মঙ্গলবার | এপ্রিল ২০, ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

দর্শনার্থীদের চাপে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলুক সব সরকারি হাসপাতাল

হাসপাতালে একটি চিকিৎসা সেবাবান্ধব পরিবেশ বিনির্মাণের সঙ্গে অনেক বিষয় যুক্ত। তার মধ্যে অন্যতম বিবেচ্য সুষ্ঠু দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা। কেবল পরিবেশ উন্নয়ন নয়, মানসম্মত নিরাপদ চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিতেও এটি আবশ্যক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা এখনো বেশ নাজুক। এমনিতেই রোগীর চাপে অনেকটা বেসামাল সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। তার মধ্যে রোগীর সঙ্গে আসা দর্শনার্থীরা বাড়তি সমস্যা সৃষ্টি করছে। চিকিৎসাকালে সর্বোচ্চ দুজনের সুযোগ থাকলেও হাসপাতালে আসছে রোগীপ্রতি এর চেয়ে বেশিসংখ্যক দর্শনার্থী। এতে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি বৃদ্ধির খবর মিলছে। অবস্থায় সরকারি হাসপাতালগুলোয় দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সেবা খাতের আর দশটি প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। অসুস্থতায় রোগীর চিকিৎসা নেয়ার ভরসাস্থল হওয়ায় হাসপাতালে সুশৃঙ্খল, আরামপ্রদ, নির্ঝঞ্ঝাট একটি পরিবেশ ভীষণ প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় একটি নৈরাজ্যিক অবস্থা বিরাজ করছে। মানুষের চাপে চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীদের সুষ্ঠুভাবে চলাচল দায়। চত্বর, করিডর থেকে ওয়ার্ড সবখানে হইচই, চিত্কার-চেঁচামেচি। রোগীর চেয়ে দর্শনার্থী আসছে বেশি। একে তো তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক অভিজ্ঞতা এবং জীবাণু সংক্রমণ রোধে করণীয় বিষয়ে জ্ঞানের অভাব প্রকট, আছে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতিও। ফলে হাসপাতালের বিদ্যমান পরিস্থিতির ক্রমেই অবনমন ঘটছে। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না। প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্যের অবসান জরুরি।

সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত সেবা নিশ্চিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকগুলো চিহ্নিত করে নানা সময় সমর্থনমূলক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত বছর সরকারি হাসপাতালে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ। এতে প্র্রতিটি হাসপাতালে দর্শনার্থী পাস চালু, প্রতিটি পাসের জন্য নিরাপত্তা জামানত রাখা, হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স কর্মচারীদের পরিচয়পত্র দৃশ্যমানভাবে ঝুলিয়ে রাখা, দর্শনার্থীদের সবিস্তার তথ্যসংবলিত রেজিস্টার সংরক্ষণ করা, দর্শনার্থী-ব্যক্তির হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির ব্যবস্থা করা, দর্শনার্থীবিষয়ক নিয়মাবলি রোগী রোগীর সহায়তাকারীদের অবহিত করা এবং এসব নিয়ম সহজে দৃষ্টিগোচর হয় এমন স্থানে ঝুলিয়ে রাখার কথা বলা হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, অনেকটা সময় পেরোলেও এখনো অনেক হাসপাতালে আলোচ্য নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিত করা যায়নি, যার প্রত্যক্ষ পরিণাম দর্শনার্থীদের নিত্য উৎপাত। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে অর্থ জনবল সংকট উঠে এসেছে। এজন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ লোকবল চাওয়া হলেও তা না দেয়ার কথা উঠে এসেছে কারো কারো ভাষ্যে। অস্বীকারের উপায় নেই, সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনের তুলনায় সম্পদ সীমিত। এও সত্য যে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। যেখানে প্রয়োজন সেখানে ব্যয় হচ্ছে না, ভুল জায়গায় সম্পদ নিয়োজন হচ্ছে। কাজেই বরাদ্দ লোকবলের অভাবে আলোচ্য নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, এটি পুরোপুরি ঠিক নয়। এর জন্য কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা সদিচ্ছাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সদিচ্ছা থাকলে অন্য জায়গা থেকে সম্পদ সঞ্চালন করে নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন সম্ভব। সুতরাং এটিও বিবেচনার দাবি রাখে বৈকি।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাইরের দেশের অভিজ্ঞতা নীতি পর্যালোচনা সহায়ক হবে। ভারতে সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীপ্রতি মাত্র একজন দর্শনার্থী নেয়ার সুযোগ আছে, যিনি ২৪ ঘণ্টা রোগীর সঙ্গে থাকতে পারেন। তবে বাংলাদেশে সুযোগ সর্বোচ্চ দুজন রাখা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এতে বাড়তি চাপ পড়ছে। কাজেই এটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। অতিরিক্ত দর্শনার্থীর কারণে যেভাবে হাসপাতালে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, ইউটিলিটি সার্ভিস, রোগীর গোপনীয়তা বিঘ্নিত হচ্ছে, তা আশঙ্কাজনক। দেশে দর্শনার্থী কর্তৃক চিকিৎসক নার্স প্রহারের শিকার হওয়ার নজিরও কম নয়। নিরাপত্তার জায়গা থেকেও দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ দরকার। কাজেই এক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেক সময় অসচেতনতার কারণেও দর্শনার্থীরা হাসপাতালে অযথা ভিড় করছে। রোগী হাসপাতালের অসুবিধার কারণ হচ্ছে। দর্শনার্থীদের বিরত রাখতে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচিও নেয়া চাই। শুধু দর্শনার্থী নয়, হাসপাতাল চত্বরে হকার, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী, ভবঘুরে, ভিক্ষুকসহ নানা শ্রেণীর মানুষের অবাধ যাতায়াত দৃশ্যমান। এটিও সর্বতোভাবে বন্ধ করতে হবে। কর্তৃপক্ষের বলিষ্ঠ উদ্যোগে সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসার জন্য একটি কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন