বৃহস্পতিবার | ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম পাতা

সওজের ২২ হাজার কোটি টাকার কাজের ৫০% সাত ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণে

শামীম রাহমান

বর্তমানে সড়ক জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরে চলমান কাজের মূল্য ২২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। কাজের প্রায় ৫০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে সাত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাতটিসহ মুষ্টিমেয় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই পাচ্ছে সওজের সিংহভাগ কাজ।

প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রতিবেশী ভারত চীনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, চার লেন সড়ক নির্মাণে ভারতে প্রতি কিলোমিটারে ১১-১৩ লাখ ডলার চীনে ১৩-১৬ লাখ ডলার খরচ হয়। সেখানে বাংলাদেশে চার লেন সড়কগুলোর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, রংপুর-হাটিকুমরুল মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে প্রতি কিলোমিটারে সর্বনিম্ন ২৫ লাখ ডলার থেকে সর্বোচ্চ  এক কোটি ১৯ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। সড়কে বাড়তি খরচের বিষয়টি এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার আলোচনায় উঠে এসেছে। এর পেছনে নির্মাণ ব্যয়ে অস্বচ্ছতা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়া দরপত্রে প্রতিযোগিতা না থাকাকে দায়ী করা হচ্ছে।

চলমান কাজের মূল্যে সওজের সবচেয়ে বড় ঠিকাদার এখন কুমিল্লার রানা বিল্ডার্স। প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে বাস্তবায়ন করছে সওজের হাজার ৬১৮ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ। রানা বিল্ডার্স বর্তমানে কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের একটি প্যাকেজে ১৯৫ কোটি টাকার কাজ করছে। আহলাদিপুর-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক সড়কে দুটি প্যাকেজও বাস্তবায়ন করছে তারা। দুই প্যাকেজের একটির মূল্য প্রায় ১০০ কোটি অন্যটির মূল্য ৯০ কোটি টাকা। এছাড়া বাগেরহাট সড়ক বিভাগের নোয়াপাড়া-বাগেরহাট-পিরোজপুর আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের একটি প্যাকেজে ৫২ কোটি টাকার কাজ, একই সড়কের আরেকটি প্যাকেজে ৫৭ কোটি টাকার কাজ, গাজীপুর সড়ক বিভাগে ৫৮ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি। এর বাইরে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের একটি প্যাকেজে ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ শেষ করেছে রানা বিল্ডার্স। চলমান কাজের এসব তথ্য প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। এসবের বাইরেও কিশোরগঞ্জ-করিমগঞ্জ-চামড়াঘাট জেলা মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ, কুমিল্লায় পরিবহনচালকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণসহ সারা দেশে অধিদপ্তরের হাজার ৬১৮ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার ৪০৩ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

কাগজে-কলমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্সের মালিক মোহাম্মদ আলম। তিনি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রানা বিল্ডার্সের ট্রেড লাইসেন্সটি করা হয়েছে মোহাম্মদ আলমের নামে। এতে তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কুমিল্লা সদরের বাদুড়তলার মনিহার নিকেতন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক দশক আগেও রানা বিল্ডার্সের ঠিকাদারি কেবল কুমিল্লা অঞ্চলকেন্দ্রিক ছিল। প্রতিষ্ঠানটির উত্থান মূলত গত এক দশকে। সময়ে একের পর এক কাজের আদেশ দিয়ে অধিদপ্তরের শীর্ষ ঠিকাদারে পরিণত হয়েছে রানা বিল্ডার্স।

রানা বিল্ডার্সের পরেই চলমান কাজের মূল্যে সওজ অধিদপ্তরের দ্বিতীয় শীর্ষ ঠিকাদার চায়না কনস্ট্রাকশন সেভেন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন করপোরেশন। তারা বাস্তবায়ন করছে হাজার ৫৯২ কোটি টাকার কাজ। ময়েনউদ্দিন (বাঁশি) লিমিটেড নামের আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একাই বাস্তবায়ন করছে হাজার ৩৬০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ। প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে তিন নম্বরে।

চার নম্বরে রয়েছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএম বিল্ডার্স। ২০১৫-১৬ অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার ছিল হাজার ৮০০ কোটি টাকার মতো। পাঁচ বছর পর ২০১৯-২০ অর্থবছর এমএম বিল্ডার্সের টার্নওভার দাঁড়ায় হাজার ৮২৬ কোটি টাকায়। প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে সরকারের আটটি সংস্থার সঙ্গে। সবচেয়ে বেশি কাজ করছে সওজ অধিদপ্তরে। বর্তমানে সারা দেশে সওজের প্রায় হাজার ২০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করছে এমএম বিল্ডার্স।

সওজের তালিকায় পাঁচ নম্বরে রয়েছে আবদুল মোনেম লিমিটেড। তাদের চলমান কাজের মূল্য হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। ছয় নম্বরে থাকা স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড বাস্তবায়ন করছে হাজার ১৫১ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ। সম্প্রতি ময়মনসিংহ জোনে কালো তালিকাভুক্ত হওয়া মজহার এন্টারপ্রাইজ হাজার ১৪৯ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে সাত নম্বরে।

সওজ অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া ঠিকাদারের সংখ্যা ৮৪৫। এর মধ্যে বর্তমানে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ২৩২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার কাজ করছে। এর অর্ধেক অর্থাৎ ১১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার কাজ করছে উল্লিখিত সাত ঠিকাদার। আর শীর্ষ ২০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সব মিলিয়ে বাস্তবায়ন করছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ। অবশিষ্ট সাড়ে হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ ভাগাভাগি করে বাস্তবায়ন করছে ২১২টি প্রতিষ্ঠান।

অধিদপ্তরের শীর্ষ ২০ ঠিকাদারের মধ্যে রয়েছে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন। তাদের চলমান কাজের মূল্য ৮৮৩ কোটি টাকা। একইভাবে ৭৪১ কোটি টাকার কাজ করছে মীর আখতার হোসেন লিমিটেড, ৫৯৮ কোটি টাকার কাজ করছে মাহফুজ খান লিমিটেড ৫৮১ কোটি টাকার কাজ করছে কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। অন্যদিকে হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড ৫৭০ কোটি টাকার, তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড ৫৫৯ কোটি টাকার, আরএবি-আরসি (প্রাইভেট) লিমিটেড ৫৩৯ কোটি টাকার, তাহের ব্রাদার্স লিমিটেড ৪৯৭ কোটি টাকার, কেএমসি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড ৩১৯ কোটি টাকার, চায়না রেলওয়ে ২৪ ব্যুরো গ্রুপ ৩১১ কোটি টাকার, হেনান হাইওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ ২৯২ কোটি টাকার, মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ২৫২ কোটি টাকার মাহবুব ব্রাদার্স (প্রাইভেট) লিমিটেড ২৪৬ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করছে।

গুটি কয়েক ঠিকাদারের হাতে সওজ অধিদপ্তরের উন্নয়নকাজ জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন অধিদপ্তরের জনৈক ঠিকাদার। অধিদপ্তরের দীর্ঘ দেড় দশক ধরে কাজ করা ঠিকাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ঘুরেফিরে একই প্রতিষ্ঠান সব কাজ হাতিয়ে নিচ্ছে। যদিও এদের বেশির ভাগেরই এত বেশি কাজ করার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই। নেই প্রয়োজনীয় নির্মাণ উপকরণও। কাজ পাওয়ার জন্য একই ব্যাংকঋণ সব দরপত্র প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে এসব ঠিকাদার সড়কের কাজগুলো বাগিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মুষ্টিমেয় ঠিকাদার অধিকাংশ কাজ পেয়ে যাচ্ছে’—এমন আলোচনা সম্প্রতি সওজ অধিদপ্তরের একটি সভায়ও হয়েছে। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট কমিটির ওই সভায় এক ঠিকদার একই সঙ্গে অনেক কাজ করায় গুণগত মান বজায় রেখে যথাসময়ে কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মত দিয়েছেন অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীরা।

সংস্থাটির একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যথাযথ নিয়ম মেনেই বড় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ কাজ পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করছে বর্তমান দরপত্র প্রক্রিয়া। ঠিকাদার চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি ফর্মুলা, পাস্ট পারফরম্যান্স ম্যাট্রিক্স, ১০ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমা/নিম্নসীমার মতো বিষয়গুলোয় অভিজ্ঞ ঠিকাদাররা সহজেই কাজ পেয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন তারা।

অধিদপ্তরের অনেক ঠিকাদারের অভিযোগ, দরপত্র প্রক্রিয়ার শর্তগুলো এমনভাবে করা হয়, যেখান থেকে শুধু গুটি কয়েক ঠিকাদারই সুবিধা পায়। অনেক সময় এমন সব শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, সেখানে অল্প কয়েকজন ঠিকাদার ছাড়া আর কেউ দরপত্র প্রক্রিয়ায়ই অংশই নিতে পারে না।

এদিকে সড়ক পরিবহন সেতু বিভাগের বিভিন্ন কাজে একই প্রতিষ্ঠান একাধিকবার ঠিকাদারির কাজ পায় কিনা তা খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি একটি উপকমিটি গঠন করেছে সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে সরকারের যেসব গাইডলাইন আছে, সেগুলো মেনেই ঠিকাদাররা কাজ পাচ্ছে। তাই এখানে বেআইনি কিছু হচ্ছে না। তার পরও অল্প কিছু ঠিকাদার বেশি কাজ পাচ্ছে। এটা যেন না হয়, সেজন্য আমরা কিছু পরিকল্পনা করছি। সরকারকে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছি। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে সমস্যা অনেকটাই দূর হয়ে যাবে।

এক ঠিকাদার যখন একই সঙ্গে অনেক কাজ বাস্তবায়ন করে, তখন কাজের গুণগত মানে কোনো প্রভাব পড়ে কিনা, জানতে চাইলে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, কিছুটা তো বিরূপ প্রভাব পড়েই। তবে কাজের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বটি কিন্তু আমাদেরই। আমাদের প্রকৌশলীরা যদি মাঠ পর্যায়ে কাজটি ঠিকভাবে করতে পারেন, তাহলে এক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন