মঙ্গলবার | মার্চ ০৯, ২০২১ | ২৫ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

করোনাকালে অনুমোদনহীন এমএলএমের তৎপরতা বেড়েছে

আর্থিক প্রতারণা বন্ধে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক

যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউর মতো প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের পর এমএলএম নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে অনাস্থা দেখা দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন নাম কৌশলে একই কায়দায় ব্যবসা করে যাচ্ছে। নতুন নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান এই বেআইনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান করোনার সুযোগে অনলাইনে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান কখনো উচ্চবেতনে চাকরি দেয়ার নামে, কখনো আকর্ষণীয় সুদ দেয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিশেষ অঞ্চলকে টার্গেট করে সেখান থেকে মোটা অংকের অর্থ তুলে নিয়ে চম্পট দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা অঞ্চলে সাম্প্রতিককালে এমএলএম ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠেছে এবং হাজার হাজার মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শনাক্ত করা দুটি এমএলএম কোম্পানি ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

এমএলএম ব্যবসার নামে দীর্ঘদিন এই প্রতারণা চলে এলেও যুবক ডেসটিনির কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার আগে নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য হয়নি। প্রথমে যুবক পরে ডেসটিনির প্রতারণা জানাজানি হলে সমাজে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও কিছুটা নড়েচড়ে বসে। কিন্তু ডেসটিনি যুবক কিংবা অন্যান্য এমএলএম প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রতারিত লাখ লাখ মানুষ অর্থ ফেরত পায়নি। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রণীত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইনে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করার পাশাপাশি পিরামিডসদৃশ বিপণন কার্যক্রম চালানো, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ মোড়কজাত না করে পণ্য বিক্রি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য বা সেবা বিক্রি না করা, পণ্য বা সেবার অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, নিম্নমানের পণ্য বা সেবা বিক্রি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তার পরও এত কোম্পানি কীভাবে অবৈধ এমএলএম ব্যবসা করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সমবায় মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি দমন কমিশন বাংলাদেশ ব্যাংকের হুঁশিয়ারি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান কোনো কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না মাল্টিপারপাসের নামে প্রতারণা। রীতিমতো আইন পাস করেও প্রতারণামূলক বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। হায় হায় কোম্পানিতে পরিণত হওয়া এসব সংস্থা লাখ লাখ দরিদ্র মানুষকে রাতারাতি পথে বসিয়ে ছাড়ছে। দুঃখের বিষয়, যারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে, তাদের নালিশ করার জায়গা পর্যন্ত জানা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিজ্ঞতা আরো ভয়াবহ। কর্তৃপক্ষ খোলাখুলি বলেছে যে ধরনের প্রতারণামূলক কাজে নিয়োজিত কোনো একটি কোম্পানির হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা দুদক কর্তৃক অবৈধ করা হলেই তারা অন্য নামে ভিন্ন এলাকায় আবার কার্যক্রম শুরু করে। অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে টাকা একবার বেহাত হয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়। অতএব, জনগণের অজ্ঞতা সরলতাকে পুঁজি করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন তাদের কষ্টার্জিত টাকা আত্মসাৎ করতে না পারে, সেজন্য সরকারের শক্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, নেপালসহ ৫২টি দেশে পিরামিড পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিং সরকারিভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। এমএলএম ব্যবসার বিভিন্ন প্রতারণার ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, সুইডেন প্রভৃতি দেশে এমএলএম কোম্পানির বিরুদ্ধে সরকার মামলা করেছে, কোম্পানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, জরিমানা আদায় করেছে। চীনে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের প্রতারণার পর এমএলএম ব্যবসা বন্ধের দাবিতে ১৯৯৮ সালে জনরোষ থেকে পুরো চীনে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর চীন সরকার এমএলএম ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরির কাজ শুরু করে এবং ২০০৫ সালে ডাইরেক্ট সেলিং আইন তৈরি করে। আমাদের দেশেও এরই মধ্যে লাখ লাখ মানুষ এমএলএম কোম্পানিগুলোর কাছে প্রতারিত হয়েছে। আইনে এটি নিষিদ্ধও করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন নজরদারি বৃদ্ধি এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো।

এমএলএম ব্যবসা দেশের সব এলাকায়ই ছোট আকারে প্রায়ই গজিয়ে ওঠে এবং অর্থ নিয়ে মতভেদের ফলে ঝরে যায়। জাতীয় পর্যায়ের খবরে এগুলো অনেক সময় আসে না। কিন্তু প্রতারকদের হাতে যখন বহুসংখ্যক মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ে, তখনই কেবল এটি পত্রিকায় ছাপা হয় এবং নিয়ন্ত্রকদের নজরে আসে। এমএলএম ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা না রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকবারই পত্রপত্রিকা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সেমিনার করে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে তেমন সুফল মেলেনি। তালিকাভুক্ত ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারে না, কথাটি বুঝতে পারা খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু একশ্রেণীর মানুষ এদের কাছে টাকা জমা দেয় এবং প্রতারিত হয়। এমএলএম ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা রেখে দেশে অনেক লোক নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। সরকার একাধিকবার কমিশন বানিয়েও যুবক, ডেসটিনির টাকা বিনিয়োগকারীদের ফেরত দিতে পারেনি। আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়ায় দু-একটি ব্যাংক কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকেও বিনিয়োগকারীর টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তালিকাভুক্তদেরই যখন এরূপ অবস্থা, তখন টাকা আত্মসাৎ করার ইচ্ছা নিয়েই জন্ম নেয়া এমএলএম কোম্পানিগুলোর অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান নামে এমএলএম ব্যবসা পরিচালনার খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতারণার ধরন পাল্টে -কমার্স, -বিজনেস ডিরেক্ট টেলিমার্কেটিং, ক্যাশলেস সোসাইটি প্রভৃতি নামে বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো কোম্পানি ফুড সাপ্লিমেন্ট, প্রসাধনসামগ্রী হারবাল ওষুধ বিপণনের নামে এমএলএম কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতারণার অভিযোগে সরকার এমএলএম বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছিল। আশা করা হয়েছিল পদক্ষেপে কাজ হবে। কিন্তু সেটি হয়নি। আমরা চাই প্রতারণা বন্ধে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করবে সরকার।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন