রবিবার | ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

ফিচার

যে কারণে বাড়ছে ‘হলিস্টিক লাইফস্টাইলের’ গ্রহণযোগ্যতা

সানজিদা সামরিন

সুস্থভাবে জীবনযাপন করার জন্য হলিস্টিক লাইফস্টাইলের দিকে ঝুঁকছেন সচেতনরা। হলিস্টিক লাইফস্টাইল বলতে মূলত সামগ্রিক জীবনচর্চাকে বোঝায়, যেখানে শরীরের সঙ্গে মন ও আত্মার সমন্বয় রয়েছে। অর্গানিক ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, মেডিটেশন, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, যোগব্যায়াম, বডি ম্যাসাজ ও আরও অনেক স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এই পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। প্রাকৃতিক নিরাময় পদ্ধতি মেনে চলা হলিস্টিক লাইফস্টাইলের উপকারিতা বহুমূখী। এই জীবনচর্চা অনুশীলনকারীর জীবনের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।

হলিস্টিক লাইফস্টাইলের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে শেপ আপ হেলথকেয়ারের নিউট্রিশনিস্ট ও হলিস্টিক লাইফস্টাইল মোডিফায়ার জাকিয়া নাজনীন বলেন, হলিস্টিক লাইফস্টাইল একটা বড় বিষয় যেখানে- শরীর, মন ও আত্মার সংযুক্তি ঘটে। এই তিন বিষয়কে একসঙ্গে করেই ন্যুনতম সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে এই পদ্ধতি গুরুত্ব পাচ্ছে তার কারণ আমরা যারা শহরে থাকি তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যস্ততা অনেক বেশি।অন্যদিকে রয়েছে সময়ের স্বল্পতা। চাকরিজীবন, পড়াশোনা, ঘরের ব্যস্থতা, যোগাযোগ ইত্যাদি সবকিছুর জন্যই আমাদের নিজেদের মধ্যে অস্থিরতা ও মানসিক চাপ বাড়ছে দিনকে দিন।

অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ হচ্ছে। পাশাপাশি আভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আমরা যখন মানসিক চাপে থাকি তখন অ্যাড্রিনালীন গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই গ্ল্যান্ড আমাদের মেটাবলিজম সিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু হরমোন নিঃসরণ করে। সেক্ষেত্রে গ্ল্যান্ড যখন নিজেই স্ট্রেসড আউট থাকে তখন সে তার কাজ ঠিকভাবে করতে পারে না।ফলে হাইপোথাইরয়েডিজম, ডায়াবেটিস বা ব্লাড প্রেশার হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। হলিস্টিক লাইফস্টাইলে প্রাকৃতিক নিরাময় পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় বলে স্ট্রেস কমে, বাড়ে উদ্দীপনা, শরীর চাঙা থাকে, স্থিরতা বাড়ে ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা কমে।

হলিস্টিক লাইফস্টাইলের অন্যান্য উপাদানগুলো বজায় রেখে যদি অর্গানিক খাদ্যাভাস ও পুষ্টিকে উপেক্ষা করা হয় তাহলে পরিপূর্ণ ফলাফল পাওয়া সম্ভব না। এ জীবনচর্চায় ঘরে তৈরি অর্গানিক খাবারকে উৎসাহ দেয়া হয়। জাকিয়া নাজনীন বলেন, প্রক্রিয়াত খাবারকে আমরা না বলি। প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ খাবারের দিকে বেশি নজর দেয়া প্রয়োজন। যেটুকু সম্ভব রাসায়নিক কীটনাশক ও সার ব্যবহৃত হয় না এমন খাবার গ্রহণ করার চেষ্টা করতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, হলিস্টিক লাইফস্টাইলে আমরা বলতে চাই যে- খাবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।কিন্তু এটাই সব নয়।পাশাপাশি মানসিকভাবে অনেক বেশি স্থির হওয়া প্রয়োজন।যদি সতন্ত্রভাবে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারি তাহলে সামাজিকভাবেও আমরা সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবো। তবে মানসিক সুস্থতার জন্যও উপযুক্ত খাদ্যাভাস গড়ে তুলতে হবে।আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য অনেকটাই পাচনতন্ত্রের সঠিক ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আর পাচনতন্ত্র ভালো রাখতে ফার্মেনটেড খাবার ভীষণ কার্যকর। তাছাড়া মানসিক সুস্থতায় যেসব খাবারে ভিটিামিন বি১, বি২, বি৩, বি৫, বি১২ ও জিংক রয়েছে সেগুলো খাদ্যতালিকায় সংযুক্ত করা উচিৎ।     

হলিস্টিক লাইফস্টাইল সময়ে বাঁচার কথা বলে। জাকিয়া নাজনীন বলেন, আমাদের অবচেতন মন সাধারণত বর্তমান ও ভবিষ্যত এই দুই সময় নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে।কিন্তু হলিস্টিক লাইফস্টাইলে মন ও শরীরের সংযোগ ঘটায় মেডিটেশন। আর মেডিটেশন সবসময়েই বলে বর্তমান সময়ে উপস্থিত থাকার কথা।ভবিষ্যত নিয়ে সবসময়ই আমাদের মধ্যে একটা ভয় থাকে। কী হতে পারে ভেবে আমরা আতঙ্কিত হই আবার অতীত নিয়ে এক ধরনের ভাবনা সবসময়ই জর্জরিত করে থাকে।ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় মূলত বর্তমান সময়টা। একজন ব্যক্তির চিন্তার মতোই তার জীবন।তাই বর্তমানের সময়টাকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলে হোলিস্টিক লাইফস্টাইল। যেমন ছোট একটি উদাহরণ দিয়ে বলি- আমরা যখন ব্রিদিং এক্সারসাইজ করি- দম নেই, ধরে রাখি ও দম ছাড়ি। এভাবে যখন একাধিকবার করতে থাকি তখন কিন্তু অতীত বা ভবিষ্যতে অবস্থান করি না।সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে নিজের ও বর্তমানে। ভবিষ্যতে কী ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে বরং বর্তমানের সময়টাকে ভালোভাবে কাজে লাগানোই এর উদ্দেশ্য। তাছাড়া ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন তার ওপর নির্ভরও করে তার সুস্থতা। যেকোনো কিছুকেই ব্যক্তিগতভাবে ব্যাখ্যা না করে মানে ভালো বা খারাপ হিসেবে না দেখে যদি সামগ্রিকভাবে দেখা যায় তাহলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে।


হলিস্টিক লাইফস্টাইলের অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঘুম। নিশ্ছিদ্র ঘুম শরীর ও মন দুটোকেই ভালো রাখে। যাদের ঘুমের সাইকেল ঠিক নেই তাদের জন্য আমরা উদ্ভিদ ভিত্তিক খাদ্যাভাস ও ঔষধি গুণাগুন সম্পন্ন ভেষজের সমন্বয়ে স্লিপ সাইকেল পুনর্গঠন করার চেষ্টা করি। জানান জাকিয়া নাজনীন।  

অধিকাংশই মনে করেন, সুস্বাস্থ্যই সুখের মূল। কিন্তু হোলিস্টিক জীবনচর্চায় সুখী জীবনযাপনই একজন ব্যক্তিকে সুস্থ রাখে বলে বিশ্বাস করা হয়।নেতিবাচক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি জীবনে মানসিক চাপ বাড়ায়। 

মডেল: কাশফিয়া রহমান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন