বৃহস্পতিবার | ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

ইউরোপে জিএসপি প্লাস সুবিধা

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হোক

২০২৬ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিষয়টি ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত বহন করে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু চ্যালেঞ্জ আসবে বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে বাণিজ্যে যে অগ্রাধিকার পায়, তার সবটুকু পাবে না। আবার বৈদেশিক অনুদান, কম সুদের ঋণও কমে আসবে। রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত পরিপালনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এগিয়ে থাকতে হলে বাংলাদেশকে এখন থেকেই জিএসপি প্লাস প্রাপ্তির শর্তগুলো পূরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সম্পর্কিত এক আলোচনা সভায় -বিষয়ক প্রস্তুতি গ্রহণের তাগিদ দেয়া হয়।

উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি একটা মর্যাদার বিষয়। এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী বাংলাদেশকে সবাই তখন আলাদাভাবে বিচার করবে। তবে বাংলাদেশের বড় রফতানি বাজার ইউরোপ। এলডিসি হিসেবে বাজারে এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) আওতায় শুল্ক কোটামুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছি আমরা। দেশের মোট রফতানির ৫৮ শতাংশ যায় বাজারে। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশই পোশাক খাতের পণ্য। রয়েছে টেক্সটাইল, খাদ্যসামগ্রী, মাছ, বিভিন্ন কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য হস্তশিল্পের উৎপাদিত পণ্য। ফলে ইবিএ সুবিধা প্রত্যাহার হলে গড়ে দশমিক শতাংশ হারে শুল্ক দিয়ে বাজারে প্রবেশ করতে হবে। এতে করে রফতানি সংকোচনের আশঙ্কা রয়ে যায়। কেননা বাংলাদেশ এখন এলডিসি হিসেবে যেসব বাণিজ্যসুবিধা পায়, উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হওয়ার পর সেগুলো পাবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কসুবিধা, মেধাস্বত্ব সুবিধা ইত্যাদি কমে যাবে, কিংবা উঠে যাবে। ফলে বিশ্ববাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। দেখা গেছে, ধরনের নানা কারণে অনেক দেশ এলডিসির তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সমস্যায় পড়েছে। তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। কমেছে রফতানি, বিদেশী সহায়তা কিংবা বৈদেশিক আয়ের প্রবাহ।

কভিডের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পও চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। তবে সরকার সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় পদক্ষেপের কারণে কারখানাগুলোতে পুনরায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আসতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত হিসেবে বাংলাদেশের সামনে মানবাধিকার শ্রমমান সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক রীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা অভ্যন্তরীণ আইনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। শ্রমিকবান্ধব দেশ হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখার পাশাপাশি মনোযোগী হতে হবে শ্রম অধিকার নিশ্চিতে। এর সঙ্গে শ্রমিকদের প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষতা বৃদ্ধিতে নজর দেয়া হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি পণ্য বৈচিত্র্য রফতানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে পোশাকের মতো সম্ভাবনাময় অন্য পণ্য।

আমরা জানি, টেকসই উন্নয়ন সুশাসনের জন্য সহায়তা হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রদান করা হয়। বর্তমানে পাকিস্তানসহ ২৫টি উন্নয়নশীল দেশ সুবিধা পাচ্ছে। তবে এখানে কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা দরকষাকষির বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশ কতটা আলোচনা দক্ষতা কৌশলের সঙ্গে সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে অনেক বিষয়। পাকিস্তান বলিভিয়ার শ্রম অধিকার বাংলাদেশ থেকে উন্নত না হলেও তারা জিএসপি প্লাস সুবিধা পেয়ে আসছে। বাংলাদেশের প্রতিযোগী অনেক দেশই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থা সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে। ভিয়েতনাম যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এর অধীনে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইইউর বাজারে ভিয়েতনামের পণ্য শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। চীন ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনাময় বড় বাজার। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে ১৬ দশমিক শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। অবস্থায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে অগ্রসর হওয়াটা লাভজনক হবে। চীনের পাশাপাশি জাপান, ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। নতুন সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ লাভজনক হবে।

বৈশ্বিক চেইনে ব্যবসা করতে হলে বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনেই করতে হবে। এটা শিল্পের প্রবৃদ্ধির জন্যই দরকার। এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জবিষয়ক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। তাই এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল করার প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করছে অনেক সমীকরণ। দেশে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নেই। খাতভিত্তিক মজুরিকাঠামো থাকলেও তা সব খাতে নেই। দেশের প্রায় ৮৯ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এক্ষেত্রে শ্রম মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে হবে। তবে সব দায় শুধু আমাদের নয়, ক্রেতাদের আরো দায়িত্ববান ভূমিকা পালন করতে হবে। বৈশ্বিক পর্যায়ের শ্রমিক আইন পরিপালনের ক্ষেত্রে ক্রেতাদেরও বৈশ্বিক পর্যায়ের দাম নিশ্চিত করতে হবে। তবে শ্রম আইন বাস্তবায়নে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নেয়া জরুরি। কারণ ৯৮ শতাংশ উদ্যোক্তাই বাংলাদেশের। এক্ষেত্রে একটি সমন্বিত শ্রম নীতি তৈরি করতে হবে, যেন কোনো কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত না হয়। শ্রম অধিকার সুশাসন নিশ্চিতের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন