রবিবার | ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম পাতা

ভোলা থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রামে অভিবাসন সবচেয়ে বেশি

মনজুরুল ইসলাম

সাল ১৯৭০, নভেম্বর মাসের ১২ তারিখ। রমজান মাস। সারা দিনই বৃষ্টি ছিল, সঙ্গে টানা বাতাস। উপকূলের ওপর দিয়ে ওই দিনটিতে ২০০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। সৃষ্টি হয় জলোচ্ছ্বাস। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় দ্বীপজেলা ভোলাসহ উপকূলীয় অসংখ্য জনপদ। প্রাণহানি ঘটে ভোলার লক্ষাধিকসহ উপকূলের পাঁচ লাখ মানুষের। ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায় প্রায় এক সপ্তাহ পর।

স্বজন হারানোর স্মৃতি সেই সময়ে বেঁচে যাওয়াদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এখনো। সেদিন মুহূর্তের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় জনপদগুলোকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, মাঠঘাট এমনকি গাছের সঙ্গে ঝুলে ছিল শত শত মৃতদেহ। সেদিনের জলোচ্ছ্বাসে গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। স্বজন হারানোদের কান্নায় উপকূলের আকাশ-বাতাস ছিল ভারী।

ভোলার শরিফ মোল্লা জলোচ্ছ্বাসে স্বজন হারানোদের একজন। ওই সময় ১২ বছরের শরিফ ছিলেন পাঁচজনের পরিবারের বেঁচে যাওয়া একমাত্র সদস্য। তিনি সেদিনের ভয়াল স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ওই সন্ধ্যায় বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। রাত দুইটা-আড়াইটার দিকে জলোচ্ছ্বাসের পানি ১৪ ফুট উঁচু বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গোটা এলাকা তলিয়ে দেয়। পানিতে ভেসে যায় অগণিত মানুষের মরদেহ। জলোচ্ছ্বাস গোটা জেলা তছতছ করে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে দিয়েছিল। এর মধ্যেই সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনিসহ পরিবারের আট সদস্য। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শরিফ মোল্লা তার দুই ভাইবোনসহ ঢাকায় চলে আসেন তাদের মা-বাবা। সেই থেকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ঠিকানা ঢাকা।

শরিফ মোল্লা ১৪ ফুট উঁচু পানির কথা বললেও ১২ নভেম্বরে জলোচ্ছ্বাসটি হয়েছিল -১০ ফুট উচ্চতায়। কেউ গাছের ডালে, কেউ উঁচু ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে প্রাণে রক্ষা পেলেও তিন-চারদিন অভুক্তই কাটিয়েছিলেন অনেকে। তত্কালীন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা অনেকটা দুর্বল থাকায় উপকূলের অনেক মানুষ ঝড়ের পূর্বাভাসই পায়নি। সত্তরের হারিকেনরূপী ঝড়টি উপকূলীয় ভোলা, বরিশাল, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনাসহ ১৮টি জেলায় আঘাত হানে। তবে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় ভোলাবাসীকেই। আর ওই ক্ষতিই অভিবাসনমুখী করে তোলে ভোলাবাসীকে। সাম্প্রতিক সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রামে অভিবাসন হওয়া ৩০ শতাংশ পরিবারই ভোলা বরিশাল জেলার।

প্রায় পাঁচ বছর আগে ভোলার লালমোহন উপজেলা থেকে ঢাকায় আসেন মুকুল হোসেন। কয়েক বছর মিরপুর দুয়ারীপাড়া বস্তিতে থেকেছেন রিকশাচালক মুকুল। ভোলায় থাকাকালে দৈনিক মজুরিতে ট্রলারে করে মাছ ধরার কাজ করতেন। তবে আয় কম হওয়ায় পরিবার নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। দুয়ারীপাড়ার ওই বস্তিতে মুকুল হোসেনের মতো আরো অন্তত ২০ পরিবার রয়েছে, যারা প্রত্যেকেই বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসেছেন।

মুকুল হোসেন গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রামে এখনো বাড়ি আছে। তবে মাছ ধরে যে পারিশ্রমিক পাওয়া যেত, তা দিয়ে সংসার চলছিল না। ঢাকায় তার স্ত্রী একটি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন। কারখানায় কাজ না থাকলে অনেক সময় বাসাবাড়িতেও কাজ করেন তার স্ত্রী। দুজনের আয়ে ভালোই চলছে। দুই সন্তান পড়ালেখাও করতে পারছে। ভোলায় থাকলে যেটা সম্ভব হতো না।

শুধু নিম্নবিত্তই নয়, জীবিকা উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নগরমুখী হচ্ছে মানুষ। যা মূলত অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপ বলছে, মহানগরী ঢাকা চট্টগ্রামে প্রায় ৩০ শতাংশ খানা (একই রান্নায় খাওয়া পরিবার) স্থানান্তরিত হয়েছে ভোলা বরিশাল জেলা থেকে। এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরের জলবেষ্টিত দেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলা থেকে ১৯ দশমিক ২৮ শতাংশ পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কাজের সন্ধানসহ নানা প্রয়োজনে ঢাকা চট্টগ্রামে এসেছে। আর বরিশাল থেকে ঢাকা চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছে ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ পরিবার।

দেশের আটটি বিভাগীয় শহরের ৮৬টি স্থানে হাজার ১৫০টি পরিবারের মধ্যে জরিপ চালিয়ে এসব তথ্য দিয়েছে বিবিএস। নগরাঞ্চলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের উপায় নির্ধারণের লক্ষ্যে খাদ্যনিরাপত্তা আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণের জন্য ২০১৯ সালের -২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিপটি চালানো হয়।

নগর আর্থসামাজিক অবস্থা নিরূপণ জরিপ ২০১৯ শীর্ষক জরিপটি নিম্ন আয়ের মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে উচ্চ, মধ্যম নিম্ন আয়ের ভিত্তিতে পরিচালনা করে বিবিএস। ঢাকা ছাড়াও বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ময়মনসিংহে জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, দেশের বড় শহরগুলোতে যে মানুষ বাস করে তার ২৮ শতাংশ পরিবার সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর। বাকি ৭২ শতাংশ বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছে। তবে রাজধানী ঢাকায় হার ৮০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ ঢাকার ৮০ ভাগ পরিবার বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছে। যদিও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের শিকার বিপুলসংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, নাগরিক সুবিধাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিবিএসের জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নগরায়ণের নাটকীয় বৃদ্ধি নগর দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। কাজ, শিক্ষা, জলবায়ুর প্রভাব থেকে রক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে লাখ লাখ মানুষ পল্লী অঞ্চল ছেড়ে শহরাঞ্চল বা শহরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে স্থানান্তরিত হয়। কিছু কিছু স্থানান্তর স্বেচ্ছায় হলেও মূল উদ্বেগ হলো ঝুঁকির মুখে থাকা খানাগুলোর অনিচ্ছাকৃত স্থানান্তর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে যোগসূত্র।   

বিবিএস জরিপ অনুযায়ী, খানা স্থানান্তরে শীর্ষ জেলা ভোলা বরিশালের পরই রয়েছে সিরাজগঞ্জ ঢাকা। দুটি জেলা থেকে যথাক্রমে দশমিক ৬১ দশমিক ৪১ শতাংশ পরিবার ঢাকা চট্টগ্রাম মহানগরে স্থানান্তরিত হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা জেলা থেকে দশমিক ২৫ শতাংশ, কিশোরগঞ্জ থেকে দশমিক ৮১, চট্টগ্রাম থেকে দশমিক ২৭, ফরিদপুর থেকে দশমিক ৯৬, চাঁদপুর থেকে দশমিক ১০, বাগেরহাট থেকে দশমিক ৭৯, বগুড়া থেকে দশমিক ৭৯, খুলনা থেকে শূন্য দশমিক ৩১, রাজশাহী থেকে শূন্য দশমিক শূন্য , সুনামগঞ্জ থেকে শূন্য দশমিক শূন্য , রাজবাড়ী থেকে দশমিক ৬৯, গোপালগঞ্জ থেকে শূন্য দশমিক ২৭, সিলেট থেকে শূন্য দশমিক শূন্য , নোয়াখালী থেকে দশমিক ১১, যশোর থেকে শূন্য দশমিক শূন্য শতাংশ পরিবার স্থানান্তরিত হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক . খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থনৈতিক সামাজিক সুবিধার কারণেই মানুষ প্রধানত অভিবাসী হয়। সেটা যেমন দেশের বাইরে, তেমনই দেশের ভেতরেও। দেশের ভেতরে এটি নির্ভর করে জীবিকার সহজলভ্যতার ওপর। সাধারণত নদীভাঙনপ্রবণ জেলা, উপকূলীয় এলাকা সর্বোপরি কাজের সুযোগ যেখানে কম সেখান থেকেই লোকজন মহানগরে পাড়ি দেয়। কারণ নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা ঢাকায় এসে দিনমজুর, রিকশা চালানোসহ যেকোনো একটা কাজ জোগাড় করে ফেলতে পারে; যা তাদের নিজ জেলা থেকে অভিবাসী হতে উৎসাহী করে। মহানগরমুখী অভিবাসনের ধারা বদলাতে হলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, বরাবরই বরিশাল বিভাগের জেলাগুলো দারিদ্র্যপ্রবণ। ফলে সেখান থেকে মহানগরমুখী অভিবাসনও বেশি। তবে আশার কথা হচ্ছে ওই অঞ্চলে পায়রা বন্দর হচ্ছে। সাতটি অর্থনৈতিক জোন করা হচ্ছে, পদ্মা সেতুসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণাঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়বে। মহানগরমুখী অভিবাসনও কমে আসবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন