মঙ্গলবার | এপ্রিল ২০, ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

চলতি সময়

করোনা-উত্তর নগর পরিকল্পনার কাঙ্ক্ষিত গতিপথ

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

নগর পরিকল্পনা জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে করোনার ব্যাপক বিস্তারের ফলে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে নগর পরিকল্পনার সম্পর্কের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে যখন শিল্পায়নের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন শহর এলাকায় ব্যাপকভাবে মহামারী জনস্বাস্থ্যগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, তখন উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ মানসম্মত আবাসনকে প্রাধান্য দিয়ে নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত করার প্রয়াস নেয়া হয়। নগর এলাকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সংক্রামক রোগের বিস্তার কমানো, বাসযোগ্য স্বাস্থ্যকর জনবসতি গড়ার লক্ষ্যে নগর পরিকল্পনা এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রগুলো পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল তখন। পরে সময়ের আবর্তে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নগর পরিকল্পনায় ক্রমাগত গুরুত্ব হারাতে থাকে। বর্তমান সময়ে কভিড মহামারীর বৈশ্বিক বিস্তার, বিশেষত নগর এলাকায় কভিডের ভয়াবহতা আমাদের নগর পরিকল্পনার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের গভীর সংযোগের বিষয়টি নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যের জন্য নগর পরিকল্পনা প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশের পরিকল্পনাবিদদের জাতীয় পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) নভেম্বর পালন করেছে বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস।

ব্যাপক নগরায়নের প্রভাবে আমাদের শহরগুলো ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে এবং তার ফলে আমাদের নগর এলাকার মানুষের জনস্বাস্থ্য চরমভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন। আমাদের শহর এলাকার বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ দূষণ যথা বায়ু, পানি, শিল্প শব্দ দূষণ, বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা, সবুজায়ন হ্রাস পাওয়া, প্রাকৃতিক জলাধারের দখল-দূষণ এবং নগর এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সংক্রামক-অসংক্রামক সব ধরনের রোগ দিনে দিনে বাড়ছে এবং এতে আমাদের শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

. আধুনিক নগর পরিকল্পনায় খেলার মাঠ-পার্ক-উদ্যান-জলাশয়কে বলা হয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো। অথচ আমাদের শহরগুলোতে এসব নাগরিক সুবিধাদির বড়ই অভাব। আর অল্পবিস্তর যেসব খেলার মাঠ কিংবা জলাশয় আছে, সেগুলো বেশির ভাগ দখল-দূষণের শিকার এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানে সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যে যারা এরই মধ্যে জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন, তাদের শৈশবের স্মৃতির অনেকটাই জুড়ে আছে পাড়ামহল্লা কিংবা স্কুলের মাঠে বন্ধু বা সহপাঠীর সঙ্গে সবুজ ঘাস কিংবা ধুলা-কাদা-বর্ষায় মাখামাখি সকাল-দুপুর-সন্ধ্যার কত টুকরো টুকরো স্মৃতির মালা। আমাদের শহরের নীতিনির্ধারকেরা আর ব্যবস্থাপকদের অনেকেই মনে করেন, এসব খেলার মাঠ, গণপরিসর, উদ্যান, জলাশয় শহরের জন্য বিলাসিতা। নগর শুধু উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির চাকা ঘোরানোর প্রাণহীন মেশিন কেবল। তাদের অনেকেরই ধারণায় শহরে শুধু ফ্লাইওভার, মেট্রো কিংবা পাতাল রেল করলে শহর আধুনিক হয়ে যায়। তারা হয়তো মনে করেন, নগরের শিশু-কিশোরেরা প্রাণহীন হূদয় নিয়ে জন্ম নেয়। তাই শহরের অতি অল্পসংখ্যক খেলার মাঠগুলো বিভিন্ন ক্লাব কিংবা দখলদারদের জন্য অন্যায় আর অন্যায্যভাবে বরাদ্দ দিয়ে দেয়া যায়। শহরের শিশুদের কাছে যখন খেলার বল এনে দেয়া হয়, তখন শিশুরা সকরুণ আবদার করেবাবা, তুমি কি আমাকে খেলার জন্য একটি খেলার মাঠ এনে দিতে পারো...এই কান্না, আবদার কিংবা দাবি কি পৌঁছে কারো কানে। নীতিনির্ধারকেরা কি শুনতে পান শহরের শত-সহস্র শিশু-কিশোরের এই বোবা কান্না আর করুণ অভিশাপ।

. আবার স্বাস্থ্য বলতে আমরা অনেক সময় শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য বুঝি, কিন্তু শহরের মানুষের মনের গভীরতলের খবর কজন রাখে। আর নীতিনির্ধারকদের তা নিয়ে ভাবার সময়টুকু কি আছে কিংবা আছে কি সেই ধরনের চিন্তার গভীরতা। শহরের পাশের ফ্ল্যাটের অচেনা প্রতিবেশী কিংবা পাড়ামহল্লার অস্তিত্বহীন অনুভবসবকিছু মিলে নগরের সবাই যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাসরত। তাই শহরের জনারণ্যে সবাই যেন একা। আমাদের নগর নিয়ে ভাবনার মধ্যে কোথায় যেন এক মারাত্মক ভুল হয়ে গিয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। আমাদের নগর পরিকল্পনায় তাই এখন প্রয়োজন শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সবার মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সামাজিকায়নের সুযোগ বাড়াতে খেলার মাঠ, পার্ক, গণপরিসর, বিনোদন সুবিধাদি, কমিউনিটি সেন্টার তৈরি এবং নিয়মিত সামাজিক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করার মাধ্যমে মানবিক জনবসতি সমাজ তৈরি করা; যেখানে মানুষ একে অন্যকে অনুভব করবে, পাড়ামহল্লা আর সমাজের সঙ্গে সবাই একাত্ম হবে। আমাদের নগর পরিকল্পনা বিন্যাসে মানবিক স্কেল বা পরিমাপককে প্রাধান্য দিয়ে নগর তৈরি করা দরকার, যেখানে মানুষের দৃষ্টি, মনন, হূদয় জনবসতি আর তার চারপাশকে অনুভব করতে পারে। এজন্য নগরের প্রতিটি অবকাঠামো, ভবনের আকার, আয়তন আর নকশাকে নিয়ে পরিকল্পনা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ভাবনারও প্রয়োজন রয়েছে।

. আমরা সবাই জানি, পরিচ্ছন্ন সবুজ পরিবেশ আমাদের রোগবালাইয়ের হাত থেকে বাঁচায় আর সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে সহায়তা করে। আমাদের বসতবাড়ির চারপাশ আর নগরের সব এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে পারলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ অনেক ধরনের রোগের প্রকোপ থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি। কঠিন পয়োবর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন এলাকা পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং জনবসতির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এখন করোনা-উত্তর নগর পরিকল্পনায় অন্যতম গুরুত্বের দাবি রাখে। একই সঙ্গে আমাদের নগর এলাকার সঠিক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা তৈরি এবং তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্প এলাকা বসত এলাকা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারলে শিল্প দূষণ রোধ করার পাশাপাশি আমাদের বসবাসের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

. আমাদের আবাসিক ভবনগুলোতে সূর্যের আলো-বাতাস প্রবেশের সব পথ আমরা রুদ্ধ করে রেখেছি। আর এখন করোনার সময় আমরা শিক্ষা পেয়েছি আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে সূর্যের আলো প্রয়োজন, রোগ-জীবাণু থেকে বাঁচতে ঘরের ভেতরে বায়ুপ্রবাহের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ভবনের গায়ে গায়ে ঘেঁষে সারি সারি ইমারতের মাধ্যমে যে শহর আমরা বানিয়েছি, সে শহরের শিশু-কিশোরদের শারীরিক মানসিক বিকাশের কথা আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম।

প্রকৃতির স্নিগ্ধ বাতাসের পরশ গায়ে না মেখে আর সূর্যের রোদমাখা আলোর ছোঁয়াহীন কৃত্রিম আলোয় বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরেরা কীভাবে স্বাস্থ্যকর জীবন পাবে আর চিন্তাশীল মানবিক বোধে বেড়ে উঠবে সে চিন্তা আমরা করিনি। যে শিশু-কিশোরেরা আকাশ দেখে না, সূর্যের আলো গায়ে মাখে না কিংবা ভরা পূর্ণিমার জোছনার আলোয় যার মন-প্রাণ আন্দোলিত হওয়ার সুযোগ পায় না, এসব শিশু-কিশোরের কাছে সৃষ্টিশীলতা, পরার্থপরতা কিংবা উদারচিত্ত মানুষের গুণাবলি আশা করাটা কেবলই অরণ্যে রোদন। ফলে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষের সুস্থভাবে বসবাসের জন্য ভবনের ভেতর সূর্যের আলো বাতাসের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা দরকার। ভবনগুলোর ভেতর সূর্যের আলো, বায়ুপ্রবাহের ব্যবস্থা করতে ইমারত-সংশ্লিষ্ট আইন-বিধিবিধান নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেয়া জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য একান্ত প্রয়োজন।

. মানসম্মত আবাসনকে বিবেচনা করা হয় উন্নয়নের প্রধান অনুঘটক আর তাই আমাদের জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সবার জন্য মানসম্মত সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা একান্ত দরকার। নগর এলাকায় বিশালসংখ্যক মানুষের অস্বাস্থ্যকর বস্তি আর বসতিকে মানসম্মত সাশ্রয়ী আবাসনে রূপান্তর করতে না পারলে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়ন আর জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কখনই সম্ভব হবে না। মহামারীর সময়ে নিম্ন আয়ের বস্তির ভেতর মানুষের বসবাসের প্রয়োজনীয় জায়গা আর শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব কিনা সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজ না করে সবার জন্য মানসম্মত সাশ্রয়ী আবাসন তৈরির জন্য রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দিকে দৃষ্টি ফেরানো করোনা মহামারীর অন্যতম বড় বার্তা হওয়া উচিত। আবাসনকে শুধু বাজার অর্থনীতির ওপর ছেড়ে দিয়ে আবাসন সমস্যার সমাধান না খুঁজে রাষ্ট্র কীভাবে মানুষের মৌলিক দাবি মেটানার উদ্যোগ পন্থা বের করতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের। উপরন্তু যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করার পাশাপাশি নগর এলাকায় সবার জন্য সাশ্রয়ী অভিগম্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সামাজিক বৈষম্য দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা পদক্ষেপ অতি জরুরি।

. আমাদের বাতাস বিশ্বের মধ্যে অন্যতম দূষিত, যা আমাদের মারাত্মক সব রোগের মৃত্যুর কারণ। আমাদের খাল-বিল, নদী-জলাশয়ের পানি দূষিত, যার মধ্যে জলজ বাস্তুসংস্থান এখন মৃত; যানজট আর জলজটে জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির; নগর এলাকার চারপাশে শব্দ দূষণ, দৃষ্টি দূষণ, কঠিন পয়োবর্জ্যের অব্যবস্থাপনা আর শিল্প দূষণসবকিছু মিলিয়ে নগরে মানুষের শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্য এখন মৃতপ্রায়। ফলে নগর এলাকায় বায় দূষণ, পানি দূষণ, শব্দ দূষণ, শিল্প দূষণসহ সব প্রকার পরিবেশ দূষণ বন্ধ করার মাধ্যমে বসবাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করে টেকসই স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করার, রাষ্ট্রীয় বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন করার উদ্দেশ্যে নগর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার সার্বিক দর্শন সাজানো উচিত জনস্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে।

. নগর এলাকার বিদ্যমান নাগরিক সেবা কমিউনিটি সুবিধাদি, সড়ক ড্রেনেজ অবকাঠামো, পার্ক, খেলার মাঠ, জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান প্রভৃতির পরিমাণের ওপর কাঙ্ক্ষিত জনসংখ্যা এবং এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব নির্ধারণ করার মাধ্যমে নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত। অন্যথায় নগর এলাকার ভার বহনক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে নাগরিক সুবিধাদি, অবকাঠামো, পরিবেশ, প্রতিবেশ প্রভৃতির ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপের কারণে নগরের বাসযোগ্যতা জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। কভিড মহামারীর শিক্ষাকে সামনে রেখে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য তথা এসডিজির টেকসই নগর জনবসতি গড়ার লক্ষ্যে সবার জন্য জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নগর পরিকল্পনা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য পরিকল্পনাগত কৌশল পন্থায় আমাদের আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবেশ, প্রতিবেশকে সমুন্নত রেখে মানবিক অন্তর্ভুক্তিমূলক শহরই পারে আমাদের জনস্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিতে। আমাদের আগামী দিনের নগর পরিকল্পনার গতিপথ সেদিকেই হওয়া উচিত।

 

. আদিল মুহাম্মদ খান: নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন