রবিবার | মার্চ ০৭, ২০২১ | ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭

শেষ পাতা

তিতাসের গ্যাসের চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ

ঠিকাদার নিয়োগেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ

আবু তাহের

তিতাসের পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ বাড়াতে ২০১৬ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয় পেট্রোবাংলা। প্রকল্পের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাসের লোকেশন--তে ওয়েলহেড কম্প্রেসার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয় সে সময়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রকল্পের পুরোটা সময় গেছে ঠিকাদার নিয়োগে। এখন নতুন করে প্রকল্পের আরো তিন বছর সময় বাড়ানোর কর্মপরিকল্পনা জমা দিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড।

সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ বাড়াতে নেয়া প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গ্যাস সরবরাহে। তিতাসের সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ আগের চেয়ে অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রথমত, ঋণের বিপরীতে সুদহার বাড়ে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সুবিধার আওতায় থাকা মানুষের দুর্ভোগও দীর্ঘ হয়।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের চাপ নিয়ে আসন্ন সংকটকে মাথায় রেখে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিতাস গ্যাস ফিল্ডের লোকেশন--তে ওয়েলহেড কম্প্রেসার স্থাপন শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ওই বছরের ১০ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি পাস হয়। ৯১০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প সরকার এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ওয়েলহেডে তিতাস গ্যাসের লোকেশন--তে গ্যাসের কম্প্রেসার স্থাপন করা হলে গ্যাসের সক্ষমতা হবে ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। তাতে গ্যাসের চাপ ১২০০-১৫০০ পিএসআরে উন্নীত হবে।

ওয়েলহেড কম্প্রেসার স্থাপনে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে সময়কাল শুরু হলেও মূলত ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের মধ্যদিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। জার্মানি ইন্ডিয়ার যৌথ একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়। পরামর্শক কোম্পানি নিয়োগেই কেটে যায় দুই বছর। এরপর প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কাজে যথাযথ কোম্পানি নির্বাচন করা নিয়ে কেটে যায় আরো দুই বছর। এরপর ২০২০ সালের ১৬ মার্চ বিজিএফসিএল বোর্ড এবং এডিবির অনুমোদনক্রমে আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিপরীতে চীনা একটি কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয়। জয়েন্ট ভেঞ্চার অব সিপিপি অ্যান্ড সিপিইসিসিকে সর্বনিম্ন সফল দরদাতা হিসেবে নির্বাচন করা হয় প্রকল্পে।

প্রকল্প নিয়ে বিজিএফসিএলের একটি সূত্র বলছে, ২০১৬ সালে প্রকল্প হাতে নেয়ার পর ওই বছরের শেষের দিকে একবার টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। আমেরিকান একটি কোম্পানি টেন্ডারে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু তারা যথাসময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়নি। পরে বিজিএফসিএলের বোর্ড সভায় ওই কোম্পানিকে বাদ দেয়া হয়। কোম্পানিটি তাদের কাজের পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দিতে পারেনি বলে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি সংস্থাটি। তবে প্রকল্প নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার অভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের কাজ না এগোনোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. আবুল কাশেম বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পের পুরো সময়টা গেছে ঠিকাদার কোম্পানি নির্বাচন করতে। সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানি পাওয়া গেলেও পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দিতে না পারায় কাজ এগোয়নি। তবে এখন প্রকল্পে চাইনিজ একটি কোম্পানিকে নির্বাচন করা হয়েছে। ইপিসি চুক্তির আওতায় এরই মধ্যে কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ইপিসি চুক্তির আওতায় চাইনিজ যে ঠিকাদার কোম্পানি নির্বাচন করা হয়েছে তাকে অ্যাডভ্যান্স পেমেন্ট বিল দাখিলের বিপরীতে চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে বিজিএফসিএল এই অর্থও পরিশোধ করেছে বলে পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। চুক্তি অনুসারে দেড় বছরের (৫৪০ দিন) মধ্যে কম্প্রেসার স্থাপনের কাজ শেষ করবে তারা।

প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এরই মধ্যে মালামাল আমদানির জন্য গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর এলসি খোলা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প থেকে খরচ কমিয়ে ২১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার হ্রাস করার প্রস্তাব জানিয়ে পেট্রোবাংলাকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। আশা করি নতুন মেয়াদ বাড়লে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্প শেষ করা যাবে।

প্রকল্প শেষ না হওয়ায় বিষয়টি জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব মো. আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, যথাসময়ে প্রকল্প শেষ না করা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে নির্দেশনা প্রকল্পের সমস্যা সময় সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে। যদি সেটা না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, দেশের পূর্বাঞ্চলের কূপগুলো থেকে উৎপাদিত গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির ম্যানিফোল্ড স্টেশনে সরবরাহ করা হয়। সেখান থেকে পাইপলাইনে তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম রাজশাহী অঞ্চলে সরবরাহ হয়। গ্যাস উত্তোলনের পর এক হাজার পিএসআই চাপে গ্রাহকের কাছে পৌঁছার কথা থাকলেও সরবরাহ লাইনে বিপরীতমুখী শক্তি বাধায় দূরত্ব অনুসারে ওই চাপ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তাছাড়া দীর্ঘদিন কূপ থেকে গ্যাস তোলা হলে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চাপ কমে আসে। চাপ বাড়াতে মূলত কূপে ওয়েলহেড কম্প্রেসার বসিয়ে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হয়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন