রবিবার | মার্চ ০৭, ২০২১ | ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭

ফিচার

১৮৯৮ সালে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের সরকার উচ্ছেদ ও ডেমোক্র্যাটদের কালো ইতিহাস

বণিক বার্তা অনলাইন

১৮৯৮ সালে রাজ্য নির্বাচনের পরে, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা উইলমিংটন বন্দরে হামলে পড়ে।  ওই সময় নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহর ছিল এটি।  এই উগ্রাবাদীরা কৃষ্ণাঙ্গদের মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেয়, কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দাদের হত্যা করে এবং নির্বাচিত স্থানীয় সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। ওই সময় নর্থ ক্যারোলাইনায় শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গ রাজনীতিকরা প্রথমবারের মতো জোট সরকার গঠন করেছিলেন।

ইতিহাসবিদরা এটিকে মার্কিন ইতিহাসের একমাত্র অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এসময় উগ্রবাদীরা আক্ষরিক অর্থেই অভ্যুত্থানের মতোই ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল এবং রাজ্যের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে ভোটগ্রহণ ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য দ্রুত আইন প্রণয়ন করেছিল।  কিন্তু সরাসরি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ করার পরও তাদের কেশাগ্রও কেউ স্পর্শ করেনি।

গত নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলের সপক্ষে কংগ্রেসের প্রত্যয়ন অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে ৬ জানুয়ারি সহিংস জনতা ক্যাপিটল হিলে আক্রমণ চালায়।  সেখানেও সর্বাগ্রে ছিল শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা।  এই ঘটনার পর উইলমিংটনের সেই ইতিহাস আবার আলোচনায় এসেছে।  সেই বিদ্রোহের ১২০ বছর পরও, শহরটিতে সেইসব সহিংসতার চিহ্ন রয়ে গেছে।

১৮৬৫ সালে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পরে- যেটি উত্তর ইউনিয়নবাদী রাজ্যগুলোকে দক্ষিণ কনফেডারেশনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল- সদ্য ঐক্যবদ্ধ দেশে দাসত্ব বিলুপ্ত করা হয়।  ওয়াশিংটন ডিসির রাজনীতিবিদরা পূর্ববর্তী দাসদের স্বাধীনতা ও অধিকার দেয়ার জন্য সংবিধানের বেশ কয়েকটি সংশোধনী পাস করেন এবং তাদের নীতিমালা কার্যকর করতে ওইসব রাজ্যে সেনাবাহিনী নামানো হয়।

তবে দক্ষিণের অনেক মানুষই এই পরিবর্তনগুলোতে বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন। গৃহযুদ্ধপরবর্তী দশকগুলোতে স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে সমাজে সংহত করার লক্ষ্যে বহু প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা ছিল।

১৮৯৮ সালে উইলমিংটন একটি বৃহৎ এবং সমৃদ্ধ বন্দর ছিল, একটি ক্রমবর্ধমান এবং সফল কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল এই নগরীতে। নিঃসন্দেহে, আফ্রিকান আমেরিকানরা তখনও দৈনিক শ্বেতাঙ্গদের নানা সংস্কার এবং বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়- উদাহরণস্বরূপ ব্যাংকগুলো কৃষ্ণাঙ্গদের ঋণ দিতে অস্বীকার করে বা সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। তবে গৃহযুদ্ধের ৩০ বছর পরে নর্থ ক্যারোলাইনার মতো সাবেক কনফেডারেট রাজ্যগুলোতে আফ্রিকান আমেরিকানরা ধীরে ধীরে ব্যবসা গুছিলে নিচ্ছিল, বাড়ি কিনছিল এবং তাদের স্বাধীনতা উপভোগ করছিল।  এমনকি তখনকার সময়ে দেশের একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ দৈনিক পত্রিকা ছিল উইলমিংটন ডেইলি রেকর্ড।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক গ্লেনডা গিলমোর বলেন, আফ্রিকান আমেরিকানরা বেশ সফল হয়ে উঠছিল, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছিল, শিক্ষার হার ক্রমেই বাড়ছিল এবং সম্পত্তির মালিকানাও পেতে শুরু করে কৃষ্ণাঙ্গরা।

এই বর্ধমান সাফল্যটি শুধু সামাজিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও নর্থ ক্যারোলাইনা রাজ্যজুড়ে দেখা যাচ্ছিল।  ১৮৯০-এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ রাজনৈতিক জোট ফিউশনবাদী নামে পরিচিতি পায়। তারা অবৈতনিক শিক্ষা, ঋণমুক্তি এবং আফ্রিকান আমেরিকানদের সমান অধিকারের পক্ষে ছিল। ১৮৯৬ সালে গভর্নরশিপসহ রাজ্যের প্রতিটি অফিসে তারা জিতেছিল।  ১৮৯৮ সাল নাগাদ কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ ফিউশনবাদী রাজনীতিবিদরা যৌথভাবে উইলমিংটনে স্থানীয় সিটি গভর্নমেন্টে নির্বাচিত হয়।

তবে এই প্রবণতায় তৎকালীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টিসহ সারা দেশেই বড় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।  ১৮৯০-এর দশকে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানরা আজকের তুলনায় খুব আলাদা ছিল।  প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের দল রিপাবলিকানরা গৃহযুদ্ধের পরে জাতিকে সংহতকরণ এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে শক্তিশালী সরকার গঠনের মাধ্যমে রাজ্যগুলোকে একত্রিত করার পক্ষে কাজ করছিলেন।

ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রে অনেক পরিবর্তনেরই বিরুদ্ধে ছিল। তারা প্রকাশ্যে জাতিগত পৃথকীকরণ এবং পৃথক রাজ্য গঠনের অধিকারের পক্ষে জোরালো দাবি জানিয়েছিল।  উইলমিংটন বিদ্রোহ বিষয়ক বই ‘অ্যা ডে অব ব্লাড‘-এর লেখক লেরে উমফ্লিট বলেন, ১৮৯৮ সালের ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের দল হিসেবে ভাবা যেতে পারে।

ডেমোক্র্যাটদের আশঙ্কা ছিল ফিউশনবাদীরা- যার মধ্যে কালো রিপাবলিকানদের পাশাপাশি দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ কৃষকরাও ছিলেন- ১৮৯৮ সালের নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। পার্টির নেতারা তখন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের ওপর ভর করে একটি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করা এবং ফিউশনবাদীদের পরাস্ত করতে সর্বশক্তি নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন।  

উমফ্লিট বলেন, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্ল্যাটফর্মটি ১৮৯৮ সালের নভেম্বরে নির্বাচনে জয়লাভ নিশ্চিত করার জন্য সংবাদপত্রকে ব্যবহার, বক্তৃতাবাগিশ ভাড়া করা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল নেয়।  তারা ভালো-মন্দ, শান্তিপূর্ণ ও সহিংস সব কৌশলের একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।

শ্বেতাঙ্গ মিলিশিয়া- এর মধ্যে রেড শার্টস নামে একটি সহিংস গ্রুপ ছিল যারা লাল শার্ট পরে টহল দিত- ঘোড়ার পিঠে চড়ে কৃষ্ণাঙ্গদের আক্রমণ এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বেড়াত।  উইলমিংটনের কৃষ্ণাঙ্গরা যখন তাদের নিরাপত্তার জন্য বন্দুক কেনার চেষ্টা করে, তখন শ্বেতাঙ্গ দোকানদাররা তাদের কাছে অস্ত্র বেচতে অস্বীকার করে এবং যারা অস্ত্র কিনতে যায় তাদের নামের তালিকা তৈরি করে রাখে।

এর মধ্যে সংবাদপত্রগুলো গুজব ছড়ায় যে, আফ্রিকান আমেরিকানরা রাজনৈতিক ক্ষমতা চায় যাতে তারা শ্বেতাঙ্গ নারীর সঙ্গে ঘুমাতে পারে। ধর্ষণের মহামারী লেগে গেছে এমন নির্জলা মিথ্যা খবর ছড়ায় পত্রিকাগুলো।  

উইলমিংটন ডেইলি রেকর্ডের মালিক ও সম্পাদক আলেকজান্ডার ম্যানলি তখন ধর্ষণের অভিযোগ প্রশ্নে একটি সম্পাদকীয় লেখেন। তিনি শ্বেতাঙ্গ নারীদের স্বেচ্ছায় কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের সঙ্গে শোয়ার পরামর্শ দেন।  তার এই প্রস্তাব ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেপিয়ে তোলে এবং তার বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষমূলক প্রচারণা‘র অভিযোগ আনে।

১৮৯৮ সালে রাজ্যব্যাপী নির্বাচনের আগের দিন, ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদ আলফ্রেড মুর ওয়াডেল একটি ভাষণ দেন। সেখানে তিনি শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের উদ্দেশে বলেন, আপনার দায়িত্ব পালন করুন, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের খুঁজে খুঁজে বের করুন।  যদি এমন কাউকে পান তাকে বলুন, তুমি চলে যাও, তোমাকে ভোট দিতে হবে না।  যদি সে কথা না শোনে, তাহলে সেখানেই তাকে হত্যা করুন।  যদি বন্দুকের ব্যবহার করতে পারি তাহলে কাল আমরাই জিতবো।

অস্ত্রের মুখে অনেক ভোটারকে ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়, ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া হয়, অনেকে সহিংসতার ভয়ে ভোট দিতেই যাননি। ফলত ডেমোক্র্যাটিক পার্টি রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক ব্যবধানে জয় পায়।  

তবে ফিউশনবাদী রাজনীতিবিদরা উইলমিংটনে ক্ষমতায় আসেন।  যদিও এর মাত্র এক বছর পরেই ছিল পৌরসভা নির্বাচন। রাজ্য নির্বাচনের দুই দিন পরে ওয়াডেল এবং তার সহযোগীরা আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কয়েকশ শ্বেতাঙ্গকে নিয়ে শহরে প্রবেশ করে উইলমিংটন ডেইলি রেকর্ড পত্রিকার ভবন তছনছ করে দেয়।  কালো মানুষদের হত্যা করে এবং তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে শহরময় ত্রাস ছড়িয়ে দেয়।  বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো শ্বেতাঙ্গ এসে সেই দলে যোগ দেয়।

এই পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দারা যখন শহরের বাইরে জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন তখন ওয়াডেল এবং তার দল সিটি হলের দিকে এগিয়ে যায় এবং বন্দুকের মুখে স্থানীয় সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে।  ওইদিন বিকালে ওয়াডেলকে মেয়র ঘোষণা করা হয়।

অধ্যাপক গিলমোর বলেন, এটি বিদ্রোহ, রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

দুই বছরের মধ্যে, নর্থ ক্যারোলাইনার শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা নতুন বিভাজন আইন কার্যকর করে এবং সাক্ষরতার পরীক্ষা এবং ভোটাধিকার করের মাধ্যমে কালো মানুদের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেয়।  ১৮৯৬ সালে নিবন্ধিত আফ্রিকান আমেরিকান ভোটারদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার। সেটি কমে ১৯০২ সালে প্রায় ৬ হাজারে নেমে আসে।

নব্বইয়ের দশক নাগাদ নগর প্রশাসন সেই অতীত নিয়ে আলোচনা শুরু করে। ১৯৯৯ সালে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আক্রমণটির শততম বার্ষিকী পালন করে এবং এর দুবছর পরে তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি কমিশন গঠন করে। এরপর থেকে শহরটির মূল পয়েন্টগুলোতে ফলক তৈরি করা হয় এবং ১৮৯৮ সালের স্মৃতিস্তম্ভ এবং মেমোরিয়াল পার্ক নির্মাণ করা হয়।  

শহরটিতে যা ঘটেছিল তাতে সেখানকার বাসিন্দা এবং এই ঘটনার পূর্বাপর পর্যালোচনাকারী ঐতিহাসিকদের কাছে সাম্প্রতিক ঘটনা খুব একটা আবেদন তৈরি করতে পারেনি। তারা ১৮৯৮ সালের বিদ্রোহ আর চলতি মাসে মার্কিন ক্যাপিটল হিলে হামলার মধ্যে সমান্তরাল রূপ দেখছেন।  

১৮৯৮ সালের সেই আক্রমণ কিন্তু আজকের মতো এতোটা কাভারেজ পায়নি, এর জন্য কেউ লজ্জিতও হয়নি।  বরং রাজ্যজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভবন, বিদ্যালয় এবং সরকারি ভবনগুলো সেই বিদ্রোহে অংশগ্রহকারী বা প্ররোচনাদানকারীতের নামে নামকরণ করা হয়।  অনেকেই পরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে নিজেদের মর্যাদা বাড়াতে বিদ্রোহে একজন গর্বিত অংশগ্রহণকারী বলে পরিচয় করিয়ে দিত।  ঘটনার এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর ইতিহাসের বইগুলোতে দাবি করা হতে থাকে, সেই দাঙ্গা মূলত কৃষ্ণাঙ্গরাই বাঁধিয়েছিল।  পরে শ্বেতাঙ্গ নাগরিকরা তা দমন করে।

শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের সেই নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম সংগঠক চার্লস আইকক ১৯০১ সালে নর্থ ক্যারোলাইনার গভর্নর হন। তার ভাস্কর্যটি কিন্তু এখনও মার্কিন ক্যাপিটল ভবনের ভেতরে রয়েছে। 

বিবিসি অবলম্বনে জাহাঙ্গীর আলম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন