শুক্রবার | ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম পাতা

জো বাইডেনের অভিষেক আজ

বণিক বার্তা ডেস্ক

২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি, আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে ওয়াশিংটনের পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিলের পশ্চিম প্রান্তে খোলা আকাশের নিচে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। চার বছরের মাথায় সেই ক্যাপিটল ভবনে নজিরবিহীন হামলার উসকানির অভিযোগ মাথায় নিয়ে আজ বিদায় নিচ্ছেন তিনি। আজই আনুষ্ঠানিক শপথ নেবেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকদের হামলার আশঙ্কা থেকে আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে ওয়াশিংটনসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে। যদিও করোনা মহামারীর কারণে আয়োজন থাকছে সীমিত। খবর ওয়াশিংটন পোস্ট নিউইয়র্ক টাইমস।

হোয়াইট হাউজের পরিবেশ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হতে যাওয়া ৭৮ বছর বয়সী বাইডেনের জন্য একেবারে নতুন নয়। দেশটির ৪৭তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৯-২০১৭ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনে যুক্ত ছিলেন তিনি। টানা কয়েক দশক ধরে নিজ শহর উইলমিংটন থেকে ট্রেনে চেপে রাজধানী ওয়াশিংটনে এসে দায়িত্ব সামলেছেন বাইডেন। ঐতিহ্য ধরে রাখতে ট্রেনে চড়ে এসে শপথ নিতে চেয়েছিলেন তিনি। নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে বাইডেনের সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। তবে ঐতিহ্য মেনে ক্যাপিটল ভবনের পশ্চিম প্রান্তে খোলা আকাশের নিচেই শপথ নেবেন তিনি।

বাইডেনের শপথ ঘিরে যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত হামলা এড়াতে ওয়াশিংটনে মোতায়েন করা হয়েছে ২৫ হাজার ন্যাশনাল গার্ড। পার্লামেন্ট ভবন, হোয়াইট হাউজসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সরকারি দপ্তরগুলো নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে রাখা হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ওয়াশিংটন অভিমুখী প্রধান সড়ক সেতুগুলোর প্রবেশমুখ, চলছে তল্লাশি। নতুন প্রেসিডেন্ট ফার্স্টলেডিকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত রয়েছে হোয়াইট হাউজ।

এমন এক সময় বাইডেন শপথ নিচ্ছেন, যখন করোনার বিরুদ্ধে চরম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণে শপথ অনুষ্ঠান হবে সীমিত। উপস্থিত থাকবেন মাত্র কয়েক হাজার আমন্ত্রিত অতিথি। সংক্রমণ এড়াতে সমর্থকদের ওয়াশিংটনে আসতে নিরুৎসাহিত করেছেন বাইডেন। অনলাইনে আয়োজনে যুক্ত হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্স্টলেডিরা উপস্থিত থাকেন। ঐতিহ্য মেনে বাইডেনের শপথে বারাক মিশেল ওবামা, বিল হিলারি ক্লিনটন দম্পতি উপস্থিত থাকছেন। তবে থাকছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। শপথ শুরুর আগেই ওয়াশিংটন ছেড়ে ফ্লোরিডার মার--লাগো গলফ রিসোর্টে চলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে আয়োজনে ট্রাম্প প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সস্ত্রীক উপস্থিত থাকবেন।

ট্রাম্প এখনো নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে বাইডেনকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানাননি। ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা প্রকাশ না করে একেবারে নিশ্চুপ রয়েছেন তিনি। তার এমন মনোভাব ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। ক্ষমতার শেষ দিন তিনি অফিসে কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা। সময় ট্রাম্প শতাধিক সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে ক্ষমা করতে পারেন।

তবে মেলানিয়া ট্রাম্প এরই মধ্যে বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন। টুইটারে পোস্ট করা ভিডিও বার্তায় মেলানিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্টলেডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবের অংশ। দেশজুড়ে আমেরিকানদের অবিশ্বাস্য কর্মকাণ্ডে আমি বেশ অনুপ্রাণিত বোধ করি। আপনারা যা- করুন না কেন সেটা মন দিয়ে করুন। মনে রাখবেন, সহিংসতার মাধ্যমে কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। এটা কখনই ন্যায়সংগত নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ক্ষমতা গ্রহণের পর কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বাইডেনকে। একদিকে করোনা মহামারীর রাশ টানা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ঝক্কি সামলানো তার সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসবে। করোনাকালে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এরই মধ্যে দশমিক ট্রিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন বাইডেন। ক্ষমতা নিয়েই ডজনখানেক পরিবর্তনমূলক নির্বাহী আদেশ জারি করবেন বাইডেন। এর মধ্যে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা অন্যতম।

নির্বাহী ঘোষণায় করোনা মোকাবেলার লক্ষ্যে মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করবেন তিনি। করোনা সংক্রমণের রাশ না টেনেই ইউরোপ ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ যোগাযোগ খুলে দেয়ার ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারেন বাইডেন। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের জের ধরে চাকরি হারানো প্রায় আড়াই লাখ কর্মীকে কাজে ফেরানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে তাকে। বিভক্ত আমেরিকান সমাজকে এক করার চাপ সামলাতে হবে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এরই মধ্যে নিজ প্রশাসনের রূপরেখা দিয়েছেন বাইডেন। পাশে থাকছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী, কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে প্রশাসন সাজিয়েছেন বাইডেন। এতে জায়গা পেয়েছেন ১২ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জাইন সিদ্দিক।

গত নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট নেতা বাইডেনের কাছে পরাজয় ঘটে রিপাবলিকান ট্রাম্পের। ক্ষমতায় যেতে ২৭০ ইলেকটোরাল কলেজ ভোট প্রয়োজন হলেও ট্রাম্প পান ২৩২টি। বাইডেনের ঝুলিতে জমা পড়ে ৩০৬ ইলেকটোরাল ভোট। ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে পপুলার ভোটে পিছিয়ে থেকেও ইলেকটোরাল ভোটের সমীকরণে ভর করে হোয়াইট হাউজের বাসিন্দা হয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এবারের নির্বাচনের পর ফল মেনে নিতে গড়িমসি শুরু করেন তিনি। অভিযোগ তোলেন ভোট চুরির। ভোটের ফল পাল্টে দিতে একের পর এক মামলা দায়ের হয় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে। তবে সেসব মামলা ধোপে টেকেনি।

আদালতে সুবিধা করতে না পেরে রাজপথের বিক্ষোভ বেছে নেন ট্রাম্প। জানুয়ারি এমনই এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে তার উগ্র সমর্থকরা মার্কিন পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলা করে। ওই সময় পার্লামেন্টে যৌথ অধিবেশন চলছিল। তাতে বাইডেনকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হচ্ছিল। প্রক্রিয়া আটকে দিতেই নজিরবিহীন হামলায় উসকানি দেন ট্রাম্প। ওই ঘটনায় নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ নিহত হন পাঁচজন।

ক্যাপিটল ভবনে হামলায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। প্রস্তাবের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। এরই মধ্যে মেয়াদ শেষ হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পকে পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করতে পারে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন পার্লামেন্ট। এর আগেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আরেক দফা অভিশংসনের মুখে পড়েছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্প একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি এক মেয়াদে দুবার অভিশংসন মোকাবেলা করেছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন