মঙ্গলবার | এপ্রিল ২০, ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

শ্রদ্ধাঞ্জলি

সততা ও নীতিতে ব্যাংকারদের অনুসরণীয় হয়ে থাকবেন

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

একে একে আমাদের সময়কার নীতিবান মানুষেরা চলে যাচ্ছেন। গতকাল খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদও মারা গেছেন। এটা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের জন্য শোকের বেদনার। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের সঙ্গে আমার চেনা-জানা অনেক আগে থেকেই ছিল। নানা সময়ে আমাদের আলাপচারিতা হয়েছে। এখন সেগুলো মনে পড়ছে। এককালে আমি পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলাম। তখন তার সঙ্গে অফিশিয়াল মিথস্ক্রিয়া হতো। তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। তিনি সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে। তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গর্ভনর নিযুক্ত হয়েছিলেন, সেটি সম্ভবত ১৯৯৮-২০০০ সালের দিকে। আমি গভর্নর হওয়ারও সাত-আট বছর আগে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি বেসরকারি পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। তাকে প্রধান করে ২০১০ সালে দেশের পুঁজিবাজারে ধসের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডকে পুনরুদ্ধারে হাইকোর্টের আদেশে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তাকে। যদিও স্বাস্থ্যগত কারণে সেখান থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। মোটামুটিভাবে এই হলো তার কর্মজীবনের পরিভ্রমণ।

কর্মজীবনে সরাসরি সহকর্মী হওয়ার সুযোগ না ঘটলেও খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের সঙ্গে আমার পেশাগত সংযোগ ছিল। পেশাগত কারণে আমাদের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে দেখা হতো। আর্থিক খাতের অনিয়ম বিষয়ে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। সেগুলো সমাধানে নানা চিন্তাপ্রদ পরামর্শও দিতেন। পেশাগতভাবে অবসর নেয়ার পরও তিনি আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংক খাত নিয়ে বেশ সক্রিয় ছিলেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাষী সাহসী ছিলেন, সৎ ছিলেন। খুব স্পষ্টভাবে তিনি ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো তুলে ধরতেন বিভিন্ন বক্তব্যে। এটা আসলে ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতের জন্য বেশ প্রাসঙ্গিক ছিল। কিছুদিন আগেও তার সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছিল আর্থিক খাতের ব্যাপারে। তিনি আসলে থেমে থাকেননি কোনোদিনই। আশির মতো বয়স হয়েছিল। কিন্তু বয়সেও তিনি নিরলস নিষ্ঠাবান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় যেসব বক্তব্য-পরামর্শ দিয়েছেন এবং রিপোর্টগুলো দিয়েছেন সেসবের মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা, বিবেচনায় নেয়া ব্যাংক খাতের জন্য ভালো হবে। তাতে সর্বোপরি দেশের জন্যও উপকার হবে।

সদ্যপ্রয়াত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি তেমন নেই। তবে তার সঙ্গে আমার কিছুদিন পরপর টেলিফোনে কথা হতো। বছর দুয়েক আগে একটি সেমিনারে অংশ নিয়েছিলাম। আমি বিশেষ অতিথি ছিলাম, তিনিও সেখানে আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন। গভর্নর থাকতে ফরেন এক্সচেঞ্জের ওপর একটা কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানেও অন্যতম আলোচক ছিলেন তিনি। দুটি স্মৃতি বিশেষভাবে মুহূর্তে মনে পড়ছে। তদুপরি বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে তার সঙ্গে আমার মিথস্ক্রিয়া হতো। পূবালী ব্যাংকের এমডি থাকতেও কথাবার্তা হতো। তাছাড়া গর্ভনর হিসেবে আমার কার্যমেয়াদে আগে তার অধীনে যারা কাজ করেছেন তারা তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা তার নিষ্ঠার কথা বলতেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তার যে অবদান, তা এখনো সবাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

ব্যাংক খাতে এমডি বা চেয়ারম্যান থাকলে অনেকের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি সততার প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু তার ক্ষেত্রে ধরনের কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তার পেশাগত একাগ্রতা, সততা, দায়িত্বশীলতা কাজের প্রতি আগ্রহ কোনোটিই কমতি ছিল না। এটা উদাহরণযোগ্য। ব্যাংকাররা তাকে অনুসরণ করতে পারেন। তার জীবনযাপন অত্যন্ত সাদাসিধে। নিরহংকার মানুষটি মৃদুভাষীও ছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি একজন উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন।

মূলত পেশাগত দক্ষতা আর সততার বলেই তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে অর্জন করেছেন বিশেষ মর্যাদার স্থান। গণমাধ্যম সামাজিক মিডিয়ায় তার মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে এটি তারই প্রমাণ। আর্থিক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে একজন সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে আমরা তার অভাব অনেক দিন অনুভব করব। তার মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে দেশের। স্নাতক স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা করেছেন ভূগোল শাস্ত্রে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকার হওয়ার অভিপ্রায়ে ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হন। নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা কর্মকুশলতার গুণে ধাপে ধাপে উন্নীত হন সর্বোচ্চ পদে।

শুধু নিষ্ঠাবান ব্যাংকার নয়, সংগঠক হিসেবেও খ্যাতি কুড়িয়েছেন। তার ছিল বহুধা পরিচয়। ভালোবাসতেন শিশুদের। আমৃত্যু জড়িয়ে ছিলেন কচিকাঁচার মেলা সঙ্গে। লেখক হিসেবেও উজ্জ্বলতার স্বাক্ষর রেখেছেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। স্বপ্ন দেখতেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার। তার কীর্তি, কর্তব্যবোধ, নিষ্ঠা বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দেয়া এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হবে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য। এদিকটাতেই দৃষ্টি দিতে হবে।

ন্যায়নিষ্ঠ এই ব্যক্তিত্বের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

 

. সালেহউদ্দিন আহমেদ: সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন