রবিবার | মার্চ ০৭, ২০২১ | ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭

শেয়ারবাজার

ব্যবসার শুরুতেই অলিম্পিক ফ্যাশনের আর্থিক জালিয়াতি

মেহেদী হাসান রাহাত

শতভাগ রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা হিসেবে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে অলিম্পিক ফ্যাশন লিমিটেড। ব্যবসা শুরুর প্রথম বছরেই আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে কোম্পানিটি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য কোম্পানিটি দুটি ভিন্ন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। অবশ্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটি অলিম্পিক ফ্যাশনের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার কথা অস্বীকার করেছে। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তদন্তে আর্থিক জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে।

অলিম্পিক ফ্যাশনের জালিয়াতির বিষয়ে বছরের ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের কাছে চিঠি দিয়েছে এফআরসি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মো. সাঈদ আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত অলিম্পিক ফ্যাশনের ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুটি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন একই বছরের এবং দুজন ভিন্ন নিরীক্ষকের মাধ্যমে প্রত্যয়ন করা হয়েছে। অথচ দুটি প্রতিবেদনের আর্থিক তথ্য-উপাত্তে ব্যাপক গরমিল রয়েছে। গরমিলের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। তাতে দেখা যায়, মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় দেখানো হয়েছে ১৯ লাখ টাকা। অথচ এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত একই অর্থবছরের আরেকটি আর্থিক প্রতিবেদনে আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে কোটি ৭২ লাখ টাকায়। একইভাবে মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনে মোট লোকসান ৪৫ লাখ, কর-পূর্ববর্তী লোকসান কোটি ৪১ লাখ, মজুদ পণ্য কোটি ৭০ লাখ, বিবিধ দেনাদার কোটি ৭৬ লাখ, চলতি সম্পদ কোটি ৮৩ লাখ, মোট সম্পদ ২৬ কোটি ৯০ লাখ মোট ইকুইটি ঋণাত্মক ৯৬ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনে মোট মুনাফা ১৬ লাখ, কর-পূর্ববর্তী লোকসান লাখ, মজুদ পণ্য ১০ লাখ, বিবিধ দেনাদার কোটি লাখ, চলতি সম্পদ কোটি ৮৯ লাখ, মোট সম্পদ ২০ কোটি লাখ এবং মোট ইকুইটি ৩৯ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

দুটি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে অলিম্পিক ফ্যাশনের কাছে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং নিরীক্ষক মতিন অ্যান্ড কোম্পানি এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানির কাছে চিঠির মাধ্যমে নিরীক্ষা নথি তলব করে এফআরসি। চিঠির জবাবে দুই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক ফ্যাশনের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার বিষয়টি অস্বীকার করে। এমনকি এফআরসির পক্ষ থেকে দুই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনের কপি পাঠানোর পর তারা কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার বিষয়টি অস্বীকার করে।

অন্যদিকে অলিম্পিক ফ্যাশন এফআরসির কাছে এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি কর্তৃক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়। এফআরসির পক্ষ থেকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার কারণ ব্যাখ্যা চাওয়া হলে কোম্পানিটি এফআরসিকে জানায়, প্রথমে মতিন অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু আর্থিক প্রতিবেদনে কিছু তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল যা করা হয়নি এবং এতে আর্থিক বিবরণীতে কিছু অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ আরো নির্ভুলভাবে নিরীক্ষা করার জন্য এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগ দেয় এবং তার নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়। মূলত কারণেই কোম্পানিট দুটি আর্থিক প্রতিবেদন হয়ে যায় বলে এফআরসিকে জানিয়েছে অলিম্পিক ফ্যাশন।

এফআরসির পক্ষ থেকে এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানির প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অলিম্পিক ফ্যাশন জানায়, নিরীক্ষকের মাধ্যমেই তারা চূড়ান্ত নিরীক্ষা কাজ করিয়েছেন, যা প্রথমে মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের মাধ্যমে নিরীক্ষা করা হয়েছিল। যদিও কোম্পানিটি এফআরসিকে নিরীক্ষককে ফি প্রদানের রসিদ কিংবা যৌথ মূলধন কোম্পানি ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) কাছে নিরীক্ষকের সম্মতিপত্র জমা দেয়ার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো চিঠিতে এফআরসি জানিয়েছে, কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে দুজন নিরীক্ষকের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে, যা তারা লিখিতভাবে স্বীকার করেছে। দুটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মধ্যে মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত নিরীক্ষা প্রতিবেদনটির তারিখ ২০১৯ সালে ২৪ অক্টোবর আর এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তারিখ ২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এতে প্রমাণ হয় যে দুজন নিরীক্ষকের মাধ্যমে দুটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির কারণ সম্পর্কে কোম্পানির দেয়া ব্যাখ্যা সঠিক নয়। তাছাড়া আপাতদৃষ্টিতে এক্ষেত্রে দুজন নিরীক্ষক জড়িত রয়েছে বলে মনে হলেও সেটি প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত কোম্পানি দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে এফআরসি।

অলিম্পিক ফ্যাশনের একই গ্রুপের মালিকানাধীন অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। দুটি আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির বিষয়ে জানতে অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম কিবরিয়া এবং কোম্পানি সচিব মো. হাবিবুল্লাহকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন