ন। আর এই কর্মসংস্থানের সিংহভাগই হবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে। সরকার ২০২৫ সাল নাগাদ ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টির উদ্যোগ এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে। ১১টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্বোধনও হয়ে গেছে এরই মধ্যে, এগিয়ে চলছে কারখানা স্থাপনের কাজও। বাকিগুলোর কাজও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলমান রয়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপ কাটিয়ে উঠলে সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থানের দিকেও বিশেষ নজর দেবে এবং এতে মোট কর্মসংস্থান হবে দশমিক ২৫ মিলিয়ন। এই বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি অসমতা হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

দ্বিতীয়ত, দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর দিকে বিশেষ নজর প্রদান। খানা আয়-ব্যয় জরিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপীড়িত পিছিয়ে পড়া জেলাগুলো পশ্চিমাঞ্চলে (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত) অবস্থিত। অঞ্চলগুলোর জীবনমান উন্নয়নে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা তুলে ধরা হয়েছে। যেমন পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে এডিপিতে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান; সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অঞ্চলগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান এবং সুবিধাভোগীর আওতা বাড়ানো; -দ্বীপ পরিকল্পনার সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি গ্রহণকালে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা প্রদান, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ লবণাক্ততা সমস্যা নিরসনে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান; চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশা লাঘবে কার্যকর চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন; সহজলভ্য ক্রেডিট, প্রযুক্তি বিপণন সুবিধা প্রদানসহ বিভিন্ন সহায়ক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে অকৃষিজ গ্রামীণ এন্টারপ্রাইজগুলোর প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান; এসব অঞ্চলের শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ; শ্রম রফতানিতে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান এবং লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা, প্রশিক্ষণ ক্রেডিট সুবিধা প্রদান; দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ১০টি জেলার পিছিয়ে পড়ার কারণ বিষয়ক একটি নিবিড় গবেষণা পরিচালনা করা এবং তা থেকে উত্তরণে যথাযথ কর্মসূচি দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করা। 

তৃতীয়ত, দরিদ্র দুস্থ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত কারণে আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে পরিত্রাণ প্রদানের লক্ষ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পিতভাবে প্রচলন। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতে কভিড-১৯ মহামারীসহ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ক্রমান্বয়ে একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ২০৩০-এর মধ্যে প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। লক্ষ্যে সরকার ২০২৫ সাল নাগাদ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

চতুর্থত, মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান। আর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। সময়ে শতভাগ বয়স্ক সাক্ষরতার হার অর্জনের পাশাপাশি কারিগরি বৃত্তিমূলক শিক্ষা উৎসাহিতকরণ, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিসহ কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। আর এক্ষেত্রে আইসিটির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের কর্মক্ষম যুবার (১৫-২৯ বছর বয়সী) সংখ্যা ৪১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন। আর এই নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যেই বেকারদের সংখ্যা সর্বোচ্চ। অধিকন্তু, শিক্ষা, কর্ম বা প্রশিক্ষণ কোনোটাতেই জড়িত নেই এমন যুবার হার শতকরা প্রায় ২৭ ভাগ। তাই এদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর দেয়া হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়, যাতে এদের হার ২০২৫ সাল নাগাদ শতকরা ১২ ভাগে নামিয়ে আনা যায়। লক্ষ্যে সরকার ২০২৫ সাল নাগাদ শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

পঞ্চমত, নারীর ক্ষমতায়ন। এক্ষেত্রে সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ গত এক যুগে প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কর্তৃক প্রকাশিত  গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী, বাংলাদেশ  মোট শূন্য দশমিক ৭২৩ স্কোর নিয়ে ১৫৩টি দেশের মধ্যে লুক্সেমবার্গ, ইতালি, কোরিয়া, জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোকে পেছনে ফেলে ৫০তম স্থান অর্জন করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে। প্রাথমিক মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে জেন্ডার সমতা অর্জন করেছে, টারশিয়ারি লেভেলেও তা অর্জনের পথে রয়েছে (বর্তমানে তা .৭২) রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান বেশ দৃঢ়, মহান জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার, সংসদ নেত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ ২০ দশমিক ৮৬ শতাংশ সংসদ সদস্যই নারী। কিন্তু নজর দিতে হবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো শতকরা মাত্র ৩৬ ভাগ। নারীদের ক্ষমতায়নকে মাথায় রেখে সরকার ২০০৯ সাল থেকে জেন্ডার বাজেট ঘোষণা করে। বর্তমানে জেন্ডার বাজেট মোট জাতীয় বাজেটের ৩০ দশমিক ৮২ শতাংশ, যা ২০২৫ সাল নাগাদ ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়।

ষষ্ঠত, নারীর পাশাপাশি বাংলাদেশে অরক্ষিত জনগোষ্ঠী যেমন শিশু, বয়োবৃদ্ধ, নৃ-তাত্ত্বিকগোষ্ঠী সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়, অসমর্থ বা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষ এবং নিম্ন বর্ণের জনগোষ্ঠীদেরও সুরক্ষা প্রদান। জনগোষ্ঠীর সবাই সাধারণত চরম দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ অন্যান্য অভিঘাতে সহজেই অরক্ষিত হয়ে পড়ে, যা তাদের জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। একইভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পুষ্টিসেসবায় তাদের অভিগম্যতাও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। আর তাই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মানবসম্পদ উন্নয়ন দারিদ্র্য বিমোচন সংশ্লিষ্ট কৌশলে এই সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন চাহিদা প্রাধিকারের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। নৃ-তাত্ত্বিকগোষ্ঠী যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য, পুষ্টি পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহণে প্রবেশ সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য, পুষ্টি পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে অধিকতর কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হবে, যাতে প্রান্তিক দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষজনকে এই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা যায়। দেশের সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের ন্যায় একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা হবে।

সপ্তমত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন আওতা বৃদ্ধি। খাতে ব্যয় (সরকারি পেনশন ব্যয় ব্যতীত) বর্তমানে জিডিপির দশমিক শতাংশ থেকে ক্রমে বাড়িয়ে ২০২৫ নাগাদ জিডিপির শতাংশে উন্নীত করা হবে। ভুলবশত সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি কিংবা যথাযোগ্যদের বাদ পড়ে যাওয়া সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোয় পরিহারের পদক্ষেপ নেয়া হবে।

অষ্টম পরিকল্পনা আমলে ডিজিটাল/মোবাইল আর্থিক সেবা পদ্ধতি আরো কার্যকর করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ অংশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে। এক্ষেত্রে সরকার এরই মধ্যে National Financial Inclusion Strategy প্রণয়ন করেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গৃহীত কৌশলগুলো বাস্তবায়ন হলে কভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কা সামলেও ২০২৫ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৫ দশমিক এবং অতি দারিদ্র্যের হার দশমিক শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি অসমতা হ্রাস পাবে, সুগম হবে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ১০ নং অভীষ্ট (অসমতা হ্রাস) অর্জনের পথও।

সর্বশেষ বলতে চাই, রাজস্ব বৃদ্ধির সর্বোচ্চ প্রয়াসসহ সুচিন্তিত প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা, সম্পদ কর আরোপ, কর ফাঁকি বন্ধ করা, বৈষম্য রোধ অসমতা দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্প প্রণয়নে পরিকল্পনার প্রাধান্য প্রতিফলিত হতে হবে।

 

. শামসুল আলম: অর্থনীতিবিদ সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন