সোমবার | মার্চ ০১, ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম পাতা

বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি

এলএনজি নিয়ে সব পরিকল্পনা ভণ্ডুল হতে পারে

নিজস্ব প্রতিবেদক

এক  বছর আগেও বিশ্ববাজারে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্য ছিল ৫ ডলার করে। সেখান থেকে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ২০ ডলারের কাছাকাছিতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েনের চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে এলএনজির দাম। এ ঊর্ধ্বগতি সামনের দিনগুলোয়ও অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাস বাজার পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোর। মূল্যের এ অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখিতার কারণে পণ্যটি আমদানিতে দুই দফায় টেন্ডার দিয়েও তা বাতিলে বাধ্য হয়েছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এতদিন এলএনজিকেই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ধরে নিয়ে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ অবস্থায় এলএনজিকে কেন্দ্র করে গৃহীত সব পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি হিসেবে এলএনজি ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এলএনজিকে মাথায় রেখে মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন সমান্তরাল পাইপলাইন নির্মাণ, আনোয়ারা-ফৌজদারহাট গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ ও চট্টগ্রাম-ফেনী-বাখরাবাদ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পও রয়েছে তালিকায়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এদিকে, বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সক্ষমতার ৩৫ শতাংশই আসার কথা গ্যাস ও এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলএনজির কথা ভাবা হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যে অস্থিরতা এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় গর্গন প্রকল্পের একটি স্পট এলএনজি কার্গো প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট ৩৭ ডলারে বিক্রি হয়েছে। প্রায় ছয় মাস আগে বিক্রি হওয়া দামের চেয়ে এটি ১৮ গুণ বেশি। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্যাটস জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমবিটিইউ) এলএনজি সরবরাহের গড় মূল্য ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৪৫ ডলার, আগের সপ্তাহের তুলনায় যা ৪৭ শতাংশ বেশি।

জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কয়েক মাস ধরে ওঠানামা করছে। দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা এলএনজি সরবরাহে ভারসাম্যতা রেখেছি। ডিসেম্বরে এলএনজি সরবরাহ কম থাকায় আমরা দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছি।

তিনি বলেন, এলএনজি সরবরাহ কমালেও গ্যাসভিত্তিক শিল্পে সরবরাহ কমানো হয়নি। বিশেষ করে সার কারখানাগুলোয় সরবরাহ আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেগুলো ডুয়েল ফুয়েলচালিত সেগুলো গ্যাসের পরিবর্তে তেলে চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সব স্থাপনায় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আমরা ভারসাম্য বজায় রাখছি।

গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। ২০২৮ সাল নাগাদ গ্যাসের মোট চাহিদার ৫০ ভাগ এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হবে। এর পরিমাণ ২০৪১ সালে দাঁড়াবে ৭০ ভাগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪১ সালে এলএনজি আমদানির পরিমাণ প্রতি বছর ৩০ মিলিয়ন টন হতে পারে।

জ্বালানির মহাপরিকল্পনায় এলএনজিকে অন্তর্ভুক্ত করে যে পরিকল্পনা করা হয়েছে সেখানে এ অস্থিরতার প্রভাবের বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব বলেন, এলএনজি নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা মাত্র দুই বছরের। প্রথমেই আমরা কম দামে আনতে পেরেছি। তবে এভাবে অস্থিরতা থাকলে এলএনজি নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।

দেশে মোট গ্যাস উৎপাদনের মধ্যে আন্তর্জাতিক তেল গ্যাস কোম্পানির (আইওসি) ৫৯ ভাগ ও দেশীয় কোম্পানিগুলো ৪১ ভাগ উৎপাদন করছে। আর দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ৩২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এ ঘাটতি মেটাতে গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট বিবেচনায় ২০১৮ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে সরকার। সামিট এলএনজি ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সেলারেট এনার্জির স্থাপন করা ভাসমান টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে আমদানীকৃত এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিটি এফএসআরইউর সক্ষমতা দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট। আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে প্রতিদিন ৪০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

দেশে এলএনজির সরবরাহ তদারককারী প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এলএনজি সরবাহের ৭০ শতাংশ সঞ্চালন লাইনে দেয়া হচ্ছে। চাহিদার বাকিটুকু পূরণ করা হচ্ছে গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, নভেম্বর থেকেই জাতীয় সঞ্চালন লাইনে এলএনজি সরবরাহ কম রাখা হয়েছে। স্পট মার্কেটে দাম বেড়ে যাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে আগামী মার্চ নাগাদ এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এলএনজি আমদানিতে এরই মধ্যে কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই করেছে জ্বালানি বিভাগ। বর্তমানে মধ্যমেয়াদি চুক্তি ও খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে স্পট এলএনজির মূল্যে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দরপত্র বাতিল করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বিশ্লেষণ বলছে, উদীয়মান বাজারগুলো মূলত মূল্যসংবেদনশীল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এটি এরই মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। ঊর্ধ্বমুখী দাম এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তুলবে। এর ফলে এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে। ফলে গ্রাহকদের ওপর গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের বোঝা আরো বেড়ে যেতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো উদীয়মান বাজারগুলোতে এলএনজির অসাশ্রয়ী দামের কারণে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রস্তাবিত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এলএনজির অস্থির স্পট বাজারের সঙ্গে যদি চুক্তিভিত্তিক গ্যাসের মূল্য বেড়ে যায়, তবে অনেক বিদ্যুৎ প্রকল্পই আলোর মুখ দেখবে না। এ অনিশ্চয়তা বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। ফলে গ্রাহকরা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হবেন। এশিয়ার দেশগুলোর উচিত এলএনজির চেয়ে সস্তা এবং আরো স্থিতিশীল নবায়নয়োগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর দেয়া।

জানা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম তিনটি এলএনজি রফতানিকারক দেশ মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহে বিঘ্ন এবং উচ্চ পরিবহন খরচ গ্যাসের দামকে আরো প্রভাবিত করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমানো হয়েছে, যেখানে গ্যাস বিক্রি করা হয় স্থানীয় মার্কিন স্পট মূল্যের ওপর ভিত্তি করে। উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে কমে যাওয়ার কারণে মার্কিন গ্যাসের স্পট দাম দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছে আইইইএফএ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন