সোমবার | এপ্রিল ১৯, ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

শিক্ষা থেকে রোগ নিরাময়

জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

শিহাবুল ইসলাম

প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে প্রযুক্তি দুনিয়ায়। আজ যেটা কাল্পনিক, কাল সেটিকেই বাস্তবে পরিণত করছে প্রযুক্তি। আর এক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে- ভার্চুয়াল রিয়েলিটিকে (ভিআর)। কয়েক বছরের মধ্যে অভূতপূর্ব গতিতে ভার্চুয়াল জগতকে বাস্তব করে তোলার এ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, রোগ নিরাময় ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।  

আজকের ভিআর অ্যাপ্লিকেশনগুলো ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করে ব্যবহারকারীর চারপাশে উপস্থিত হওয়ার অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করতে ব্যবহারকারীর দর্শন ও শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে এটি ভার্চুয়াল জগতকে ব্যবহারকারীর কাছে পুরোপুরি বাস্তব হিসেবে উপস্থাপন করে। 

উদাহরণ হিসেবে বললে, ভিআর দুনিয়ায় মাথার উপর দিয়ে কিছু উড়ে যেতে দেখলে, ব্যবহারকারী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করার তাগিদ বোধ করেন। তার মানে হলো, ব্যবহারকারীর ইন্দ্রিয় ওই পরিস্থিতিকে বাস্তব মনে করছে। খুব শিগগিরই ভিআর নির্মাতারা এ হাইজ্যাকিং যন্ত্রটিতে স্পর্শ ও ঘ্রাণের অনুভূতি যুক্ত করতে চলেছেন। এ সময়ে ভার্চুয়াল দুনিয়া দেখার এ যন্ত্রগুলো সস্তা ও হালকাও হয়ে যাবে। 

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, আগামী কয়েক বছরে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) এবং মিক্সড রিয়েলিটির (এমআর) সম্মিলিত রূপ এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি (এক্সআর) মোড় ঘোরানো টেক ট্রেন্ডে পরিণত হবে। সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি এটি ক্লাউড সার্ভিসে যুক্ত হবে। এমনকি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বাস্তবসম্মত ভার্চুয়াল চরিত্রও তৈরি করবে। 

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি
এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যক স্টার্টআপ ও প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে প্যাকেজ অভিজ্ঞতা ও পরিষেবা সরবরাহ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্দান্ত কিছু ‘ফিচার’ তৈরি করেছে। বর্তমানে ফেসবুক, এইচটিসি ও ইউরোপীয় কমিশনের দূরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রমে এঙ্গেজ (ভিআর) প্লাটফর্ম ব্যবহার হচ্ছে।

২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভিআর ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত মেডিকেল শিক্ষার্থীরা সাধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত সমবয়সীদের চেয়ে কিছু নির্দিষ্ট বিষয় দ্রুত এবং আরো সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেন। ভিআরের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় পাঠদান ও শেখার বিষয়গুলো আরো কার্যকর হয়ে উঠবে। 

প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও ভিআর ঝামেলাপূর্ণ ও চাপযুক্ত অবস্থা সীমিত করতে এবং অংশগ্রহণকারীর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন উত্সব মৌসুমে যখন গ্রাহকের ভিড় থাকে সেই পরিবেশ মোকাবেলা করে কীভাবে কাজ করা যায়- তা নিয়ে ওয়ালমার্ট ভিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

শিল্প ও কাজের ক্ষেত্রে ভিআর
করোনা মহামারী কাজের ধরন বদলে দেয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছে। বাড়ি থেকে কাজ ও দলভিত্তিক কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভিআর প্রযুক্তিকে ব্যাপক সম্ভাবনাময় হিসেবে বর্ণনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন একটি টুল তৈরি করেছে স্পটিয়াল, যেটিকে তারা জুমের ভিআর সংস্করণ বলে বর্ণনা করছে। সংস্থাটি গত বছরের মার্চ থেকে  প্ল্যাটফর্মটির ব্যবহার ১ হাজার শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে।

২০১৮ সালে ভিআর বাণিজ্যিক সরঞ্জামগুলোর বাজারমূল্য ছিল ৮২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আর্টিলারি ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মধ্যে এটির বাজার দাঁড়াবে ৪২৬ কোটি ডলারে। 

গত বছর লকডাউন চলাকালীন বাড়ি থেকে কর্মরত কর্মীদের ওকুলাস ভিআর সরবরাহ করেছিল যোগাযোগ জায়ান্ট এরিকসন। সংস্থাটি ইন্টারনেট অব সেন্সেস নিয়ে কাজ করার বিষয়টি জানিয়েছে। এর মধ্যে স্পর্শ, স্বাদ, ঘ্রাণ এবং গরম ও ঠাণ্ডার মতো সংবেদনগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি আদান-প্রদান সম্ভব হবে। 

সামাজিকীকরণে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি
এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ভিআরভিত্তিক সামাজিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে ভিআর চ্যাট, অলটারস্পেস (AltSpace) ভিআর ও রিক রুমের মতো ভার্চুয়াল পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করা ও খেলা যায়। নতুন প্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে আগামী বছরগুলোতে এ প্রযুক্তি মূলধারার গ্রাহকদের কাছে আরো কার্যকর ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে বৈকি।  

গত বছর ফেসবুকের সিস্টার প্রতিষ্ঠান ভিআর হেডসেট প্রস্তুতকারক ওকুলাস ফেসবুক হরাইজন নামে একটি প্ল্যাটফর্ম উন্মোচন করেছে। ফলে আগামীতে ফেসবুকে ভিআর প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমানে বেটা সংস্করণে মানুষ সহযোগী অনলাইন জগৎ তৈরি ও শেয়ার করতে পারে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা গেম খেলা ছাড়াও সহযোগী প্রকল্পগুলোতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। 

গেম ও বিনোদনে ভিআর
ভিআর গেমিংয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে। আর এটিকে মার্কেটিংয়ের পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘কিলার অ্যাপ’। প্রচুর চিত্তাকর্ষক ও ইমারসিভ বিনোদন অভিজ্ঞতার জন্য এটি অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী লোকদের বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। ভিআর গেমিংয়ের মাধ্যমে ‘ম্যাট্রিক্স’ চলচ্চিত্রের মতো বাস্তবতা তৈরি হবে বলে মনে করছেন এ খাতের বিনিয়োগকারীরা। 

বিনোদনের জন্যও ভিআর বিশাল বাজার তৈরি করছে। যদিও সর্বাধিক ইমারসিভ ও চিত্তাকর্ষক প্রযুক্তি এখনো প্রচুর ব্যয়বহুল এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন। তবুও ঘরে বসে কিছুটা কম চিত্তাকর্ষক হলেও এ অভিজ্ঞতা দর্শকদের নতুন এক চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। 

রোগ নিরাময়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি 
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ব্যথা নিরাময়ে কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত। পাশাপাশি এ প্রযুক্তিগত চিকিৎসা রোগীদের হাসপাতালে থাকার সময়সীমা সংক্ষিপ্ত এবং চিকিত্সা ব্যয় কমিয়ে দেয়। এরই মধ্যে এ সম্পর্কিত অসংখ্য সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে, যা রোগীদের মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে সহায়তা করে। ইমারসিভ ভিআর প্রযুক্তি গতি ও ভিজ্যুয়াল ভিত্তিক অভিজ্ঞতা সরবরাহ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা দূর করতে সহায়তা করে। রোগীর চাপ ও উদ্বেগের বিষয় বোঝার মাধ্যমে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কার্যকর ওষুধ ছাড়া সমাধান দেয়। যেখানে প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হয় না। এছাড়া এটি আলঝেইমারের মতো স্মৃতিশক্তি হ্রাসের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে সহায়তা করে। 

কোনো অপারেশন করার আগে শরীরের যে অংশে অপারেশন করা হবে, সে অংশের অঙ্গগুলোর সুনির্দিষ্ট চিত্র সার্জনদের দেখে নিতে হয়। আর এক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সার্জনদের রিয়েল টাইমে ত্রিমাত্রিক চিত্র সরবরাহ করছে। এছাড়া ২০১৬ সালে রয়েল লন্ডন হাসপালে ডা. শফি আহমেদ প্রথম ভিআর সার্জারি করেছিলেন। এটি অলনাইনে রিয়েল টাইমে সবাই দেখতে পেয়েছিলেন। সেই প্রযুক্তি এখন সার্জনদের প্রশিক্ষণ ও অপারেশন অনুশীলনে ব্যবহার করা হচ্ছে।

(ফোর্বস ও গার্ডিয়ান অবলম্বনে)

লেখক: সংবাদকর্মী

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন