বুধবার | জানুয়ারি ২০, ২০২১ | ৭ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা: পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসন ভাবনা

মাসুমা সিদ্দিকা

রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেশ-বিদেশের নানা বিশেষজ্ঞ এমনকি সাধারণ মানুষও নানা মতামত প্রকাশ করছেন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে কি নিদারুণ অত্যাচার হয়েছে তা আমাদের কমবেশি সবারই জানা। বাংলাদেশের মত একটা সীমিত আর্থিক সামর্থের দেশ এই মানুষ গুলোর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের উত্তর ভাগে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা; যাদের বেশিরভাগেরই ধর্ম ইসলাম। তারা মিয়ানমার এর সামরিক জান্তা ও উগ্র রাখাইনদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকার হয় এবং যার ফলশ্রুতিতে তারা নিজেদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। বাংলাদেশে তাদের জন্য সাধ্যমত এক ব্যবস্থা করেছে ভাসানচরে।
রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থান দেওয়া কোন স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি একটি সাময়িক আশ্রয়। রোহিঙ্গারা যদি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যায়, তবে এটি একটি অনৈতিক উদাহরণ সৃষ্টি করবে বলে বলা যায়। তাই সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে যে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ তাদের সেখানে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করা নয়। যদি তাদের সেখানে বা কুতুপালংয়ে বা কক্সবাজারের অন্যান্য জায়গায় বা বাংলাদেশের অন্য কোথাও স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়, তার অর্থ দাঁড়ায় মিয়ানমারের অপকর্মকে প্রশ্রয় দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে কোন নৃগোষ্ঠীর এরকম লাখ লাখ মানুষকে কোন শাসকগোষ্ঠী দ্বারা বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে দেশত্যাগে বাধ্য করা মোটামুটি একটি বিরল ঘটনা। আর যদি এই অপকর্ম করেও মায়ানমার তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য না হয়, তাহলে তা একটি বিপদজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। আগামীতেও কোন শাসক গোষ্ঠী অনুকূল পরিবেশ পেলে অর্থাৎ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোন নৃগোষ্ঠীর মানুষ সম্বন্ধে ক্ষোভ, ভীতি, ঘৃণা ছড়িয়ে বিভিন্ন রকম অত্যাচার নিপীড়ন চালিয়ে তাদের ব্যাপক আকারে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে পারে, যা শুধু সেই দেশ বা অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যাহত করবে না, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেও ব্যাহত করতে পারে।
মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এই রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন সময়ে নানা মত দিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি এই রোহিঙ্গা সমস্যার। কোনো উদ্যোগেই কাজ হয়নি, বরং বাংলাদেশের ওপরেই চাপ বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু বাংলাদেশ ছোট্ট একটা উন্নয়নশীল দেশ হয়েও এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা সব ব্যবস্থা করে আসছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় অথচ বাংলাদেশে যখন তাদের বেঁচে থাকার জন্য কিছু আশ্রয়, খাদ্য বস্ত্রের ব্যবস্থা করছে তখন তারা এ ব্যাপারে বিভিন্ন উচিত-অনুচিতের বুলি আওড়াচ্ছেন যা বাস্তবতা বিবর্জিত। 
অন্যদিকে ভাসানচরে রোহিঙ্গারা পাচ্ছে নিজেদের জন্য আলাদা ঘর, রান্নার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ,পানি , পয়নিষ্কাশন সুবিধা। সেই সাথে খেলার মাঠ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এমনকি পশুপালন ও কৃষি কাজের মাধ্যমে সেখানে জীবিকা নির্বাহেরও সুযোগ রয়েছে যা তাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। কক্সবাজারের ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপদ আশ্রয় দিতে সরকারকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। এখানে ১২০টি ক্লাস্টার বা গুচ্ছগ্রাম রয়েছে যার প্রতিটিতে রয়েছে বারোটি করে হাউজ। প্রতিটি হাউজে রয়েছে ষোলটি করে কক্ষ যার প্রতিটিতে চারজন এর একটি পরিবার থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্য ঘরগুলোকে উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে এবং উঁচু বেড়ি বাঁধও তৈরি করা হয়েছে। এটা হয়ত কেউ দাবি করবে না যে ভাসানচরে সুযোগ-সুবিধা বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের মানদণ্ডের সাথে তুলনীয়। কিন্তু এ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষের থেকেও ভাসানচরে যে বেশি সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা বলা অত্যুক্তি হবে না।
অথচ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো এতে নানা আপত্তি তুলছে। নিরাপত্তার বিষয় সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে এই রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা ঠিক হবে না বলে মত দিচ্ছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ , অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধরনের কথা বলে আসছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আজ পর্যন্ত তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর কোনো কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ।
কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে বিপুল রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে সেখানকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়েছে। স্থানীয় লোকজনের কাজের অভাব দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা, পানি, পয়ঃ নিষ্কাশন ইত্যাদির ওপর অনেক বাড়তি চাপ পড়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো শুধু সে অঞ্চলের বসবাসকারী বাংলাদেশীদের জন্য নয়, রোহিঙ্গাদের জন্যও  বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে গাদাগাদি পরিবেশের থেকে ভাসানচর অধিকতর সুবিধাজনক বলেই বলা যায়। তাই রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে  সম্যকভাবে ধারণা দেয়া গেলে এবং ভাসানচর সম্পর্কে  নানাবিধ অমূলক প্রচারণার যোগ্য জবাব দেয়া গেলে আরো অনেক বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গা সেখানে যেতে উৎসাহী হবেন বলে আশা করা যায়। আর যত বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায়  সেখানে যেতে আগ্রহী হবেন ততই সেখানকার অবকাঠামোর শুধু যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে না, ভাসানচর সম্বন্ধে বিভিন্ন অপপ্রচারও  কমবে বলে আশা করা যায়।
অনেকে বলে থাকেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের উচিত হয়নি। বাংলাদেশের মতো ছোট্ট এদেশে ১১ লাখ লোককে আশ্রয় দেওয়া সত্যিই এক চ্যালেঞ্জ এর মত। কিন্তু আমরা যদি আমাদের আর্থিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা শুধু চিন্তা না করে মানবিকতার কথা চিন্তা করি, তবে আমরা রোহিঙ্গাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার সমব্যথী না হয়ে পারি না। আমাদের স্মৃতি যদি গোল্ডফিশের মত সীমিত না হয়, তাহলে অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে আমাদের প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে যখন প্রথম রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয় তখন বাংলাদেশের খুব কম মানুষই এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তাই আজ এই নিয়ে আবার কথা তোলাটা এক ধরনের কপটতা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের বাস্তবতা বিবর্জিত একটি মানদণ্ডে ভাসানচরের সুযোগ-সুবিধাকে তুলনা করে এর বিরোধিতা করা সমীচীন হবে। আর সর্বোপরি, রোহিঙ্গারা যেন তাদের নিজেদের দেশে, নিজেদের গৃহে ফিরতে পারে সেজন্য আন্তর্জাতিক মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনে রাখতে হবে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে তাদের নিজ বাসভূমে সম্মানের সাথে প্রত্যাবর্তন করতে ব্যর্থতার অর্থ হবে প্রকারান্তরে মায়ানমারের অন্যায় কে প্রশ্রয় দেওয়া। এই বিষয়টি তাই শুধু রোহিঙ্গাদের বা বাংলাদেশের বিষয় নয়; বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নও বটে।

লেখক: রন্ধন শিল্পী ও ফ্রিল্যান্স লেখক  

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন