মঙ্গলবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

খবর

বস্তি বেশি ঢাকায়, অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানি চট্টগ্রামে

নিহাল হাসনাইন

একের পর এক বস্তিতে আগুনের ঘটনা ঘটছে। পুড়ছে ঘর। আবারো গড়ে উঠছে নতুন বসতি। ভাঙা-গড়ার খেলায় নিঃস্ব হচ্ছেন হতদরিদ্র বস্তিবাসী। আগুনের ঘটনায় গত বছর রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এসব আগুনের নেপথ্যের কারণ থেকে যাচ্ছে অজানাই। ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে গত চার বছরে বস্তির আগুনের ৬০ দশমিক ৩২ শতাংশই ঘটেছে চট্টগ্রামে। আবার প্রাণহানিও সেখানে বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবে মানবশূন্য হয়ে যাওয়ার পর বস্তিতে আগুন দেয়া হতো। কিন্তু এখন বসতিপূর্ণ বস্তিতেই পরিকল্পিতভাবে আগুন দেয়া হচ্ছে। ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

বিবিএসের ২০১৪ সালের বস্তিশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বস্তির সংখ্যা হাজার ১১৩টি। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে রয়েছে হাজার ৩৯৪টি। আর বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বস্তির সংখ্যা হাজার ২১৬।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সর্বপ্রথম সাড়া দেয় সরকারি সংস্থা ফায়ার সার্ভিস। তাদের তথ্যমতে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চার বছরে দেশের আট বিভাগের বস্তিগুলোয় মোট হাজার ৪৬টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের বস্তিতেই ঘটে ৬৩১টি অগ্নিকাণ্ড, যা মোট অগ্নিকাণ্ডের ৬০ দশমিক ৩২ শতাংশ। এর বাইরে রংপুরে বস্তিতে ২৬০টি, ঢাকায় ১২৩টি, সিলেটে ১৫টি, খুলনায় সাতটি, বরিশালে ছয়টি, রাজশাহীতে তিনটি ময়মনসিংহে বস্তিতে একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রি.জে আলী আহমদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, বেশির ভাগ বস্তিতেই অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। আর অবৈধ সংযোগে ব্যবহূত সরঞ্জামও থাকে নিম্নমানের। তাই দেখা যায় শর্ট সার্কিট হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া বস্তিতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে চুলা ব্যবহারের কারণ এবং দুই পক্ষের শত্রুতা দখল পুনঃদখল কেন্দ্র করেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

শুধু বস্তির অগ্নিকাণ্ডের দিক থেকেই শীর্ষে নয়, প্রাণহানিও বেশি হয়েছে চট্টগ্রামে। গত বছরেই বিভাগটির বিভিন্ন বস্তিতে ২৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গেছেন চারজন। আর গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন আরো চারজন। চট্টগ্রামের বস্তির আগুনগুলোর ক্ষেত্রে বেশির ভাগই ছিল দাহ্য পদার্থের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুন। ধরনের আগুনে প্রাণহানির শঙ্কা যেমন বেশি থাকে, তেমনি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হয়। পূর্বপরিকল্পিত অগ্নিকাণ্ডগুলোতেই সাধারণত এমন দাহ্য পদার্থ বেশি দেয়া হয়।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, সেখানকার অধিকাংশ বস্তিই গড়ে তোলা হয়েছে পাহাড় কেটে। বস্তিগুলোর অবস্থান সমতল থেকে বেশ উঁচুতে হওয়ায় সেখানে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ সময় লেগে যায়। তাছাড়া অধিকাংশ বস্তিতে আগুন দেয়ার আগে দাহ্য পদার্থের ব্যবহার হওয়ায় আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, সমতল থেকে বেশ উঁচুতে বস্তির অবস্থান হওয়ায় সেখানে বাতাসের বেগও বেশি থাকে। ফলে দ্রুত আগুন চারদিকে ছড়িয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

গত বছর দেশের আটটি বিভাগে বস্তিতে ৯৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মারা গেছেন ১০ জন। আর আহত হয়েছেন ২৮ জন। ২০১৯ সালে ১৭৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছিল না কোনো প্রাণহানির ঘটনা। ওই বছর আহত হয়েছিলেন তিনজন। ২০১৮ সালে ৫২৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণহানি হয়নি। আহত হয়েছিলেন দুজন। ২০১৭ সালে বস্তিতে ২৫৪টি অগ্নিকাণ্ডে একজন নিহত ১০ জন আহত হয়েছিলেন।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, সব ধরনের অবৈধ সংযোগ নিয়ে গড়ে তোলা হয় বস্তি। এজন্য সেখানে নিয়মিত গ্যাস বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া অল্প জায়গার মধ্যে অধিক সংখ্যক লোকের বাস হওয়ায় সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে প্রাণহানিও বেশি হয়।

বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের অধিকাংশ ঘটনার কারণই থেকে যায় অজানা। যদিও প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর কারণ অনুসন্ধানে কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে। কিন্তু সেই কমিটি আগুনের উৎস সম্পর্কে জানাতে পারলেও কারণ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানাতে পারেন না।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (পরিকল্পনা, উন্নয়ন প্রশিক্ষণ) লে. কর্নেল এসএম জুলফিকার রহমান বলেন, আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমাদের গঠিত কমিটি কেবল অগ্নিকাণ্ডের উৎস এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে পারে। কিন্তু এর বাইরে যদি সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে কিছু আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়ে থাকে। এজন্য ফরেনসিক ল্যাবের প্রয়োজন। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের কোনো নিজস্ব ফরেনসিক ল্যাব নেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন