বৃহস্পতিবার | মার্চ ০৪, ২০২১ | ২০ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

ক্যান্সার বাড়ছে কৃষকের মধ্যে

শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, গুরুত্ব পাক কৃষকের স্বাস্থ্যও

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনিয়ন্ত্রিত কৃষি রাসায়নিকের ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে ক্যান্সার বাড়ছে। কিন্তু আমাদের দেশে সম্পর্কিত বিশদ গবেষণা না থাকায় এর ব্যাপ্তি ঠিক কতটা, তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে কৃষি রাসায়নিকের মাত্রাহীন অরক্ষিত ব্যবহারে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও কৃষকের মধ্যে ক্যান্সারের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি বলে খবর মিলছে। নিরাপদ খাদ্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি জনস্বাস্থ্যগত বড় উদ্বেগের বিষয় বৈকি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল। এটি মোকাবেলায় সীমিত কৃষিজমিতে অধিক শস্য উৎপাদন কীভাবে করা যায়, তার উপায় সন্ধান বরাবরই দেশের রাষ্ট্রীয় এজেন্ডায় প্রাধান্য পেয়েছে। উপর্যুপরি সরকারের যথাযথ নীতিসহায়তা, কৃষি ভর্তুকি, কৃষিবিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা, নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত উন্নয়ন কৃষি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। সরকারি আনুষ্ঠানিক ভাষ্য অনুযায়ী দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে কীটনাশক, সার অন্যান্য কৃষি রাসায়নিক ব্যবহারেরও একটি বড় ভূমিকা আছে। ক্রমাগত চাষযোগ্য জমি কমছে অথচ বাড়ছে মানুষ। অবস্থায় বিদ্যমান জমিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের ব্যবহার মাটি, পরিবেশ-প্রকৃতি, প্রাণবৈচিত্র্যসহ সর্বোপরি মানুষের জন্য যে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে, তা এরই মধ্যে স্পষ্ট। বিশেষত এসব উপকরণের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে কৃষকের বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির প্রবণতা নতুন দুশ্চিন্তা হিসেবে আমাদের সামনে এখন হাজির। যথার্থভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এর পেছনে অনিরাপদভাবে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগ, সচেতনতার ঘাটতি, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, কীটনাশক কোম্পানিগুলোর অনৈতিক প্রচারণা প্রভৃতি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা আবশ্যক।

কৃষি খাতে বরাবরই উৎপাদন বাড়ানো প্রাধান্য পেলেও কৃষকের স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থেকেছে। দেশ শিল্পায়নমুখী হলেও আরো অনেকদিন কৃষি আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় মাত্রায় থাকবে। কাজেই কৃষকের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি জরুরি। এখন কৃষকের মধ্যে যে ক্যান্সার বাড়ছে তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হওয়া দরকার। শুধু রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে, নাকি অন্য কারণেও দীর্ঘস্থায়ী রোগ বাড়ছে, সেটি নির্ণীত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন ধরনের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি, সেটি চিহ্নিত করতে হবে। কাজেই জনস্বাস্থ্য গবেষকদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় বিভিন্ন দেশে কৃষি রাসায়নিকের যথাযথ নিবন্ধন না হওয়া, বৈশ্বিকভাবে নির্ধারিত মাত্রায় সেগুলো প্রয়োগ না হওয়া, প্রয়োগকালীন সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা, আন্তর্জাতিক গাইডলাইনের আলোকে জাতীয় পর্যায়ে -সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা না থাকা, তদারকির ঘাটতি, জাতীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ল্যাবরেটরি সক্ষমতা না থাকার বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এসব উদ্বেগের যথার্থতা আছে বৈকি। কৃষির উদীয়মান চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এসব ক্ষেত্রে উন্নতির সময় এসেছে।

কৃষি রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে কৃষকের সচেতনতা বাড়ানো প্রথমত দরকার। এসব উপকরণ প্রস্তুত বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা কৃষকের দোরগোড়ায় হাজির। তাদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে কৃষকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন। কোনটার মান ভালো, কোনটারই-বা মান খারাপ তা বাছবিচারের জ্ঞান যেমন তাদের নেই, তেমনি কীভাবে কতটুকু মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে, এটি সম্পর্কেও যথেষ্ট ধারণা নেই। ফলে গ্লাভস, মাস্ক, পিপিইসহ কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় তা প্রয়োগ করছেন তারা এবং বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। কাজেই -সম্পর্কিত সচেতনতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সুরক্ষা উপকরণে ব্যয়েরও একটা বিষয় আছে। দাম বেশি হলে কৃষকরা তা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবেন। এগুলো কীভাবে যৌক্তিক দামে সরবরাহ করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। মানমাত্রা অনুযায়ী যেন কৃষি রাসায়নিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার করা যায়, তার জন্য কৃষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে। সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এছাড়া রাসায়নিক প্রয়োগে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারে সুফল মিলতে পারে। কৃষকের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করাও জরুরি। একইভাবে ভুয়া অখ্যাত কোম্পানির পাশাপাশি প্রভাবশালী কিছু কোম্পানি যে নিম্নমানের রাসায়নিক বাজারজাত করছে, তা বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তদারকির জন্য জনবল ঘাটতি এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে। বিশেষ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্লান্ট প্রটেকশন উইং এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই সামর্থ্যহীন। ল্যাবরেটরি সক্ষমতাও অনুল্লেখ্য। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো চাই। কৃষি ক্ষেত্রে রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক গাইডলাইনের আলোকে সময়োপযোগী বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন তার যথাযথ বাস্তবায়নও করতে হবে। জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো কীভাবে কৃষিতে রাসায়নিক উপকরণের চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করছে, সেই অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

বর্তমানে প্রতিবেশগত সুরক্ষার জায়গা থেকে বিশ্বে রাসায়নিক কৃষি বনাম জৈব কৃষির একটা তর্ক চলছে। জৈব কৃষির মাধ্যমে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে বড় মাত্রায় সাফল্য দৃশ্যমান নয়। বাস্তবতায় পুরোপুরি রাসায়নিক কৃষি উপেক্ষা করার এখনই সুযোগ নেই। রাসায়নিক কৃষির পাশাপাশি আমাদের ঐতিহ্যিক চর্চাগুলোর একটা মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। রাসায়নিক কৃষি উপকরণের নির্বিচার ব্যবহারে মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধি বাড়ার সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে মাটিতে বসবাসকারী উপকারী অণুজীব কেঁচোর মতো উপকারী জীব। মাটি হারাচ্ছে সহজাত উর্বরতা শক্তি। রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ বৃষ্টি সেচের পানিতে চুইয়ে পড়ছে প্রাকৃতিক জলাশয়, নদী-নালা খাল-বিলে। ধ্বংস হচ্ছে জলজ প্রাণী উদ্ভিদ। বিনষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কৃষি পদ্ধতি, প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন, নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন। সেগুলো প্রবর্তনের মাধ্যমে কৃষির পরবর্তী উত্তরণ ঘটবে বলে প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন