বৃহস্পতিবার | ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

শেষ পাতা

সরে গেলেন পঙ্কজ গুপ্ত

তারাপুর চা বাগানের দায়িত্বে ব্যবস্থাপনা কমিটি

দেবাশীষ দেবু, সিলেট

সিলেটের বিতর্কিত শিল্পপতি রাগীব আলীর হাত থেকে উদ্ধার করা দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা বাগানের দায়িত্ব নিয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটি। গত বৃহস্পতিবার ১১ সদস্যের কমিটি বাগানটির দায়িত্ব বুঝে নেয়।

প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি প্রতারণার মাধ্যমে দখল করে নিয়েছিলেন বিতর্কিত শিল্পপতি রাগীব আলী। ২০১৬ সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ের পর রাগীব আলীর দখল থেকে চা বাগানের ভূমি উদ্ধার করা হয়। সে সময় আদালত নির্ধারিত সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে ওই বাগান বুঝিয়ে দেয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের এক রিভিউ রায়ে আলোচিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব হারিয়েছেন পঙ্কজ গুপ্ত।

রিভিউ রায়ে সম্পত্তি সংরক্ষণ তদারকির জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর রিভিউয়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এতে বাগান পরিচালনার লক্ষ্যে পাঁচ বছরের জন্য ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে চা বাগানের সম্পত্তি পরিচালনার পাশাপাশি বাগান দখল করে রাগীব আলী তার স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়।

উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে দিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক। গত বৃহস্পতিবার নতুন কমিটি তারাপুর চা বাগানের দায়িত্ব নিয়েছে।

১১ সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শান্তনু দত্ত সন্তু। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা কাগজে-কলমে দায়িত্ব পেয়েছি। ২৩ জানুয়ারি আমরা প্রথম বৈঠকে বসব। বৈঠকে বাগানের ভেতরের স্থাপনাগুলো সরানোর ব্যাপারে আলোচনা হবে। ব্যাপারে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা চাইব।

সিলেট নগরের পাঠানটুলা এলাকার প্রায় ৪২৩ একরের তারাপুর চা বাগান দেবোত্তর সম্পত্তি। প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ১৯৯০ সালে জালিয়াতি প্রতারণার মাধ্যমে দখল করে নেন শিল্পপতি রাগীব আলী। এরপর ১৯৯৫ সালে বাগানের দশমিক ২২ একর জায়গার চা গাছ ধ্বংস করে নির্মাণ করেন প্রায় এক হাজার শয্যার জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। মেডিকেল কলেজের পাশে আরো অনেক জায়গাজুড়ে স্ত্রীর নামে রাবেয়া খাতুন নার্সিং কলেজ, মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাসসহ বেশকিছু স্থাপনা গড়ে তোলেন রাগীব আলী। এছাড়া বাগান ধ্বংস করে গড়ে উঠেছে আরো অনেক স্থাপনা।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে জানা গেছে, চা বাগানের ভেতরে অবৈধভাবে মোট ৩৩৭টি স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এর বেশির ভাগই বহুতল আবাসিক স্থাপনা।

ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে তাদের কাছে তারাপুর চা বাগানের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন স্থাপনাগুলো অপসারণে এই কমিটি উদ্যোগ নেবে। ব্যাপারে জেলা প্রশাসন পুলিশ প্রশাসন তাদের সহযোগিতা করবে। রায়ে এমনটিই বলা হয়েছে। আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুসারে কাজ করছি।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসাইনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ রিভিউ রায়ে পঙ্কজ গুপ্তর সেবায়েত দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালত বলেন, শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণ জিউ দেবতার বিগ্রহ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যুগলটিলা আখড়া কমিটির কাছে হস্তান্তর করে সপরিবারে ১৯৮৮ সালে দেশ ত্যাগ করেন পঙ্কজ। এর পর থেকে বিগ্রহের দায়িত্বে রয়েছে চৈতন্য কালচারাল সোসাইটি। পরবর্তী সময়ে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত সরকারি অনুমতি সাপেক্ষে ১৯৯০ সালে তারাপুর চা বাগানের দখল লিজমূলে আব্দুল হাইয়ের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর কখনই পঙ্কজ কুমার গুপ্ত ওই লিজ দলিলটি জাল বা ভুয়া বলে কোথাও কোনো অভিযোগ করেননি বা হস্তান্তরিত সম্পত্তি পুনরুদ্ধারেরও কোনো উদ্যোগ নেননি। কোনো সেবায়েত কোনো সম্পত্তি সরকারের অনুমতি নিয়েও কারো কাছে হস্তান্তরের অধিকার রাখেন না।

অথচ পঙ্কজ কুমার গুপ্ত তা- করেছেন।

আদালত বলেন, পঙ্কজ কুমার গুপ্ত ১৯৮৮ সালে দেবোত্তর সম্পত্তি শাসন, সংরক্ষণ না করে দেবতার সেবা পূজার ভার যুগলটিলা আখড়া কমিটির কাছে ন্যস্ত করে অন্য দেশে চলে যান। তিনি বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক। তাই তিনি বাংলাদেশের কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। তিনি দেবোত্তর সমুদয় সম্পত্তি রাগীব আলীর পুত্র আব্দুল হাইয়ের কাছে হস্তান্তরের জন্য ৯৯ বছরের অবৈধ চুক্তি করেছেন। তার সেবায়েত হওয়ার দাবিরও বৈধতা নেই।

তারাপুর চা বাগানের দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তর প্রসঙ্গে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত বলেন, ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আমাকে সেবায়েত হিসেবে নির্ধারণ করে আমার কাছে দেবোত্তর সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু রিভিউ পিটিশন রায়ে অনেক কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। রায়ে হঠাৎ করে পারিবারিক দেবোত্তর সম্পত্তিকে পাবলিক দেবোত্তর সম্পত্তি বলা হয়েছে। আমাকে ব্যবস্থাপনা কমিটিতেও রাখা হয়নি। বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় লড়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন