মঙ্গলবার | মার্চ ০৯, ২০২১ | ২৫ ফাল্গুন ১৪২৭

শিল্প বাণিজ্য

সানেমের জরিপ

করোনাকালে আয় কমেছে ৭০ শতাংশ মানুষের

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনা মহামারী বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। মহামারীর ধাক্কায় অনেকে বেকার হয়েছেন। অনেকের আয়ে টান পড়েছে। ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে করোনাকালে ৭০ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং অ্যাকশনএইডের যৌথ উদ্যোগে দেশের চারটি জেলার (বরগুনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী কুড়িগ্রাম) হাজার ৫৪১ খানার ওপর চালানো জরিপের ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মহামারী এবং বাংলাদেশের যুব জনগোষ্ঠী: চারটি নির্বাচিত জেলার জরিপের ফলাফল শীর্ষক এক ওয়েবিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের রিসার্চ ইকোনমিস্ট মাহতাব উদ্দিন।

জরিপের ফলাফল উপস্থাপনের সময় অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর করোনা মহামারীর প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পেতে সানেম এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের নির্বাচিত চারটি জেলার ওপর ২০২০ সালের ১৩-১৭ ডিসেম্বর একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে তরুণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী ইত্যাদির ওপর করোনা মহামারীর প্রভাব বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

সানেমের রিসার্চ ইকোনমিস্ট আরো বলেন, জরিপে তরুণদের মধ্যে নাগরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের প্রবণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সচেতনতার মাত্রা বুঝতে চাওয়ার পাশাপাশি জেন্ডারবিষয়ক বিভিন্ন ইস্যু যেমন নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীর কর্মসংস্থান ক্ষমতায়ন এবং বিভিন্ন সেবা প্রাপ্তিতে নারীর অভিজ্ঞতা সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হয়েছে।

জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের নভেম্বরের তুলনায় ২০২০ সালের নভেম্বরে জরিপকৃত চারটি জেলায় মজুরি বা বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশের আয় কমেছে। সময়ের মধ্যে জরিপে অংশ নেয়া ২৮ শতাংশ মানুষের আয় অপরিবর্তনীয় রয়েছে। করোনাকালে বাকি শতাংশের আয় বেড়েছে।

জরিপে আরো দেখা গেছে, করোনা মহামারীর মধ্যে লোকসানের ঝুঁকি বেড়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। জরিপে অংশ নেয়া ৮২ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জানান, করোনা মহামারীতে তাদের আর্থিক লাভ আগের তুলনায় কমেছে। সাকল্যে ১৫ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার লাভ সময় অপরিবর্তিত ছিল। মহামারীর মধ্যেও লাভের মুখ দেখেছেন মাত্র শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। আর করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে না পেরে স্থায়ীভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন ৩১ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

উল্লিখিত চার জেলার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বোঝার ক্ষেত্রে ১৫-৩৫ বছর বয়সী হাজার ২৭০ জন নারী-পুরুষকে প্রশ্ন করে জানা যায়, করোনাকালে বিবাহিত নারীদের ৩৭ শতাংশ স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে। স্বামী ছাড়াও অন্যদের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ নারী নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে। তবে প্রতিকার হিসেবে আইনের আশ্রয় নেয়ার হার বেশ নগণ্য। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, করোনাকালে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন মাত্র শতাংশ নারী।

এর পেছনের কারণগুলোও উঠে এসেছে জরিপের ফলাফলে। জরিপে অংশ নেয়া ৬৫ শতাংশ নারী বলছেন, শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তারা আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। লজ্জা বা ভয়কে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন জরিপে অংশ নেয়া ৩২ শতাংশ নারী। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের ভয়কে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ১৩ শতাংশ এবং আইনের প্রতি আস্থার অভাবকে চিহ্নিত করেছেন ১২ শতাংশ নারী।

গণপরিবহনে যাতায়াত করতে নিরাপদ বোধ করেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ৪০ শতাংশ নারী জানিয়েছেন তারা নিরাপদ বোধ করেন। জরিপে ৬৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। ১৪ শতাংশ নারী জানিয়েছেন তারা ফেসবুক বা ইউটিউব ব্যবহার করতে পারেন। পরিবার-পরিকল্পনার ধারণা আছে ৬৫ শতাংশ নারীর।

করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের সুযোগ পাননি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কুড়িগ্রামে ৬২ শতাংশ, সাতক্ষীরায় ৫৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫১ শতাংশ এবং বরগুনায় ৪৬ শতাংশ। গড়ে চার জেলার মোট ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের সুযোগ পায়নি। করোনাকালে চার জেলার মোট ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর কোনো ডিজিটাল ডিভাইস ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুরু হলে নিয়মিত পড়াশোনায় ফিরবেন না অথবা বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে এমন মত দিয়েছে চার জেলার দশমিক ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী। জরিপে দেখা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুবকদের অংশগ্রহণের হার দশমিক ৬২ শতাংশ। কুড়িগ্রামে হার দশমিক ৬৭ শতাংশ, সাতক্ষীরায় দশমিক ৫৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ বরগুনায় দশমিক ৩১ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের গবেষণা পরিচালক . সায়মা হক বিদিশার সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব দিলরুবা শারমীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান . সানজিদা আখতার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক . আবু ইউসুফ, সুইসকনট্যাক্টের টিম লিডার নাদিয়া আফরিন শামস এবং ব্র্যাকের দিবা ফারাহ হক। ওয়েবিনারে বিশেষ বক্তব্য দেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক . সেলিম রায়হান।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন