মঙ্গলবার | এপ্রিল ২০, ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

শেষ পাতা

উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল

প্রথম অংশে বসল শেষ ভায়াডাক্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

উত্তরার দিয়াবাড়িতে ডিপোর ভেতর থেকে শুরু হয়েছে ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট (উড়ালপথ) ডিপো থেকে বের হয়ে প্রথম স্টেশন উত্তরা নর্থ সেখান থেকে উত্তরা সেন্টার, উত্তরা সাউথ, পল্লবী, মিরপুর ১১, মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত বিস্তৃত লাইনটির প্রথম অংশ। গতকাল অংশে বসানো হয়েছে ভায়াডাক্টের সর্বশেষ অংশ। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের প্রথম অংশ উত্তরা-আগারগাঁও এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান।

আগারগাঁওয়ের বেগম রোকেয়া সরণিতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংলগ্ন স্থানে এসে শেষ হয়েছে মেট্রো লাইনের প্রথম অংশ। ভায়াডাক্টের সর্বশেষ অংশটি বসানো হয়েছে এখানেই। ৩৭৫ ৩৭৬ নম্বর খুঁটির (পিয়ার) মাঝ বরাবর। প্রথম অংশে রকম খুঁটি রয়েছে ৩৭৭টি। আর সব মিলিয়ে ভায়াডাক্ট খণ্ড বসেছে হাজার ১৫২টি। এসবের ওপরই গড়ে উঠবে মেট্রোরেলের ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন।

প্রথম অংশে ভায়াডাক্টের সর্বশেষ অংশ বসানো উপলক্ষে গতকাল প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক। সময় তিনি ভায়াডাক্ট স্থাপন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বলেন এমএএন ছিদ্দিক। তিনি জানান, ভায়াডাক্টের ওপর পুরোদমে চলছে রেললাইন বসানোর কাজ। এরই মধ্যে দশমিক ৭২ কিলোমিটার লাইন বসানো সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজটি আগামী মে মাসের মধ্যে শেষ হবে যাবে। ততদিনে জাপান থেকে মেট্রোরেলের একাধিক সেট ট্রেন বাংলাদেশে চলে আসবে বলেও জানান ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তিনি বলেন, আজকে আমাদের জন্য আনন্দের দিন। প্রথম অংশে ভায়াডাক্ট বসানো শেষ হয়ে গেল। মেট্রোরেলের ট্রেনগুলো বাংলাদেশে এসে পৌঁছালেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ট্রায়াল রান শুরু হবে। এজন্য পাঁচটি স্টেশন প্রস্তুত করে ফেলা হচ্ছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান উত্তরায় ডিপো এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি জানিয়েছিলেন, লাইনটির উত্তরা-আগারগাঁও অর্থাৎ প্রথম অংশ আগামী ১৬ ডিসেম্বর চালু হতে পারে। প্রসঙ্গে গতকাল এমএএন ছিদ্দিকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা একটা লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে সব কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। তবে লাইনটি কবে চালু হবে, প্রথম অংশ আগে চালু হবে, নাকি পুরোটা একসঙ্গে চালু হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

গতকাল পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রথম অংশের পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ইলেকট্রিক্যাল মেকানিক্যাল এবং রোলিং স্টক ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ।

মেট্রোরেলে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য লাইনটির ওপরে স্থাপন করা হচ্ছে ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম (ওসিএস) উত্তরায় ডিপোর ভেতর থেকে ভায়াডাক্টের ওপর কাজীপাড়া স্টেশন পর্যন্ত এই ওসিএস বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলমান আছে বাকি অংশে। ভায়াডাক্টের ওপর দশমিক ৭২ কিলোমিটার রেললাইনের পাশাপাশি ডিপোর ভেতরেও বসানো হয়েছে ১৬ দশমিক কিলোমিটার রেলপথ।

প্রথম অংশে মেট্রো স্টেশনের সংখ্যা নয়টি। এর মধ্যে উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ পল্লবী স্টেশনের ছাদ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে এসব স্টেশনের প্লাটফর্মের ওপর স্টিলের কাঠামোর শেড নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। অন্যদিকে মিরপুর ১১, মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া আগারগাঁও স্টেশনের ছাদ নির্মাণকাজ চলমান আছে। ছাদের কাজ শেষ হলেই নির্মাণ করা হবে প্লাটফর্ম। তার ওপর স্টিলের কাঠামোর শেড। মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর কোনোটি দ্বিতল, কোনোটি তিনতলা বিশিষ্ট। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য রয়েছে সিঁড়ি লিফটের ব্যবস্থা। ভেতরে টিকিট কাউন্টারের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনাও গড়ে তোলা হচ্ছে।

ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল লাইনে চলাচলের জন্য জাপান থেকে আনা হচ্ছে ২৪ সেট ট্রেন। ট্রেনগুলোয় ডিসি ১৫০০ ভোল্টেজ বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা থাকবে। স্টেইনলেস স্টিল বডির ট্রেনগুলোয় থাকবে লম্বালম্বি সিট। প্রতিটি ট্রেনে থাকবে দুটি হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রতিটি বগির দুপাশে থাকবে চারটি করে দরজা। জাপানি স্ট্যান্ডার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংবলিত প্রতিটি টেনের যাত্রী ধারণ ক্ষমতা হবে হাজার ৭৩৮ জন। ভাড়া পরিশোধের জন্য থাকবে স্মার্টকার্ড টিকেটিং ব্যবস্থা। এর প্রথম ট্রেনটি মার্চ জাপানের কোবে বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে বলে গতকাল জানিয়েছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, সব কিছু ঠিক থাকলে ট্রেনটি দেশে এসে পৌঁছাতে সময় লাগবে অন্তত দুই মাস। বাংলাদেশের মোংলা বন্দর হয়ে উত্তরায় মেট্রোরেলের ডিপোতে প্রথম সেট ট্রেনটি এসে পৌঁছানোর সম্ভাব্য তারিখ আগামী ২৩ এপ্রিল।

মেট্রোরেলের দ্বিতীয় অংশটি আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। অংশে মোট সাতটি স্টেশন। বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় মতিঝিলে হবে এসব স্টেশন। গত জানুয়ারি পর্যন্ত মেট্রোরেলের দ্বিতীয় অংশের নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ছিল প্রায় ৫৮ শতাংশ। 

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মেট্রোরেলের লাইনটি মতিঝিল থেকে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত বাড়িয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে ডিএমটিসিএল। মতিঝিল-কমলাপুর অংশের দৈর্ঘ্য দশমিক ১৬ কিলোমিটার। নির্মাণ-পূর্ববর্তী কাজগুলো বর্তমানে গুছিয়ে নিচ্ছে সংস্থাটি।

লাইনটি নির্মাণে খরচ হচ্ছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। উত্তরা-আগারগাঁও অংশটি নির্মাণ করছে ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। অন্যদিকে আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার অংশ জাপানের টেক্কেন করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশের আব্দুল মোনেম লিমিটেড। আর কারওয়ান বাজার-মতিঝিল অংশ নির্মাণ করছে জাপানি সুুমিতোমো মিতসুই কনস্ট্রাকশন ইতাল-থাইয়ের জয়েন্ট ভেঞ্চার।

উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের পাশাপাশি ঢাকায় আরো পাঁচটি মেট্রোরেল গড়ে তুলবে সরকার, যেগুলোর কোনোটি হবে উড়ালপথে, কোনোটি পাতালপথে। কোনো কোনোটি আবার উড়াল-পাতাল সমন্বয় করে নির্মাণ করা হবে। সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যেই সবগুলো মেট্রোরেল বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন