সোমবার | মার্চ ০১, ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

শেষ পাতা

ধারাবাহিকভাবে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে বিদ্যুৎ খাত। সময়ে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাড়ানো হয়েছে সক্ষমতা। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২১ হাজার ২৩৯ মেগাওয়াট। যদিও বর্তমানে বিশাল সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। শুধু তা- নয়, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে সক্ষমতার ব্যবহার।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে বিদ্যুৎ খাতের স্থাপিত সক্ষমতা ২১ হাজার ২৩৯ মেগাওয়াট এবং প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা ২০ হাজার ৭৪৮ মেগাওয়াট। কিন্তু বিপুল পরিমাণ উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে ১৮ জানুয়ারি দিনের পিক আওয়ারে উৎপাদন হয়েছে হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পিক আওয়ারে উৎপাদন হয়েছে হাজার ২৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি খুব বেশি গতি পাচ্ছে না। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র দশমিক ২৬ শতাংশ।

কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার কমছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সক্ষমতার ৪৩ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৫ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৮ শতাংশ ব্যবহার হয়েছিল।

বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী পাঁচ বছর ধরে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের উপরে না থাকে, তবে স্থাপিত সক্ষমতার ব্যবহার ৪০ শতাংশেরও নিচে নেমে যাবে। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত সক্ষমতার বিরূপ প্রভাব পড়বে বিপিডিবির আর্থিক অবস্থা এবং বিদ্যুতের দামের ওপর।

নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও বেসরকারি সরকারি কোম্পানির কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ কেনার জন্য স্বল্প (রেন্টাল) দীর্ঘমেয়াদি (আইপিপি বা ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) চুক্তি থাকে বিপিডিবির। কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহূত তেল, গ্যাস, কয়লা বা জ্বালানির মূল্য দেয় বিপিডিবি। বিদ্যুতের দাম থেকে শুরু করে সারা বছর কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি ইউনিট অর্থ বরাদ্দ থাকে। এছাড়া কেন্দ্রটির একটি ভাড়া দেয়া হয়, যা ক্যাপাসিটি চার্জ নামে পরিচিত। যখন কোনো কেন্দ্র থেকে সরকার বিদ্যুৎ নেয় না, তখন এনার্জি বিদ্যুতের দাম দেয়া বন্ধ থাকে। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ ঠিকই পরিশোধ করতে হয়। 

একটি ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বছরে শুধু কেন্দ্র ভাড়াই দিতে হয় প্রায় ৮০-৯০ কোটি টাকা। ফলে কেন্দ্র অলস বসে থাকলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। বিপিডিবির আর্থিক ক্ষতি পোষাতে সরকারকে বিপুল অংকের টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। অন্যদিকে ক্ষতি পোষাতে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র অব্যবহূত থাকার বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। আর নতুন আইনের মাধ্যমে এখন থেকে বছরে একাধিকবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) সভাপতি ইমরান করিম বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সেটি ঠিক আছে। তবে সরকার যে উৎপাদন সক্ষমতার পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে সেটি আরো পরিষ্কার হওয়া দরকার। কেননা সক্ষমতার সঙ্গে চাহিদার যে প্রকৃত পরিসংখ্যান সেটি দেখাতে পারলে প্রকৃত হিসাবটা বোঝা যাবে। ২০২৫ সালের মধ্যে বড় যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে, তখন ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে হবে। নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্টে ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গেলে সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে না। ফলে বিদ্যুতে ভর্তুকিও কমে আসবে।

অতিরিক্ত সক্ষমতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে শেষ সমস্যা নয়। ভবিষ্যতে আমদানীকৃত ব্যয়বহুল কয়লা এবং এলএনজিও বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম বাড়াবে। বেশি দামের কারণে এরই মধ্যে গত বছর বাংলাদেশ এলএনজির একাধিক টেন্ডার বাতিল করেছে। ভবিষ্যতে উদ্বেগ আরো বাড়তে পারে। কেননা ২০২১ সালের শুরুতে এশিয়ান এলএনজির রেকর্ড দাম হয়েছে। সঠিক নীতির অভাবে সরকারের আর্থিক ভর্তুকি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে বিপিডিবিকে প্রায় হাজার ৫০০ কোটি টাকা (৮৮০ মিলিয়ন ডলার) ভর্তুকি দিতে হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতার পরিপূর্ণ ব্যবহার না করার কারণে সরকারের অর্থের অপচয় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছে বিদ্যুৎ জ্বালানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)

সম্প্রতি প্রকাশিত আইইইএফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে নতুন যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলো যোগ হলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে। ২০২৫ সাল নাগাদ আরো ২১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে। সময়ে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে যাবে। বিদ্যুতের চাহিদা যদি বৃদ্ধি না পায়, তাহলে সক্ষমতার ব্যবহার ৪০ শতাংশেরও নিচে নেমে যাবে।

এতে আরো বলা হয়, চলতি বছরের শেষে এক হাজার মেগাওয়াট নতুন, ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রিডে সংযুক্ত হতে পারে, যা আমদানীকৃত কয়লা এলএনজির পাশাপাশি বিপিডিবির ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) ন্যাশনাল সোলার এনার্জি অ্যাকশন প্ল্যান করেছে, সেটিকে যৌক্তিক বলে জানিয়েছে আইইইএফএ। গবেষণা সংস্থাটি বলছে, স্রেডার পরিকল্পনায় শুধু সৌরশক্তি থেকে ২০৪১ সাল নাগাদ ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার মেগাওয়াট আসবে শুধু রুফটপ সোলার থেকে। ভিয়েতনাম গত বছরেই শুধু রুফটপ সোলার থেকে নয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। সরকারের উচিত হবে স্রেডার পরিকল্পনা অধিকতর গুরুত্ব দেয়া। এছাড়া  বিদ্যুৎ সঞ্চালন বিতরণ লাইন উন্নত করতে অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। এর ফলে যেমন উচ্চ সক্ষমতার নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রিডে সংযুক্ত হতে পারবে। পাশাপাশি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে বিদ্যুতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, মোট উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে যে চাহিদা তা কভিডের কারণে গত বছরে কম ছিল। নতুন বছরে শুরুতেই শীত মৌসুম হওয়ায় সেটি আরো কমেছে। তবে এটি কিছুদিন পর আবার বাড়বে। ক্যাপাসিটি চার্জ কমিয়ে আনার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে না। তাছাড়া যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা নেই সেসব কেন্দ্রের নতুন করে চুক্তি হবে কিনা তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন