সোমবার | মার্চ ০১, ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

শেষ পাতা

করোনাকাল রুগ্‌ণ পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আশীর্বাদ?

বদরুল আলম

সোনালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ শাখার প্রকল্প তন্বী নিটওয়্যার লিমিটেড। ১৯৮৫ সালে স্থাপন করা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ২৬ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ১২ কোটি টাকাই সুদ। রুগ্‌ণ হিসেবে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে সরকার প্রদত্ত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঋণ অবসায়নের মাধ্যমে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত তা কাজে লাগাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। সারা দেশে তন্বী নিটওয়্যারের মতো এমন সরকার চিহ্নিত রুগ্‌ণ পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৩। সুদ-আসল মিলিয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিশোধিত মোট ঋণের পরিমাণ ৬৮৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বিপুল পরিমাণ ঋণ জটিলতা নিষ্পত্তিতে সম্পত্তি ক্রোক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির কার্যক্রম চালু রয়েছে।

তবে চলমান কভিড-১৯ মহামারীকাল রুগ্‌ণ পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণ জটিলতা নিষ্পত্তির জন্য উপযুক্ত নয় বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। প্রেক্ষাপটে পর্যায়ক্রমে ঋণ অবসায়নের পাশাপাশি সম্পত্তি ক্রোক গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যক্রম স্থগিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, গত তিন দশকে নানা কারণে রুগ্‌ণ হওয়ার দাবি তুলেছে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান। রুগ্‌ণ হিসেবে নানা সরকারের সুযোগ-সুবিধাও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। সেগুলো এতদিন তারা কাজে লাগাতে না পারলেও নীতিনির্ধারকদের বর্তমান অবস্থান থেকে মনে হচ্ছে, মহামারীকাল এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।

১৯৮৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তৈরি পোশাক শিল্পের ২৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে রুগ্‌ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে রুগ্‌ণ’ স্বীকৃতি দিয়ে সরকারও ভর্তুকি দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ দায়-দেনা অবসায়নের অঙ্গীকার করে। পরবর্তী সময়ে তদন্তে দেখা যায়, এর মধ্যে মিথ্যা দাবি ছিল ১৪৬টির। শিল্পগুলোকে বাদ দিয়ে বাকি ১৩৩ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংকের দায়-দেনা সম্পূর্ণ মওকুফ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিজিএমইএ বলছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে রুগ্‌ণ বা বন্ধ পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে পোশাক শিল্পের ২৭৯টি রুগ্‌ণ  বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ব্যাংকঋণ অবসায়নের ঘোষণা আসে। পরবর্তী সময়ে তা জাতীয় সংসদে পাস হয়। বর্তমানে সরকারি বেসরকারি ব্যাংকের আওতাধীন বিবেচনাযোগ্য রুগ্‌ণ বা বন্ধ পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৩৩টি।

১৩৩ পোশাক কারখানার ঋণ হিসাব অবসায়ন-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর। খাতসংশ্লিষ্টরা ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা ওই বৈঠকে অংশ নেন। ওই বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্প্রতি পর্যায়ক্রমিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবসায়নের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এসব রুগ্‌ণ বা বন্ধ তৈরি পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে সম্পত্তি ক্রোক গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্যও অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়।

বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি . রুবানা হক বণিক বার্তাকে বলেন, ১৩৩টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী সুবিধা চাওয়া হয়েছিল। সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পদক্ষেপ গ্রহণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছে। আশা করছি বিষয়টির সুরাহা হয়ে যাবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি প্রস্থান নীতি বা এক্সিট পলিসি উন্নয়ন করা খুবই প্রয়োজন।

আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩৩টি রুগ্‌ণ বা বন্ধ তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানার মূল ঋণ, আয় খাতে নিট সুদ মামলার খরচ সম্পূর্ণভাবে বিশেষ বিবেচনায় অবসায়ন নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বরাবর আবেদন জানিয়েছিল বিজিএমইএ। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত জানতে চাওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের মার্চে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে মতামত দিয়ে বলা হয়, সার্বিক ঋণ অবসায়নের জন্য সরকারকে দিতে হবে মোট ৬৮৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৩৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রকল্প। এসব ব্যাংকের মধ্যে আছে সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, পূবালী, অগ্রণী, জনতা বেসিক ব্যাংক লিমিটেড। এর বাইরেও যেসব বেসরকারি ব্যাংকের প্রকল্প  রুগ্‌ণ বা বন্ধ হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে, সেসব ব্যাংক হলো বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড, সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট, এক্সিম, মার্কেন্টাইল, সাউথইস্ট, ন্যাশনাল, প্রাইম, এনসিসি, আইএফআইসি, উত্তরা, ন্যাশনাল, ডাচ্-বাংলা, আল-আরাফাহ্ দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড।

তালিকা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ শাখার প্রকল্প তন্বী নিটওয়্যার লিমিটেডের ঋণটিই সুদ-আসল মিলিয়ে সবচেয়ে বড় ব্যাংকঋণ। ১৯৮৫ সালে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের মধ্যে আসল রয়েছে ১৪ কোটি। সুদের পরিমাণ ১২ কোটি টাকা। তালিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋণ অগ্রণী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার ইয়ং ফ্যাশন প্রাইভেট লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের পরিমাণ ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে আসল কোটি সুদ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

তৃতীয় স্থানে থাকা সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার প্রকল্প আরবা গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মোট ঋণের পরিমাণ ১৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১২ কোটি ২৪ লাখ আসল কোটি ২১ লাখ টাকা সুদ।

সুদ-আসল মিলিয়ে ১০ কোটি টাকার ওপর ঋণ রয়েছে, এমন প্রকল্পের মধ্যে আরো রয়েছে সোনালী ব্যাংক রমনা করপোরেট শাখার প্রকল্প নিউ স্টাইল গার্মেন্টস লিমিটেড, বিসিবি ব্যাংকের অরবিট ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেড, সোনালী ব্যাংক রমনা শাখার ক্ল্যাসিক সাপ্লাইজ লিমিটেড ইউনিট-২।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন