বৃহস্পতিবার | মার্চ ০৪, ২০২১ | ২০ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

সেবা ও ভোগ্যপণ্যে প্রমিত মানের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা

ড. শহীদুল জাহীদ

বিহাভিওরাল অর্থনীতিতে বাস্কেট একটি সুপরিচিত ধারণা। বাস্কেট বলতে এখানে স্ট্যান্ডার্ড সার্ভকে বোঝানো হয়। স্ট্যান্ডার্ড সার্ভ একটি ভোগের ধারণা। এখানে ভোক্তা একটি ধারণার ঐকমত্যে পৌঁছেন যে তার ক্রয়কৃত পণ্য থেকে তিনি আন্দাজ কী পরিমাণ উপযোগ পাবেন। বাজারে জাতপাত, সময় ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে বহু ক্রেতা বিদ্যমান। বহু কারণে ভোক্তার চাহিদার ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। ক্রেতার আন্দাজ ভোগ উপযোগ আর বাস্তবিক ভোগ উপযোগের পার্থক্যকেই স্ট্যান্ডার্ড সার্ভ গ্যাপ বলা হয়।

বাস্কেট ধারণার সহজীকরণের জন্য কিছু উদাহরণ, যেমন একটি চায়ের পেয়ালা আর একটি পানি খাওয়ার মগ। চায়ের পেয়ালার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যে মাপের বা সাইজের পেয়ালা তৈরি করে, পানির মগ বা গ্লাসের আকার তার চেয়ে ভিন্ন। চা পানি দুটোই পানীয় কিন্তু এটা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা যে ভোক্তা একটি নির্দিষ্ট সময়ে চায়ের চেয়ে পানি বেশি পরিমাণে পান করেন। আপনি কোনো আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে গেলেন। আপনি কিছুই চাইলেন না। আপনার জন্য জলখাবার উপস্থিত। লক্ষ করুন, আপনাকে চা পানি দুটোই দেয়া হয়েছে কিন্তু পানির মগের চেয়ে চায়ের পেয়ালা অপেক্ষাকৃত ছোট।

ধরুন, আপনার খুব ক্ষুধা লেগেছে। দুপুর গড়িয়ে যায়। সামনেই খাবারের দোকান, দোকানি নানা খাবারের প্রদর্শনী দিয়ে রেখেছেন। আপনার পকেটে টাকা আছে। রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকে খাবার মেনু দেখতে লাগলেন। সেখানে লেখা, বিরিয়ানি ফুল প্লেট ২০০ টাকাহাফ প্লেট ১০০ টাকা ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন, আপনি হাফ প্লেট, ফুল প্লেট বিরিয়ানি বলতে কী বুঝলেন? হ্যাঁ, এটা একটি ধারণা। ভোক্তা মুহূর্তের মধ্যে একটি ঐকমত্যে পৌঁছেন, এমনকি নিজের অজান্তে নিজের সঙ্গেই, তার কী পরিমাণ বিরিয়ানি লাগবে মুহূর্তের ক্ষুধা নিবারণের জন্য।

আচরণবিদ্যায় আবহমান কালের ধারণা হলো এই বাস্কেট বা স্ট্যান্ডার্ড সার্ভের ধারণা। যেমন আমরা বাজারে গিয়ে একজন মাছ বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করি, মাছ কত করে? একজন লেখাপড়া না জানা সেই মাছ বিক্রেতা কিন্তু মুহূর্তেই স্ট্যান্ডার্ড সার্ভ ধারণা দিয়ে আপনাকে মাছের দাম বলেন, যেমন কেজি ৩২০ টাকা। হ্যাঁ, এখানে মাছের কেজি হলো স্ট্যান্ডার্ড সার্ভ। তিনি জানেন খুচরা বাজারে ক্রেতা মাছ কিনতে এসেছেন, কিন্তু ক্রেতা মাছ ছটাক বা মণ দরে কিনবেন না। অনুরূপ লেবুর দাম করলেন, বিক্রেতা বলবেন এক হালি এত, এক ডজন এত দাম।

আপনি স্বর্ণের দোকানে গেলেন। লিখিত মূল্য ইলেকট্রনিক বোর্ডে হয়তো জ্বলজ্বল করছে। কী লেখা দেখছেন? হ্যাঁ, নির্দিষ্ট গুণ মানের প্রতি তোলা বা প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম এত টাকা। যত ধনীই হোক না কেন, কেউ বলেন না যে তিনি তার সন্তানের বিয়েতে এত কেজি স্বর্ণের গহনা দেবেন। তুলনামূলক দরিদ্র পরিবারও একই। বোঝা গেল, এখানে স্বর্ণের স্ট্যান্ডার্ড সার্ভ হচ্ছে তোলা বা বর্তমানের গ্রাম।

প্রদত্ত এবং আলোচিত উদাহরণগুলোয় দেখা যায় ভোগের উদ্দেশ্যে ক্রেতাসাধারণ যেসব পণ্য খরিদ করেন, তা মূলত বেশ কয়েক প্রকার। কিছু পণ্য তারা সরাসরি ভোগ করেন না। যেমন স্বর্ণ। ভোক্তা তা ব্যবহার করেন সৌন্দর্যবর্ধন বা সামাজিক মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রদর্শনের জন্য। এখানে স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেটজনিত গ্যাপ নেই। উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ভোক্তা সুনির্দিষ্ট দামে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ খরিদ করেন এবং তা ব্যবহার বা ভোগ করেন।

কিছু পণ্য ক্রেতা খরিদ করেন এবং প্রক্রিয়াজাত করে পরবর্তী সময়ে ভোগ করেন। যেমন বাজার থেকে কারো মাছ, মাংস, তরিতরকারি ক্রয় করা। ক্রেতা এসব কিনে বাসায় নিয়ে রান্নাবান্না করে খেয়ে থাকেন। এখানেও বাস্কেট গ্যাপের কারণে ভোক্তা ঠকেন না। কারণ তিনি বাস্কেট সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তিনি জেনে-শুনে তার পছন্দের দ্রব্য দরকষাকষির মাধ্যমে কিনে যথারীতি ভোগ করছেন।

সমস্যা দাঁড়ায় মার্কেট স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেট সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে। সেখানে বস্তুত ক্রেতা ঠকে থাকেন। যেমন ধরা যাক, আপনার চা পান করতে ইচ্ছে হলো। নিকটস্থ চা দোকানে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন এক কাপ চায়ের দাম। দোকানি বললেন, এক কাপ চা ১০ টাকা। আপনি অর্ডার করলেন। কিন্তু অবাক হলেন। কারণ দোকানি খুব ছোট্ট এক পেয়ালায় আপনাকে চা দিলেন। বোঝার সুবিধার্থে ধরে নিচ্ছি, আপনি আশা করেছিলেন ১০ টাকায় ২০০ মিলিলিটার সমপরিমাণ কাপে চা পাবেন। কিন্তু দোকানি ১০০ মিলিলিটার সমপরিমাণ কাপে চা পরিবেশন করলেন। এখানে স্ট্যান্ডার্ড যেহেতু কাপ, তাই আপনি কিছুই বলতে পারছেন না। দোকানিকে কিছু বলার নেই। কারণ তিনি আগেই বলেছেন এক কাপ চা ১০ টাকা।

রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি-পোলাও খেতে গিয়েছেন? একই বিড়ম্বনা। ওই যে দোকানি লিখে রেখেছেন, ফুল প্লেট ২০০ টাকা। এখন প্লেটের আকার, আয়তন কত? ফুল বলতে দোকানি কী বোঝান, আর ক্রেতা হিসেবে আপনি কী বোঝেন? এই দুইয়ের বোঝাবুঝির গ্যাপ হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেট গ্যাপ। আপনি বুঝেছিলেন ফুল প্লেট বলতে হয়তো ২০০ গ্রাম সমপরিমাণ চালের সঙ্গে - টুকরা গোস্ত থাকবে। বাস্তবে সেখানে ১৫০ গ্রাম সমপরিমাণ চাল আর - টুকরা গোস্ত পাওয়া গেলে বলতে হবে স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেট গ্যাপের কারণে আপনি বাকিটুকু ঠকেছেন।

ধরা যাক, আপনি বাসের টিকিট কাটতে গেলেন। কাউন্টারে লেখা সিট হাজার টাকা। হাজার টাকা দিয়ে আপনি টিকিট কিনলেন। টিকিট ক্রয়ের সময় আপনার স্ট্যান্ডার্ড সার্ভের ধারণায় আপনি কল্পনা করলেন, এই বাস বা বাসের সিটটি এই এই সুবিধা-সংবলিত। বাস্তবে যখন বাসে চড়ে সিটে বসতে গেলেন, সেখানে বেশকিছু সমস্যা দেখা গেল। আপনার ধারণার চেয়ে কম সুবিধা পাওয়ার কারণে আপনার ক্ষতিকে বাস্কেট গ্যাপজনিত ক্ষতি বলা যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেট গ্যাপ কীভাবে কমানো যায় এবং উৎপাদক ভোক্তা উভয়েরই উইন উইন অবস্থান নিশ্চিত করা যায়? উন্নত দেশগুলোয় স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেট সার্ভ এবং -সম্পর্কিত গ্যাপ কমানো বা নিরসনের জন্য অনেক ব্যবস্থা বিদ্যমান। খাবারের ক্ষেত্রে ক্যালরির হিসাব যেমন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি জাপানের কোনো কফি শপে কফি পান করতে গেলেন। বিভিন্ন প্রকারের কফিতে ব্যবহূত উপাদানের পরিমাণ এবং পরিশেষে নিট কী পরিমাণ কফি তার ক্যালরি ভ্যালু কত, সব তথ্য দামের সঙ্গে দেয়া থাকবে। যেমন স্টারবাকের এক কাপ রেগুলার লাত্তি কফি, তাতে ক্যালোরি মাত্রা ১২০, অতিরিক্ত এক চা চামচ চিনির জন্য অতিরিক্ত ১৬ ক্যালরি যুক্ত হবে, তার দাম ধরা যাক ১০০ টাকা সমপরিমাণ। কোনো রেস্টুরেন্টে লেখাই আছে এক কাপ ভাতের মূল্য এত, ক্যালরি এত। ডিম, সবজি, মাছ-মাংসের টুকরা, সালাদ, পানীয়, সর্বক্ষেত্রেই ওজন, ক্যালরি এবং মূল্য একসঙ্গে উল্লেখ থাকে। উন্নত দেশের ক্রেতাসাধারণ তাই স্ট্যান্ডার্ড সার্ভ গ্যাপের জন্য তেমন ঠকেন না। ভোক্তা তার নিজের কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ দরকার, তা হিসাব করে অর্ডার দেন, মূল্য পরিশোধ করেন এবং তৃপ্তি সহকারে খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করে বিদায় হন।

উন্নত দেশে রেল, বাস প্রভৃতি যাত্রীসেবায়ও স্ট্যান্ডার্ড সার্ভ গ্যাপ কম। যেমন কোনো যাত্রী তার ক্রয়কৃত বাসের টিকিটের ছবি, যাত্রাকালীন অন্যান্য সেবার সবিস্তর বিবরণ পড়ে তবেই টিকিট কেনে বা কিনতে পারে। সুতরাং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভজনিত গ্যাপের কারণে তার ঠকা-জেতার প্রশ্ন আসে না।

বিভিন্ন অনুন্নত উন্নয়নশীল দেশে এখনো প্রাচীন মার্কেট বাস্কেট প্রথা প্রচলিত। যেমন ফুল প্লেট, হাফ প্লেট, এক সিটের ভাড়া, এক কাপ চা ইত্যাদি। স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেট সার্ভের ক্ষেত্রে আধুনিক ধারণার প্রচলন এবং তার বাস্তবায়ন অতি জরুরি। এটা ঠিক, হুট করে এটা প্রচলন করা যাবে না। এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত অত্যাধুনিক সিস্টেম বিধায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের এর উপকারিতা অনুধাবন শিখতে, প্রচলন করতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে একবার শুরু করা গেলে এর সুফল পাবে উৎপাদক ভোক্তা থেকে শুরু করে আপামর জনগণ। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন পক্ষগুলো বিষয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন বাস্তবায়নকারী সংস্থা, যারা বিশেষত মান নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাদের দক্ষতা উন্নয়নের নিমিত্তে প্রশিক্ষণ জরুরি। পণ্য সেবা উৎপাদক, মধ্যস্বত্বভোগী থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ে সরবরাহকারী সবারই বিষয়ে শিক্ষা দরকারি। পরিশেষে ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা, শিক্ষা অধিকার আদায়ের মানসিকতা স্ট্যান্ডার্ড বাস্কেট সার্ভে গ্যাপ প্রশমনে সত্যিকারের ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যত দ্রুত ভাববে এবং আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তত শিগগির মঙ্গল।

 

. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন