বৃহস্পতিবার | মার্চ ০৪, ২০২১ | ২০ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

জন্মদিনে স্মরণ: নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু

আবেদিন পুশকিন

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক মহাকাব্যের নাম। তার পুরো জীবনটাই এক সাস্পেন্স থ্রিলার।

অসাধারণ মেধাবী সুভাষ ছাত্রজীবন শেষ করে আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে যুবক সুভাষ, মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, স্বাধীনতার চেয়ে বড় কোনো উপহার মানুষের জীবনে থাকতে পারে না। ভারতবাসীকে স্বাধীন করতে হবে, এরচেয়ে বড় কোনো ব্রত হতে পারে না সুভাষের জীবনে। তিনি চাকরিতে যোগদান করলেন না। যোগদান করলেন কংগ্রেসের রাজনীতিতে। কিন্তু রাজনীতিতে এসে ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন গান্ধীবাদী রাজনীতির মাধ্যমে ভারতকে স্বাধীন করতে আরো ২০০ বছর লাগবে। গান্ধী যেখানে অহিংসায় বিশ্বাস রাখতেন, সুভাষ সেখানে আস্থা রাখতেন চাপপ্রয়োগের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের। যতক্ষণ অধিকার আদায় না হবে ততক্ষণ চাপপ্রয়োগ।

১৯২৮ সালে তিনি কলকাতায় ইউনিফর্ম পরিহিত প্রায় ২,০০০ যুবকের সমাবেশ করেন। সুভাষকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৩০ সালে জেল থেকে বের হয়ে তিনি কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন, গৃহবন্দী হয়েছেন, দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আবার লুকিয়ে দেশে ফিরে কারাবরণ করেছেন। কোনো কিছুই সুভাষকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে দূরে সরাতে পারেনি। ১৯৩৫ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় তার বই- দ্যা ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল। ১৯২০ থেকে ১৯৩৪ সালের ঘটনাগুলোর বিবরন ও সুভাষের ভাষ্য বইটিকে ইতিহাসের একটি প্রামান্য দলিলে পরিণত করে। বইটি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়।

বইটি যখন লেখেন তখন তিনি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় নির্বাসনে। বইটির লেখার কাজে সাহায্য করার জন্য এমিলি শেঙ্কল নামে একজন শর্টহ্যান্ডরাইটারের সাহায্য নেন তিনি। পরবর্তীতে এমিলিকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের এক কন্যাসন্তান হয়। কন্যার নাম রাখা হয় অনিতা বসু।

১৯৩৮ সালে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নিযুক্ত হন। কিন্তু গান্ধীপন্থী উদারবাদীরা তার কাজে বারবার বাঁধা সৃষ্টি করে। ১৯৩৯ সালে তিনি কংগ্রেস থেকে বের হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন নতুন রাজনৈতিক দল- ফরোয়ার্ড ব্লক। এর মধ্যে শুরু হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধ। সুভাষ ভাবেন বিশ্বযুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের দেশছাড়া করা যায় কিনা? সুভাষের উপর ব্রিটিশ সরকারের কড়া নজরদারী, তিনি কার্যত গৃহবন্দী। সেই অবস্থা থেকে তিনি পলায়ন করেন। তার বিশ্বাস ছিলো রাশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়ন) সমাজতান্ত্রিক সরকার ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করতে তাকে সাহায্য করবে।

তিনি কলকাতা থেকে পালিয়ে যান একদম ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিম সীমান্তের পেশোয়ার শহরে (বর্তমানে পাকিস্তান)। সেখান থেকে তিনি ফরোয়ার্ড ব্লকের একজন কর্মীকে সাথে নিয়ে আফগানিস্তান প্রবেশ করেন। তিনি পশতু ভাষা জানতেন না। ফলে পুরো আফগানিস্তান তিনি বোবা-কালার বেশ ধরে পাড়ি দেন। কিছুদিন পর তিনি রাশিয়া প্রবেশ করেন। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে রুশ সরকারের অনাগ্রহে তিনি মানসিকভাবে আহত হন এবং মস্কোর জার্মান দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। মস্কো থেকে এক ইতালিয় ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে তিনি জার্মানি প্রবেশ করেন। জার্মানিতে তিনি ‘আজাদ হিন্দ রেডিও’ এর কার্যক্রম শুরু করেন। জার্মানদের হাতে ধরা পরা ব্রিটিশ ভারতীয় সৈনিকদের সাথে নিয়ে শুরু করেন ‘ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার’।

তিনি হিটলারের সাথে দেখা করে ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে কথা বলেন। কিন্তু জার্মানি থেকে ভারত এতো দূরে যে সাহায্য করা অসম্ভব বলে হিটলার তার মত জানান। সুভাষ কলকাতা থেকে বার্লিন গিয়েছেন ভারতের স্বাধীনতার জন্য, গাড়িতে, ট্রেনে এবং অবশ্যই অনেকখানি পথ পায়ে হেঁটে। বার্লিন তাকে জানায় তবে জাপান তাকে বেশি সাহায্য করতে পারবে। সুভাষ চাইলে তারা তাকে জাপানগামী একটা সাবমেরিনে তুলে দিতে পারে। সুভাষ রাজি হন। সাবমেরিন করে জাপান আসেন। জাপানের কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করে ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে কথা বলেন। জাপান থেকে সিঙ্গাপুর আসেন। সিঙ্গাপুর ব্রিটিশদের থেকে জাপানের দখলে আসে। সেখানে ভারতের কিছু সৈনিক জাপানের হাতে বন্দী হয়। বন্দী ভারতীয় সৈনিকদের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’, স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনী। ফৌজ গড়ে তোলেন আরেক বাঙালী বিপ্লবী রাসবিহারী বসু, নেতাজী সিঙ্গাপুর আসলে ফৌজের নেতৃত্ব তার হাতে দেয়া হয়।

নেতাজী সুভাষ আজাদ হিন্দ ফৌজকে সাথে নিয়ে বার্মা পৌঁছান। আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাসংখ্যা তখন প্রায় ৮০ হাজার। বার্মা থেকে তারা ব্রিটিশ ভারতের মনিপুরে প্রবেশ করেন ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসের ৪ তারিখ। স্বাধীন ভারতের প্রথম পতাকা উড়ে। মনিপুর এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের অধীনে।৬ জুলাই আজাদ হিন্দ রেডিও এর সিঙ্গাপুর শাখা থেকে নেতাজীর ভাষণ সম্প্রচারিত হয়। সেখানে ভারতকে মুক্ত ঘোষনা করা হয়, মহাত্মা গান্ধীকে ভারতীয় জাতির জনক আখ্যা দেয়া হয়। নেতাজী ভেবেছিলেন ফৌজ ভারতে প্রবেশ করলে দলে দলে ভারতীয় যোগদান করে ভারতকে পুরোপুরি ব্রিটিশ মুক্ত করবে।

কিন্তু এর মধ্যেই বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরতে শুরু করে। জাপান বার্মা ত্যাগ করে। নেতাজীও পিছু হটেন সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুর থেকে জাপানগামী এক প্লেনে তিনি উঠেন। কিন্তু প্লেন বর্তমানের তাইওয়ানের নিকট বিধ্বস্ত হয়, নেতাজী মৃত্যুবরন করেন। তার মৃত্যুর খবর নিয়ে বেশ সংশয় এবং সন্দেহ আছে। কারণ এর আগেও তিনি বেশকয়েকবার শত্রুর চোখে ধূলা দিয়ে পলায়ন করেন। দেশবাসী এবং এমনকি তার শত্রুরাও মনে করে, সুভাষ জীবিত এবং যেকোনো সময় যেকোনো স্থান থেকে বের হয়ে আসতে পারে। জীবিত সুভাষের চেয়ে অজ্ঞাত সুভাষ ভারতের মাটিতে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠে।

২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশরা আর কোনোভাবেই ভারত শাসন করতে পারছিলো না। একে অর্থনৈতিক অবক্ষয়, তার উপর সুভাষের বিপ্লবী ছায়া। ফলস্বরূপ ব্রিটিশরা ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে ভূমিত্যাগ করে ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট। যাওয়ার আগে ধর্মের ভিত্তিতে দুইটি দেশে জমিভাগ করে দিয়ে যায়, ভারত ও পাকিস্তান।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু তিনি হাজার বছর জীবিত থাকবেন, সারা পৃথিবীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে রত মুক্তিকামী মানুষের মনে।

আবেদিন পুশকিন: লেখক ও গবেষক
[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন