মঙ্গলবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

আহমেদ সুমন

১২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। মহামারী করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ দিবসটি ভার্চুয়ালি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমান বয়সী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং অর্জন স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসতে পারে। তারআগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খানিকটা তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। 

ইংরেজ শাসনামলেই পূর্ববাংলায় একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষিত হবার পরে অখণ্ড ভারতের প্রধান প্রশাসক লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন। এ সময় নওয়াব স্যার সলিমুলাহ সহ আরও অনেকে পূর্ববাংলার মানুষের জন্য একটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি জানান। পূর্ব বাংলার মানুষজনের উপর্যুপরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ প্রশাসন ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন পূর্ববাংলার নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। ১৯২১ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, কৃষি, প্রকৌশল ও চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয় স্থাপিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর জেলার সালনায়। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সাভার এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন স্থান নির্বাচন করা হয়। সাভারের ওপর দিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে। এই মহাসড়কের পশ্চিম পাশে নির্ধারণ করা হয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্থান। এর পূর্ব পাশে রয়েছে ডেইরি ফার্ম, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উত্তর-পূর্ব পাশে সাভার সেনানিবাস ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প প্রধান হিসেবে ড. সুরত আলী খানকে নিয়োগ করা হয়। ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান সরকার এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম করণ করে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসাবে যোগদান করেন বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজউদ্দিন আহমদ। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রিয়ার এ্যাডমিরাল এস এম আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর উদ্বোধন করেন। তবে এর আগেই ৪ জানুয়ারি অর্থনীতি, ভূগোল, গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগে ক্লাশ শুরু হয়। প্রথম ব্যাচে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিলো ১৫০ জন। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট পাশ করা হয়। এই এ্যাক্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’। ৬৯৭.৫৬ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫টি অনুষদের  অধীনে ৩৬টি বিভাগ চালু আছে। এছাড়া ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ-জেইউ), বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেন্সিং ও ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। আবাসিক হল ১৬টি। নির্মাণাধীন রয়েছে ৬টি। ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১৫ হাজার। 

সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালটির ভৌত অবকাঠামোগত পরিবর্তন লক্ষণীয়। প্রায় সাড়ে ১৪শ কোটি টাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান, যা সম্পন্ন হলে ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে সম্পূর্ণ আবাসিক হিসেবে গড়ে উঠা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সমস্যা সম্পূর্ণভাবে দূর হবে। এ প্রকল্পের আওতায় ছাত্র-ছাত্রীদের ৬টি আবাসিক হল, শিক্ষক-অফিসার ও কর্মচারিদের আবাসিক টাওয়ার, প্রশাসনিক ভবন, অত্যাধুনিক কনভেনশন সেন্টার, পরীক্ষা হল নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও কয়েকটি একাডেমিক ভবন এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সম্প্রসারণ করা হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবয়ব আমুল বদলে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর সময়কালে ভৌত অবকাঠামোগত আমুল বদলে যাওয়া শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কী না, তা নিয়ে অভিজ্ঞজনদের মধ্যে মত পার্থক্য থাকতে পারে। এতদ্সত্ত্বেও ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সময়োপযোগী নতুন বিভাগ খোলা, অধিক সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করার সুযোগ হওয়া, ল্যাবরেটরিতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোগ ঘটলে তাতে শিক্ষার উন্নয়নে নতুন নতুন মাত্রা যে যুক্ত হয় তা, তা অস্বীকার করা যায় না। 

এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বিগত পঞ্চাশ বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য বা অর্জন,স্বল্প পরিসরে এ নিবন্ধে  তুলে ধরা সম্ভব না। শিক্ষা, গবেষণা, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি. রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দেয়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীগণ দ্যূতি ছড়িয়েছেন। নতুনত্ব এবং অভিনবত্বে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কীর্তি অনেক। পঞ্চাশ বছরের সুবর্ণজয়ন্তীতে এ নিবন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি নতুনত্ব এবং অভিনবত্ব তুলে ধরার প্রয়াস করছি। 

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়। এই দিবস পালনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পথিকৃৎ। ২০০১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুল বায়েস ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালনের প্রচলন করেন। নতুন নজির সৃষ্টিতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের নাম যুক্ত হয়েছে। বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিযুক্তির মাধ্যমে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম নারী উপাচার্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে একজন মহিলা রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করছেন। রহিমা কানিজকে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নজির স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ব মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’ নির্মাণের মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চার অনন্য নজীর স্থাপন করা হয়েছে। এ গবেষণা কেন্দ্রে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণাগারে কীটপতঙ্গের জিনের বারকোডিং করা হচ্ছে, যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম খোলা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তম’ বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম, যা উপাচার্য অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সময়ে নির্মাণ করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের সাংস্কতিক রাজধানী বলা হয়। ১৯৮০ সালে সেলিম আল দীন রচিত ‘শকুন্তলা’ নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক রাজধানীর তীর্থস্থান খ্যাত এই মুক্তমের যাত্রা শুরু হয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী প্রীতিলতার নামে হলের নামকরণ, ভাষা আন্দোলনের স্মারক ভাস্কর্য ‘অমর একুশ’ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’ ভাষা শহীদ সালাম বরকত ও রফিক জব্বারের নামে হলের নামকরণ, জাতির পিতার নামে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ নামে হলের নামকরণ, ঘাতক দালাল নির্র্মূল আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জাহানারা ইমামের নামে ছাত্রী হলের নামকরণ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নামে ছাত্রী হলের নামকরণ, জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ছাত্রী হলের নামকরণ, নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ কবি সুফিয়া কামাল নামে হলের নামকরণ, বঙ্গবন্ধুর প্রেরণাদানকারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব নামে ছাত্রী হলের নামকরণের মধ্যদিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। 

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম ‘সাংবাদিক সমিতি’ চালু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’ গঠন করা হয়, যার অংশীজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন সংগঠন। প্রাকৃতিক জলাধার এবং অতিথি পাখির অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনন্য অবদান সকলেরই জানা। পাখিমেলা এবং প্রজাপতি মেলা আয়োজনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য কীর্তি দেশজুড়ে সমাদৃত। এবং বাংলাদেশে এ দুুটি মেলা এখানেই প্রথম চালু হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আয়োজনে বিপন্নপ্রায় বণ্যপ্রাণি সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং প্রজাপতি পার্ক স্থাপন করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান দেশ-বিদেশে প্রশংসা লাভ করেছে। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অপর অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রজাপতি সংগ্রহ করে সেসব প্রজাপতির নামকরণ করেছেন, যা অনন্য। মহামান্য হাইকোর্টের নিদের্শনার আলোকে দেশের মধ্যে প্রথম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী অভিযোগ সেল’ গঠিত হয়।      

বাংলাদেশে পুতুল নাচের ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার জন্য পুতুল নাট্য গবেষণা কেন্দ্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম খোলা হয়েছে। বিশেষ চহিদা সম্পন্ন শিশুকিশোরদের জন্য আনন্দশালা নামে একটি স্কুল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম খোলা হয়েছে।  যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনার ভাগার না দিয়ে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে তা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপন্ন করার অনন্য নজীর স্থাপন করা হয়েছে।

আমরা বিভিন্ন সময়েগণমাধ্যম বিশেষত সংবাদপত্রেজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ধরনের খবর লক্ষ করি। এসব খবরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, গবেষকদের অর্জন ও সাফল্যের খবরের পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম নিয়ে নেতিবাচক খবরও লক্ষ করি। মূলত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাংবাদিকগণই এসব খবর প্রেরণ করেন। 

‘ভালো কিছু খবর নয়, খারাপ কিছু খবর’- গণমাধ্যমগুলোর সংবাদমূল্যের এই মানদণ্ডে হয়তো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ভালো কীর্তি সংবাদপত্রে স্থান পায় না। ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির বিভিন্ন গোষ্ঠি, দ্বন্দ্ব, কোন্দল এবং তাদের কার্যকলাপ নিয়ে খবরা-খবরও আমরা লক্ষ করি। পরীক্ষার ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতার খবর লক্ষ করি বটে, তবে দ্রুত ফল প্রকাশের ঘটনা খবর হতে দেখি না। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গিয়ে না ফিরলে তাকে নিয়ে আমরা অনেক খবর হতে দেখি। কিন্তু যিনি বিশ্বমানের ভালো গবেষণা করে ফিরেছেন, তাকে নিয়ে তেমন খবর হতে দেখি না। বিশ্বের শতকরা দুইভাগ সেরা বিজ্ঞানীদের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এ মামুন এবং প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইব্রাহিম খলিলের অন্যন্য সাফল্যের খবর আমরা আরও অধিক সংখ্যক পত্র-পত্রিকায় আশা করেছিলাম।

বলা প্রয়োজন যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবটি এমন সময়ে এসেছে, যখন সারা বিশ্ব মহামারি করোনায় নাকাল। করোনা স্থায়ী রূপ নেয়ার ফলে মানুষ তার যাপিত জীবনে বিকল্প নিয়ে চিন্তা করে ভার্চুয়াল সভা, সেমিনার ও অনুষ্ঠানাদিতে অভ্যস্ত হচ্ছে। ২৪ নভেম্বর ২০২০ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের কাউন্ট ডাউনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালনের প্রশাসনের চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. আলমগীর কবীরের পরিচালনায় ওই অনুষ্ঠানে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের আশা ছিলো আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠান খুবই আড়ম্বরে পালন করবো। কিন্তু করোনাকালীন দুঃসময়ের কারণে আমরা হয়তো সেভাবে তা করা যাচ্ছে না। তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছরের সুবর্ণ অর্জনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আন্তরিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। সেই অনুষ্ঠানে আমাদের প্রাণের পরশ থাকবে। বর্তমান অনুষ্ঠান আয়োজনে করোনা বাস্তবতায় শিক্ষার্থী ছাড়া ক্যাম্পাস প্রাণহীন। অনুষ্ঠান আয়োজনে এ বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে। করোনা মহামারিকালে তথ্য-প্রযুক্তির চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সুখানুভূতি আমরা কাজে লাগিয়ে অনলাইনে নানা ধরনের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা  হবে।’ উপাচার্য বলেন,‘ আমরা লক্ষ করছি যে, স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ১৬ ডিসেম্বর, এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুবর্ণজয়ন্তী ১২ জানুয়ারি এবং মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী ১৭ মার্চ- এ তিনটি বিশেষ দিনের অসাধারণ সংযোগ ঘটেছে।’ উপাচার্য বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।’ 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের মধ্যদিয়ে আরও সামনের দিকে অগ্রসরমান। এ কথা বলা যায় যে, সুবর্ণজয়ন্তী প্রাক্কালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য বা অর্জন দীপ্তিময়। আগামীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তবুদ্ধি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় দেশ ও জাতি আরও ঋদ্ধ হবে, সে আশা করা যায়।


লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী (২২তম ব্যাচ), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাবি

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাবি সাংবাদিক সমিতি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন