রবিবার | মার্চ ০৭, ২০২১ | ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি

প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হোক

গত এক দশকে বড় হয়েছে দেশের অর্থনীতির আকার। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে পুরুষের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছেন নারী। প্রযুক্তি উপকরণ প্রাপ্তির সমস্যা সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুবিধা লাভ থেকেও তারা অনেকাংশে বঞ্চিত। সম্প্রতি বণিক বার্তা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল বৈঠকে আর্থিক লেনদেনে লিঙ্গবৈষম্যের একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে। যদিও শিক্ষিত স্বল্পশিক্ষিতসহ সব স্তরের নারীই কোনো না কোনোভাবে অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন। নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উৎপাদন ব্যবস্থায়। উদ্যোক্তা হিসেবেও সফলতার উদাহরণ রাখছেন তারা। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্রমেই নারীর অংশগ্রহণ অবদান বাড়ছে। অবস্থায় আর্থিক লেনদেনে নারীর অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা জরুরি।

সাম্প্রতিক দশকগুলোয় কাজের ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতার বিষয়ে যে পরিমিত অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, কভিডের কারণে তা মুছে যাওয়ার এক ধরনের শঙ্কা জেগেছে। নতুন করে আলোচনা চলছে অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়গুলো ঘিরেও। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ঝুঁকি বেড়েছে। ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যক্তি খাতের ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণের সুযোগ আছে। তবে এক্ষেত্রে কয়েকটি অসুবিধা বিদ্যমান। প্রথমত, তথ্য ঘাটতি। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবস্থায় নারীর অন্তর্ভুক্তির অভাব। ফলে প্রযুক্তির সুফলগুলো নারীর কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করা অনেক নারীই জানেন না কীভাবে ঋণের জন্য আবেদন করতে হয়। এগুলো ছাড়াও নারীরা প্রায় ক্ষেত্রেই আরো একটি সমস্যার মুখোমুখি হনআবেদনের পর যখন দেখা যায় ব্যাংকের সঙ্গে তার লেনদেনের রেকর্ড নেই, তখন ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ দিতে উৎসাহিত হয় না। তাছাড়া ব্যাংক ঋণ দিতে রাজি হওয়ার বিপরীতে গ্যারান্টি চায়। দরিদ্র নারীদের জন্য যা সম্ভব হয় না। পরিবার পরিজনদের আস্থার অভাবও বাধা হয়ে আসে অনেক ক্ষেত্রে। আবার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে যে নারী কাজ শুরু করেছেন তিনি হয়তো ট্রেড লাইসেন্স করেননি কিংবা তার টিন নম্বর নেই। নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও এসব কারণ বাধা হয়ে আসছে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই নারীরা পরিস্থিতির মুখোমুখি। তবে আমরা যদি এশিয়ার মধ্যে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের দিকে আলোকপাত করি, তবে সরকারের বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রীলংকার নারীদের অগ্রসরের চিত্র দেখতে পাব। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানের শ্রমবাজারের তুলনায় শ্রীলংকায় নারীর অংশগ্রহণের হার প্রায় দ্বিগুণ, ৩৬ ভাগ। যা সম্ভব হয়েছে শ্রীলংকা সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত কিছু কার্যকর পদক্ষেপের কারণে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক বিকাশের লক্ষ্যে নারীদের প্রয়োজনগুলো পূরণের দিকে নজর দেয়া হয়েছে। যেমন ব্যবসা উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি জ্ঞান সরবরাহ, বাজার তৈরি বাজার সংযোগ, ব্যবসায়িক তথ্য ভাগাভাগি ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান। উপরন্তু শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের হার ৪০ শতাংশ নিশ্চিত করতে শ্রীলংকার সরকার যে ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তার মধ্যে রয়েছে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি, যাতায়াতে নিরাপত্তা নিশ্চিত শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।

কভিডের কারণে দেশের আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক উভয় খাত থেকে চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। পরিসংখ্যানগুলো বলছে, পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি চাকরি হারিয়েছেন। নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতপূর্বক এর সমাধান জরুরি। নারীরা যাতে সহজ শর্তে ঋণ পান, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এখানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। আর্থিক বড় প্লাটফর্মগুলোর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি করে দেয়া, -কমার্স প্রযুক্তিবিষয়ক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, পুঁজি সংগ্রহের উপায়, বিজনেস মডেল দাঁড় করানোর কৌশল, বাজারের তথ্য সংগ্রহ বিশ্লেষণ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট করে যদি আরো বেশি উদ্ভাবনী কাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা নীতিনির্ধারকরা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে।

কভিডের কারণে অনেক কাজই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে। কভিড-পরবর্তী সময়েও মানুষের প্রযুক্তিনির্ভরতা রয়ে যাবে। ফলে অনেক কাজের চাহিদা কমে যাবে। তাই মুহূর্তে নারীদের শিক্ষা দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিনিয়োগ করা জরুরি। না হলে অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়নো সম্ভব হবে না। কারণ অনেক কাজই প্রযুক্তি নিয়ে নেবে। নারীদের ব্যাংক খাতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ জরুরি। ব্যাংকগুলো নারী ব্যাংকারদের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নারীদের প্রশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট করে যুক্ত করতে হবে উদ্ভাবনী কাজের সঙ্গে। কাজে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সর্বোপরি নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রযুক্তি সরঞ্জাম প্রাপ্তি নিশ্চিতসহ সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা সম্ভব হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন