সোমবার | মার্চ ০১, ২০২১ | ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম পাতা

সিলভার কম্পোজিটের অভিনব কারচুপি

আয় এক ব্যাংকে ৫০০ অন্য ব্যাংকে ৭৩৪ কোটি দেখানো হয়েছে!

মেহেদী হাসান রাহাত

কোম্পানি একটি, নিরীক্ষকও একই এবং হিসাব বছরও এক। কিন্তু দুই ব্যাংকে জমা পড়েছে দুটি ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন।  এক ব্যাংকে দেয়া প্রতিবেদনে কোম্পানির আয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকে দেয়া প্রতিবেদনে সেটি হয়ে গেছে ৭৩৪ কোটি টাকা।  একইভাবে মুনাফা, সম্পদ আয়করের তথ্যেও রয়েছে বিশাল ফারাক। আর্থিক প্রতিবেদনে অভিনব জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছে বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠান সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। আর তাতে সহযোগিতা করেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। কোম্পানি নিরীক্ষকের পারস্পরিক যোগসাজশের বিষয়টি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তদন্তে উঠে এসেছে। আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এফআরসিতে। পাশাপাশি বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছেও চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।

সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের আর্থিক জালিয়াতির বিষয়টি তদন্ত করেছে এফআরসির অডিট প্র্যাকটিস রিভিউ (এপিআর) বিভাগ। বিভাগটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. সাঈদ আহমেদ এফসিএ গত ১৪  জানুয়ারি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা হয়েছে, সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের আর্থিক প্রতিবেদন দুটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন দুটি একই বছরের এবং একই নিরীক্ষকের মাধ্যমে প্রত্যয়িত। কিন্তু প্রতিবেদন দুটির আর্থিক তথ্য উপাত্তের মধ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে।

গরমিলের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। তাতে দেখা যায়, ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া আর্থিক প্রতিবেদনে ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে কোম্পানিটির আয় দেখানো হয়েছে ৪৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অথচ আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া একই বছরের আরেকটি আর্থিক প্রতিবেদনে আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। একইভাবে ওয়ান ব্যাংকের কাছে মোট মুনাফা ৭৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা দেখানো হলেও আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে সেটি হয়ে গেছে ১৪২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া প্রতিবেদনে সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের পরিচালন মুনাফা দেখানো হয়েছে ৬১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যেখানে আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে দেয়া প্রতিবেদনে পরিচালন মুনাফা ছিল ১২৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। একইভাবে ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া আর্থিক প্রতিবেদনে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা ১৫ কোটি ৭৯ লাখ, সংরক্ষিত আয় ২২ কোটি ৮৫ লাখ, মজুদ পণ্য ২৩৫ কোটি ৭৮ লাখ, বিবিধ দেনাদার ১১৮ কোটি ২৩ লাখ, চলতি সম্পদ ৩৭২ কোটি ২৭ লাখ, মোট সম্পদ ৯৬৯ কোটি ৮১ লাখ এবং মোট ইকুইটি ১৭১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া প্রতিবেদনে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা ৭৭ কোটি লাখ, সংরক্ষিত আয় ৩৯০ কোটি ৭১ লাখ, মজুদ পণ্য ২৫৯ কোটি ৮৯ লাখ, বিবিধ দেনাদার ২০৩ কোটি  লাখ, চলতি সম্পদ ৫২০ কোটি ৪৬ লাখ, মোট সম্পদ হাজার ৩৪৮ কোটি ৪০ লাখ এবং মোট ইকুইটি ৫৩৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। এমনকি আয়কর সঞ্চিতি হিসেবে ওয়ান ব্যাংকের কাছে কোটি ১৮ লাখ টাকা  দেখানো হলেও  আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে তা দেখানো হয়েছে ১১ কোটি লাখ টাকা।

দুটি আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাপক গরমিলের কারণে সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের কাছে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছে নিরীক্ষা নথি তলব করে এফআরসি। কোম্পানি কর্তৃক জমা দেয়া আর্থিক বিবরণী এবং নিরীক্ষক কর্তৃক জমা দেয়া নিরীক্ষা নথি পর্যালোচনায় এফআরসি দেখতে পায় যে ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন কোম্পানি নিরীক্ষক কর্তৃক জমা দেয়া আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে মিল রয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংকে জমা দেয়া নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জাল বলে প্রতীয়মান হয়েছে এফআরসির কাছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর তথ্য উপাত্তের সত্যতা দুটি ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক বিবরণী প্রণয়ন করার কারণ জানতে চাইলে সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের পক্ষ থেকে এফআরসিকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয় ভুলবশত আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে খসড়া আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনটিই চূড়ান্ত। নিরীক্ষকের কাছে একই বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করা হলে নিরীক্ষকও কোম্পানির বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।

সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস এবং এর নিরীক্ষক সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের বক্তব্য এবং তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বেশকিছু অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পায় এফআরসি। এর মধ্যে রয়েছে দুটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন একই তারিখ ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর স্বাক্ষর করা হয়েছে, যা বাস্তবে হওয়া সম্ভব নয়। দুটি আর্থিক প্রতিবেদনেই নিরীক্ষক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের একই ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছেন এবং তাদের সিলমোহরও রয়েছে। দুটি প্রতিবেদনে দেয়া তথ্যের মধ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে যেমন মোট বিক্রি ৪৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ৭৩৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা বাস্তবে হওয়া প্রায় অসম্ভব। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এফআরসি মনে করছে কোম্পানি নিরীক্ষক পরস্পরের যোগসাজশে ইচ্ছাকৃতভাবে দুটি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে ব্যাংক এনবিআরের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়ার জন্য।

জানতে চাইলে এফআরসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক . মো. হামিদ উল্লাহ ভূঞা বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের তদন্তে সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের আর্থিক জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে। কোম্পানিটি ওয়ান ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এক্ষেত্রে তথ্যগত ব্যাপক ফারাক রয়েছে। কোম্পানি নিরীক্ষকের পক্ষ থেকে ভুলবশত আইএফআইসি ব্যাংকে খসড়া প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও এটি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এরই মধ্যে এফআরসির প্রয়োগ (এনফোর্সমেন্ট) বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করার পেছনে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করছে এফআরসি। এজন্য আইএফআইসি ব্যাংকে জমা দেয়া নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানিটি সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করেছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখার জন্য এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং নিরীক্ষা, গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর, মূসকের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে এফআরসি।

সিলভার লাইন গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে। গ্রুপটির আওতাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিলভার লাইন কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস, সুন্দরবন এয়ার ট্রাভেল, সিলভার লাইন অ্যাসোসিয়েট সিলভার টাওয়ার। গ্রুপটির কর্ণধার এমএএইচ সেলিম। ওয়ান ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংকের ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার কারণ জানতে চাইলে সিলভার লাইন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হেলাল মোহাম্মদ নূরী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রায় কাছাকাছি নামে আমাদের দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এক্ষেত্রে ভুলবশত আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে খসড়া আর্থিক বিবরণী জমা দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া আর্থিক বিবরণীটিই সঠিক চূড়ান্ত।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নিরীক্ষক প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পাশাপাশি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসার প্রক্রিয়ায় থাকা বেশকিছু কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। নিরীক্ষক ইস্যু ব্যবস্থাপকের পারস্পরিক যোগসাজশে আইপিওতে আসার সময় কোম্পানিগুলোর অতিরঞ্জিত আর্থিক তথ্য প্রদানের অভিযোগ বেশ পুরনো। সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করা বিষয়ে জানতে চাইলে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার রামেন্দ্র নাথ বসাক বণিক বার্তাকে বলেন, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ভুল করে আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। খসড়া হওয়ার কারণে প্রতিবেদটিতে সে সময় অনেক তথ্য সংযোজন বিয়োজন করা বাকি ছিল। কারণেই ওয়ান ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনটির সঙ্গে এটির তথ্য-উপাত্তগত ফারাক রয়েছে বলে জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন