সোমবার | মে ২৩, ২০২২ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

সিন্ধুর আগমন

শতাব্দীর সূর্য—বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

ইনাম আহমদ চৌধুরী

তিন দেশের ছাড়পত্রে দুই শতাব্দীতে ব্যাপ্ত আট দশকাধিক দীর্ঘ বিচিত্র জীবনের পথপরিক্রমায় যেসব অনন্যসাধারণ বৈশ্বিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের বা সৌভাগ্যবশত সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে, তাদের মধ্যে অবিসংবাদিতভাবে সর্বোচ্চ মহিমান্বিত আসনে দেদীপ্যমান শেখ মুজিবুর রহমান। সর্বকালের সর্বদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অভ্রভেদী উচ্চতার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিব এবং আমি, আমরা, তারই সৃষ্ট বাংলাদেশেরস্বাধীন সার্বভৌম বাংলার গর্বিত নাগরিক। এটাই তো আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়, এই দেশই তো আগামীতে আমাদের উত্তরসূরিদের চিরকালের নির্ভয় ঠিকানা।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন মহাত্মা গান্ধীর তিরোধানে বলেছিলেন, আগামী প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে যে তার মতো রক্ত-মাংসের গড়া একজন মানুষ কোনো কালে পৃথিবীর বুকে পদচারণা করেছিলেন। সত্য, সাম্য ন্যায়ের ধ্বজাধারী কালজয়ী বিপ্লবী কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, হিমালয় (পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত) তিনি কখনো দেখেননি, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেই তার হিমালয় সন্দর্শন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ছিল একটি যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। বাস্তবিকই পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মানবিক উচ্চতার আরেকজন জননায়কের দেখা মেলে না, যিনি সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির প্রতিবাদী হয়ে, মাতৃভাষার বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ধ্বজাধারী হয়ে একটি জাতিসত্তার সৃষ্টি করেন। সবার প্রতি ভালোবাসা অহিংসার বাণী নিয়ে, চরম রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার অসাধ্য সাধন করেছিলেন। ভাবলে গৌরবমিশ্রিত একটি অনুভূতির সৃষ্টি হয় যে এমন একটি মহামানবের ব্যক্তিগত সান্নিধ্য লাভের বিরল সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

সাল ১৯৫৩। আমি তখন ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি। ২১ ফেব্রুয়ারি কলেজ প্রাঙ্গণে আমাদের উদ্যোগে স্থানীয় মালমসলা দিয়েই কর্তৃপক্ষের তুমুল বাধা সত্ত্বেও একটি শহীদ মিনার নির্মিত হলো। জিএস হিসেবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে উদ্বোধন করলাম। কলেজ কর্তৃপক্ষ রুষ্ট হয়ে শৃঙ্খলাবিরোধী কাজের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিচ্ছিল। এপ্রিল কলেজ ছাত্র সংসদের উদ্যোগে তদানীন্তন ব্রিটানিয়া হলে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গণতান্ত্রিক সাম্যবাদী চেতনাবিধৃত একটি গীতিনকশা কবি-সাহিত্যিক বন্ধুবর আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অমর কালজয়ী গানআমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আলতাফ মাহমুদের কণ্ঠে জনসমক্ষে প্রথম পরিবেশিত হলো। গীত হলোকারার লৌহ-কপাট’, আব্দুল লতিফেরওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়এবং ওই জাতীয় বিপ্লব বিদ্রোহভিত্তিক গান। পুলিশ রিপোর্ট হলো অনুষ্ঠানে হয়েছে সরকার হটানো এবং জেল ব্রেকিংয়ের আহ্বান। গভর্নিং বডির জরুরি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্রনেতা ইকবাল আনসারী খান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ভিপি মশির হোসেন, গায়ক আতিকুল ইসলাম জিএসকে (অর্থাৎ আমাকে) কলেজ থেকে বহিষ্কৃত করা হলো। আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে শুরু হলো ক্লাস বয়কট আন্দোলন। একপর্যায়ে আমরা দেশের প্রধান বিরোধী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তদানীন্তন রমনা রেস্ট হাউজে দেখা করলাম। তা ছিল তখন বিরাট উত্তেজনা শ্লাঘার ব্যাপার। সব শুনে তিনি বললেন, ‘সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে পিটিশন দাও। সুরাহা না হলে কোর্টে যাওয়া যাবে। প্রদর্শিত অভিযোগে বহিষ্কারাদেশ ধোপে টিকবে না সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসতেই দেখা হলো এক দীর্ঘদেহী সুদর্শন নেতৃত্বসুলভ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। আমি চিনতাম না, কিন্তু সহসঙ্গী দু-একজন বলে উঠলেনএই তো শেখ মুজিবুর রহমান (তখনো তিনি বঙ্গবন্ধু অভিহিত নন) বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের দাবি আদায়ের সফল আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা থেকে সুখ্যাত। তাকে ঘটনাটি বলা যায়। তিনি আগ্রহসহকারে আমাদের বৃত্তান্ত শুনলেন। বললেন (এই মর্মে)—‘তোমাদের কথা অবশ্য আমি আগেই শুনেছি। কর্তৃপক্ষ মাত্রাতিরিক্ত অন্যায় কাজ করেছেন। তোমাদের জোর আন্দোলন করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে। অন্য কলেজের ছাত্রদেরও সহযোগিতা চাও। আমরা সমর্থন দেব।

আমরা বিপুলভাবে উৎসাহিত উদ্দীপিত বোধ করলাম। আরো জোরালোভাবে শুরু হলো আন্দোলন। বিস্তৃততর পরিবেশে। বস্তুতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানের ওই বলিষ্ঠ উৎসাহব্যঞ্জক কথাগুলো ছিল এক অর্থে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। কিছুকালের মধ্যেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলো। জীবনের প্রারম্ভেই মহান নেতার (পরবর্তী সময়ে জাতির পিতার) এমন একটি উদ্দীপক সাক্ষাৎ হয়ে দাঁড়াল আমার জীবনের এক শ্রেষ্ঠ অর্জন।

পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও ছাত্ররাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। ১৯৫৪-৫৫ সালের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন ভিপি এএমএ মুহিত (পরবর্তী সময়ে সচিব অর্থমন্ত্রী), জিএস মাহবুব আনাম এবং জয়েন্ট সেক্রেটারি হয়েছিলাম আমি। পরবর্তী দশকের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ বা নেতৃত্বসুলভ ভূমিকা। গবেষক লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ তার কাগমারী সম্মেলনবিষয়ক গ্রন্থে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বন্ধুবর জহির রায়হান আমার নাম উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি হয়েছিলাম আমি এবং জিএস হয়েছিলেন জহির রায়হান। মনে পড়ে, তখন শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যস্থতায়ই কাগমারী সম্মেলনের জন্য প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী লাখ টাকা প্রদান এবং বহুবিধ সহায়তা করেছিলেন। ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে যখন চৌ এন লাই ঢাকা এলেন, তখন যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসীন। ঢাকার ছাত্ররা চাইল তাকে অভ্যর্থনা দিতে। সময়াভাবে সেটা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মধ্যস্থতায় ঠিক হলো যে অতিথির মোটর শোভাযাত্রা যখন বর্তমান টিএসসির পাস দিয়ে যাবে, ওই সময় তিনি সামান্য ক্ষণ যাত্রাবিরতি করবেন। তখন ছাত্রদের পক্ষ থেকে আমি তাকে একটি স্বাগত অভিনন্দন সূচক মানপত্র দিয়েছিলাম এবং চৌ এন লাই সংক্ষিপ্ত উৎসাহব্যঞ্জক প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন। তখন দেশে-বিদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রভূত সম্মান স্বীকৃতি। এজন্যই সম্ভবত ১৯৫৭ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে এসে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির কিছুটা নতুন মোড়ের ব্যাখ্যা দেবেন বলে স্থির হলো। জানুয়ারি ১৯৫৭ সালে জাতিসংঘ নির্দেশিত কাশ্মীরেরডিসপুটেড স্ট্যাটাসএবং গণভোটের সিদ্ধান্তের বরখেলাপে ভারতভুক্তির একটি ঘোষণা ভারত সরকার দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের এতটাই গুরুত্ব দেয়া হতো যে সরকার স্থির করল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ব্যাখ্যামূলক ভাষণ দেয়ার জন্য হেলিকপ্টারে এমএস হল টেনিস কোর্টে অবতরণ করবেন এবং তার সঙ্গে থাকবেন মাত্র একজন ছাত্রদের জন্য সর্বগ্রহণযোগ্য নেতা। আর তিনি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বস্তুতপক্ষে তার উপস্থিতির জন্যই পূর্ণ শান্তি-শৃঙ্খলার মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি কাশ্মীরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভিন্ন মতাবলম্বী ছাত্রদের ওই বিরাট সমাবেশ করা সম্ভবপর হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তার বিখ্যাত ++ = থিওরি বিশ্লেষণ করে বোঝালেন, শুধু দুর্বল বা অকার্যকর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সখ্য করলে কর্মক্ষেত্রে প্রাপ্তিতে শূন্যই থেকে যায়। তাই বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রতিষ্ঠা স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন শক্তিধরদের সঙ্গেও সখ্য স্থাপন। (পৃ. ৩১ শেখ মুজিব, লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড বাংলাদেশ, আবদুল খালেক, বাংলাদেশের প্রথম স্বরাষ্ট্র সচিব এবং আইজিপি) তবে দেশীয় স্বার্থ নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন রেখে।

পরবর্তীকালেমানুষের নেতাবঙ্গবন্ধু যখন অনুধাবন করলেন বাংলার উন্নয়নের জন্য, বাংলার মানুষের সুখ, শান্তি, অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন বাংলারই ক্ষমতায়ন এবং তারই উদ্ভাবিতছয় দফাএনে দিতে পারে মুক্তির সনদ, তখন তার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন হয়ে দাঁড়াল ছয় দফাকেন্দ্রিক এবং আমরা সবাই এটা প্রত্যক্ষ করেছি, কী করে অনেকটা স্বতঃসিদ্ধভাবেই তা স্বাধীনতার পথে বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে গেল।

১৯৭১ সালের ১১ বা ১২ মার্চ। সিএসপি অ্যাসোসিয়েশনের পূর্বাঞ্চল শাখার সভাপতি ছিলেন পাঞ্জাবের এসএম হাসান (আইসিএস-সিএসপি) মেম্বর, বোর্ড অব রেভিনিউ। জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। মাদ্রাজের করীম ইকবাল সিএসপি, যিনি একজন বাঙালি মহিলার পাণি গ্রহণ করেছিলেন। অ্যাসোসিয়েশনের আহূত জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে: সিভিল সার্ভিসের অফিসারদের দায়িত্ব হচ্ছে সরকার পরিচালনায় নিয়মতান্ত্রিক সহযোগিতা প্রদান কর্তব্য পালন। বর্তমানে দেশে একটি সর্বগ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন হয়েছে এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্লামেন্টে নির্বাচিত সংখ্যাগুরু রাজনৈতিক দলের নেতাই অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমানই সরকার গঠন করবেন। পরিবর্তনকালীন সময়ে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন অফিসারদের দায়িত্ব কর্তব্য। ব্যাপারে তারা সচেতন কর্তব্য পালনে সদা প্রস্তুত রয়েছেন। সিদ্ধান্তের কপি প্রেসিডেন্ট, মার্শাল কার্যালয়, গভর্নর এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার কাছে পাঠানো হলো। বঙ্গবন্ধুর কাছে এক কপি রুহুল কুদ্দুস সাহেব নিয়ে গেলেন। তিনি ছিলেন পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল। সঙ্গে আমিও ছিলাম। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দেখে খুবই প্রীত সন্তুষ্ট বোধ করেন। এটা ছিল নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা হিসেবে তার প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ। তিনি বললেন, আমি তো তোমাদের ওপর নির্ভর করব। তাকে বলা হলোস্যার, আপনার মৌখিক নির্দেশেই তো এখন সারা দেশ চলছে এবং সত্যিকারভাবেই তখন তা- ছিল। সব অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যাংক, সংস্থা, কলকারখানা, রেল-বাস, দোকানপাট সবই বন্ধ হতো, খুলত তারই নির্দেশে। প্রশাসনের সব স্তর এবং সমাজের সর্বাঙ্গের সঙ্গে একটি আশ্চর্য সুন্দর আস্থা, সম্মান আনুগত্যের সম্পর্ক তিনি গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তার ব্যতিক্রমী সর্বত্যাগী অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের জন্য। সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের দেশপ্রেম, নিরপেক্ষতা দক্ষতার প্রতি তার অবিচল সস্নেহ আস্থার পরিচয় বাংলাদেশে তার শাসনামলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে পাকিস্তান থেকে লন্ডন পিআইয়ের বিশেষ বিমানে এবং লন্ডন থেকে ব্রিটিশ সরকারের প্লেনে দিল্লি হয়ে ঢাকা এলেন। এর আগে জানুয়ারি করাচির এক বিরাট জনসভায় ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর মুক্তি সম্পর্কে সর্বসম্মত ইতিবাচক মতামত যাচাই করে তারিখ রাতেই বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানালেন। দুদিন লন্ডনে থেকে ১০ তারিখ দিল্লি এলেন বঙ্গবন্ধু। সেদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারি প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে দিল্লিতে উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক আগমন অভ্যর্থনা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। দিল্লিতে সেই স্বল্পকালীন বিরতির সময়ে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানবোধ দেশপ্রেমের প্রত্যক্ষদর্শীর নজির দিচ্ছি। ব্রিটিশ প্লেনে দিল্লি পৌঁছার পর তিনি খবর পেলেন তার সহসঙ্গীদের ব্যাগেজ ওই প্লেন থেকে নামিয়ে একটি ভারতীয় প্লেনে ওঠানো হচ্ছে এবং সে প্লেনেই তিনি ঢাকা যাবেন। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, তা কেন? ব্রিটিশরা তো আমাকে ঢাকাতেই যাওয়ার জন্য প্লেনের ব্যবস্থা করেছে। মাঝপথে তা পাল্টাব কেন? ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানালেন যে ঢাকার বিমানবন্দর ওই ব্রিটিশ প্লেনের অবতরণের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। বঙ্গবন্ধু তখন উপস্থিত বাংলাদেশের চিফ অব প্রটোকল ফারুক চৌধুরীকে বললেন, ওসব না জেনেশুনে কি তারা আমাকে পাঠাবে? খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা করো। দেখা গেল, ব্রিটিশ প্লেন অবশ্যই ঢাকা অবতরণ করতে পারবে। ব্যাগেজগুলো ব্রিটিশ প্লেনেই স্থানান্তরিত হলো। আয়োজন করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু দিল্লির পর কলকাতায় একটি জনসভায় ভাষণ দিয়ে ঢাকা যাবেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, তা নয়। আমি প্রথমেই ঢাকা যেতে চাই। কলকাতা শিগগিরই আসব, পরে! তিনি সোজা ঢাকায় চলে এসেছিলেন, তারই প্রতিষ্ঠিত নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রে অপেক্ষমাণ কোটি কোটি মানুষের কাছে। দিল্লিতে স্বল্পকালীন বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার জন্য দীর্ঘ সময় ছিল না। কিন্তু এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিলেন, তিনি আশা করছেন অদূর ভবিষ্যতেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করবে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সম্মতি জানিয়ে বললেন, যখনই বলা হবে, ভারতীয় বাহিনী তখনই ফেরত যাবে এবং সেটাই ঘটেছিল। ইন্দিরা গান্ধীর ১৭ মার্চ ঢাকা সফরের আগেই।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই তদানীন্তন ঢাকার একমাত্র পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। হোটেলের মালিকানা ছিল পাকিস্তান সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএসএল), তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিল্প বাণিজ্য বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে আমি ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সদস্য ছিলাম। স্বাধীনতার পর সব পাকিস্তানি শেয়ার বাংলাদেশ সরকারের হয়ে যায় এবং মালিকানায় বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল) প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি পদ কল্যাণে আমি নিযুক্ত হই চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ডিরেক্টরস, বিএসএল। আমরা স্থির করলাম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার আহ্বান করে কোন কোম্পানিকে ম্যানেজিং এজেন্সি দেয়া যায়, তা নির্ধারণ করা হবে। সরকারের অনুমতি নিয়ে (প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে) আমরা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন দিলাম। হিল্টন, শেরাটন, প্যান-প্যাসিফিক, ভারতের ওবেরয় গ্রুপ এবং আরো কয়েকটি খ্যাতনামা হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ) অংশ নিলেন। রায় বাহাদুর ওবেরয় স্বয়ং এলেন, বাজারে জোর গুজব ছিল, মৌখিকভাবে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, ইন্টারকন্টিনেন্টালের পরিচালনা ভার ওবেরয় গ্র্যান্ড হোটেল, কলকাতাকেই দেয়া হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরাসরি বললেন:

তোমরা সব দরপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে দেখে বাণিজ্যিকভাবে আমাদের স্বার্থে যা সর্বোত্কৃষ্ট, তাকেই বিবেচনা করো। মনে আছে, বোর্ডে তদানীন্তন অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব . মহীউদ্দীন খান আলমগীরের বিশেষ সহায়তায় সব টেন্ডারপত্র অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করে স্থির করলামচলমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল গ্রুপই আমাদের জন্য সর্বোত্কৃষ্ট হবে। তাদের দরপত্রই প্রথম গ্রহণযোগ্য। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে বিশেষ সরকারি নির্দেশে চেয়ারম্যান হিসেবে আমি প্রস্তাব তদানীন্তন শিল্পমন্ত্রী (শহীদ) সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী (শহীদ) তাজউদ্দীন আহমদ এবং বাণিজ্যমন্ত্রী এসআর সিদ্দিকীর কাছে উপস্থাপন করি। তাদের লিখিত সম্মতিসহকারে প্রস্তাবসংবলিত ফাইলটি আমি তদানীন্তন সচিব (বন্ধুবর) রফিকউল্লাহ চৌধুরীর সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রী সমীপে নিবেদন করি। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত গভীরভাবে মনোযোগসহকারে ফাইলটি নিরীক্ষণ করে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে বললেনঠিক আছে। ভালো কাজ করেছ। বঙ্গবন্ধুর মনোভাবে দেশের স্বার্থ সব সময়ই সর্বোচ্চ ছিল এবং তিনি ছিলেন সর্বপ্রভাবমুক্ত। তার ধরনের উৎসাহব্যঞ্জক কথা এবং অনুকরণীয় আচরণ আমাদের কাজে-কর্মে উদ্দীপনার উৎস ছিল।

প্রসঙ্গে আরো দুটি ঘটনা উল্লেখ করছি, যা মতিউল ইসলাম (স্বাধীন বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রথম অর্থ সচিব) (পৃ. ১০০, ১১৪, ১১৭) তার আত্মজীবনীমূলক বইটিতেও উল্লেখ করেছেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের কলকাতা যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। আলোচনাকালে ১৯৬৫ সালের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ভেস্টেড প্রপার্টিজ প্রত্যর্পণের জটিল প্রশ্নটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী উত্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুর তাত্ক্ষণিক উত্তর ছিল, ওই সময়কার আইন রুলস রেগুলেশন দিয়ে যা করা হয়েছিল তা বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের জন্য পুনর্বিবেচনা বাস্তবসম্মত নয়। গান্ধী নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করেননি। ওই সভা চলাকালেই তখনকার একজন অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিশেষ উপদেষ্টা ডিপি ধর বঙ্গবন্ধুকে বললেন যে ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের বিধ্বস্ত রেলওয়ের পুনর্বাসনের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তা দেখিয়ে তার অনুমোদন নেয়ার জন্য পার্শ্ববর্তী কক্ষে তারা অবস্থান করছেন। ডিপি ধর বঙ্গবন্ধুকে ওই কক্ষে যেতে আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু তখনই বললেন, আমার অর্থ সচিব মতিউল ইসলাম আমার পক্ষ থেকে ওই পরিকল্পনা পরীক্ষা করে আমাকে বলবেন। ডিপি ধর বঙ্গবন্ধুকে যেতে আবারো অনুরোধ জানালে বঙ্গবন্ধু বললেন, অর্থ সচিবই আমাকে রিপোর্ট করবেন। কী কারণে বঙ্গবন্ধু তখন যাননি তা পরিষ্কার নয়। তবে এটা ঠিক, বিষয়টি সম্পর্কে অবশ্যই পূর্বে জ্ঞাত করানোর প্রয়োজনীয়তা ছিল এবং পার্শ্ববর্তী কক্ষে যাওয়ার আমন্ত্রণ ডিপি ধরের কাছ থেকে না এসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই আসা সংগত রীতিসম্মত হতো। এত তাত্ক্ষণিক এবং যথাযথ ছিল বঙ্গবন্ধুর বিচারবুদ্ধি আত্মসম্মানবোধ।

এত ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু চিরকাল খেলাধুলায় তুমুল উৎসাহী ছিলেন এবং ক্রীড়াকর্মের যথাসাধ্য পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তারই উৎসাহ নির্দেশে ক্রীড়াঙ্গনে অংশগ্রহণভিত্তিক সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা-পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মনোনীত। বঙ্গবন্ধু পদ্ধতিতে পরিবর্তন সূচিত করেন, যাতে সত্যিকারের ক্রীড়ামোদীরা উৎসাহিত বোধ করেন। (শহীদ শেখ কামাল শহীদ শেখ জামাল যে গুণাবলি উত্তরাধিকার সূত্রেই যেন পেয়েছিলেন এবং তার যোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আচরণেও যার যথার্থ প্রতিফলন দেখি) আমার বাবা মরহুম গিয়াসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার হওয়া ছাড়াও তিনি দীর্ঘকাল ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের (ইপিএসএফ) প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট, টোকিও অলিম্পিকে (১৯৬৪) পাকিস্তানের চিফ অব মিশন ছিলেন। তার সম্পর্কে বিখ্যাত সাংবাদিক এবং ক্রীড়া প্রতিবেদক এবিএম মূসাএকজন নেপথ্য ক্রীড়াপ্রেমী, স্মৃতিপটে গিয়াস উদ্দিন’ (পৃ ১৩-১৪)- বলেন, ‘ষাটের উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গনের ঢেউ খেলার জগতেও বিস্তারিত হয়েছিল গিয়াসুদ্দিন চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াবিদদের স্বাধিকার, সমান মর্যাদা আদায়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলেই।এবং বাবা বহুবারই এটা বলেছেন, ‘ ব্যাপারে চিরকাল জোর সমর্থন অনুপ্রেরণা পেয়েছি রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন তরুণ নেতার কাছ থেকে এবং তিনি হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান! জনজীবন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সব দিকেই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রখর নজর। যখন তিনি পঞ্চাশ দশকের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় একজন তরুণ মন্ত্রী ছিলেন ১৯৫৬ সালে, তার উদ্যোগেই ব্রিটিশ অক্টোভিয়াস স্টিল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা থেকে সরকার ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই নিয়ে নেয় এবং শুরু হয় এর আধুনিকীকরণ। মধ্য পঞ্চাশে ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের নেপথ্য নায়ক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

অবিশ্বাস্য অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইস্ট পাকিস্তান স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন স্থাপন করেন এবং জোরালো প্রচেষ্টায় এসবের জন্য কেন্দ্র থেকে অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশের (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের) অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প যে একটি অপরিহার্য অঙ্গ এবং তার ভূমিকা হতে পারে অপরিসীম, বিশ্বাস চিরকালই বঙ্গবন্ধুর ছিল। পৃথিবীর এক ব্যস্ততম প্রধানমন্ত্রী হয়েও শত কাজের মধ্যে ২১ নভেম্বর ১৯৭২ সালে একজন তাঁতশিল্পী জনৈক প্রীতিরাণী দাসকে স্বহস্তে উৎসাহব্যঞ্জক লেখা চিঠি তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ (ফটোকপি সংযোজিত-) অর্থনীতিতে সমবায়ভিত্তিক সমাজতন্ত্রে তার গভীর আশা আস্থা ছিল। শিল্প-বাণিজ্যমন্ত্রী হয়েও শেখ মুজিবুর রহমান সমবায় আন্দোলনে যে উৎসাহ দেখান, তা অভূতপূর্ব। বঙ্গবন্ধু অবশ্য স্বেচ্ছায়ই তখন মন্ত্রিত্ব ছেড়ে পার্টির কাজে মনোনিবেশ করাকে শ্রেয় মনে করেন। এটাও ছিল উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। স্বল্পকালীন মন্ত্রিত্বকালেই সমবায় আন্দোলনকে একটি প্রধান সরকারি উদ্যোগে রূপান্তরিত করেন শেখ মুজিবুর রহমান। সময় সমবায় সমিতিগুলোর রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োজিত বাবার মুখে বহুবারই কথা শুনেছি।

আমি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের যুগ্ম শিল্প বাণিজ্য সচিব ছিলাম। ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই (ডিসেম্বর ১৯৭১) আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নিযুক্ত হই। যথেষ্টসংখ্যক কর্মকর্তার অভাবে আমাকে বেশ কিছুদিন অতিরিক্তভাবে শিল্প মন্ত্রণালয়েও কাজ করতে হয়, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। পশ্চিম পাকিস্তানি মালিকানার পরিত্যক্ত শিল্প বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোয় একটি ঘোষিত নীতি অনুযায়ী ওই সংস্থার সর্বোচ্চ পদাধিকারী বাঙালি কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিযুক্ত করার অর্পিত দায়িত্ব ছিল আমার। মার্চের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু শিল্প বাণিজ্য কেন্দ্র চট্টগ্রাম খুলনা যান। মন্ত্রণালয় থেকে আমি প্রেরিত হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত একাগ্রতার সঙ্গে সমস্যাগুলোর সমাধানের উদ্দেশ্যে অবহিত হতে চান। ২৯ মার্চ (১৯৭২) চট্টগ্রামে পোলো গ্রাউন্ডে এক সুবিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক মানোন্নয়নই তার সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। তবে তিনি সাবধান করে দেন যে সরকারের জাতীয়করণ কর্মসূচি যেন কেউ বানচালের অপচেষ্টা না করে। ৩১ মার্চের (১৯৭২) খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানের প্রদত্ত ভাষণে তিনি বিশেষ করে উত্তেজিত শ্রমিকদের সব ধরনের ধর্মঘট ঘেরাও পরিহার করার কঠোর নির্দেশ দেন। শৃঙ্খলা বজায় রেখে সব ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে হবেএই ছিল তার আহ্বান এবং তা তারা মন্ত্রস্বান্ত ভুজঙ্গের মতো শুনে সোৎসাহে সম্মতি জানায়। (মার্চ ৩০ ৩১, ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজারভার, দৈনিক বাংলা) ভাষণে তার পারসুয়েসিভ মোহময়ী শক্তি ছিল অসাধারণ।

সরকারের প্রথম দিনগুলোয় অনেক অভাবিত ব্যতিক্রমী সমস্যা ছিল। বঙ্গবন্ধুর ছিল তীব্র সমস্যা অনুধাবন যথাযথ তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার অনন্যসাধারণ ক্ষমতা। আমাদের ছিল বৈদেশিক মুদ্রার অধিক প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে তিনি নির্দেশ দিলেন। প্রথমেই পাট মন্ত্রণালয় নামীয় একটি নতুন মন্ত্রণালয় স্থাপিত হলো। বাণিজ্য সচিব এমএল রহমান (সিভিল সার্ভিসের) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুপরিচিত পাট বিষয়ে অভিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত একজন দক্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি হলেন পাট সচিব। ১৯৭১ সালে বিশেষ রফতানি না হওয়ায় আমাদের অনেক পাট পাটজাত দ্রব্য অবিক্রীতভাবে জমা হয়ে ছিল। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন, কলে জমে থাকা পাট পাটজাত দ্রব্য অবিলম্বে বিক্রির ব্যবস্থা নিতে। এমএল রহমানের পরামর্শে অন দ্য স্পট সেলের জন্য একটি টিম গঠন করা হলো। সে টিমে ছিলেন পাটজাত দ্রব্য সংস্থা এবং কাঁচা পাট রফতানি সংস্থার দুজন অভিজ্ঞ প্রতিনিধি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, নিজের খরচে বেসরকারি সেক্টরের দুজন প্রতিনিধি এবং পাট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে আমি দলনেতা। সচিব এমএল রহমানই মুখ্যত সর্বত্র যোগাযোগ করে বঙ্গবন্ধুর অনুমতিক্রমে গন্তব্যস্থল স্থির করেছিলেনবুয়েনস এইরেস (আর্জেন্টিনা তাদের গমের ম্যাকসের জন্য এক বিরাট খরিদ্দার ছিল), নিউইয়র্ক, লন্ডন, ব্রাসেলস হংকং। যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু সহাস্যে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে নির্দেশ দিলেন বার্টার নয়, যথাযথভাবে সব ক্যাশ পেমেন্টে বিক্রি করে দেশে ফিরবি, নইলে নয়। আল্লাহর মেহেরবানিতে আমরা তার আশা পূর্ণ করতে পেরেছিলাম। পারতপক্ষে সবকিছুতেই বঙ্গবন্ধু আশ্চর্য সুন্দরভাবে একটি পারসোনাল টাচ দিয়ে দিতেন, যা আত্মবিশ্বাস, আস্থা, আনুগত্য অনুপ্রেরণার সৃষ্টি করত।

দেশাভ্যন্তরে এত জরুরি চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি বহির্বাণিজ্য ছিল তারই অনুসৃত বাস্তবধর্মী নীতির প্রতিফলন।সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—কার্যক্ষেত্রেও এটা ছিল প্রদর্শিত। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল তো শুরুতে ছিল শূন্যের কোটায়। বঙ্গবন্ধু তখনবার্টার এগ্রিমেন্টকরে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমোদন দিলেন। স্বাধীনতার প্রথম দু-তিন বছর আমরা পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে বেশ কিছু পণ্য বিনিময় চুক্তি করি। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত (কলকাতা) এবং - মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়নে অত্যন্ত সফল রাষ্ট্রীয় সফর করেন। ওই দুই দেশের সঙ্গে আমাদের সাধারণ বাণিজ্য চুক্তিও হয়। সব চুক্তি সমঝোতায় বঙ্গবন্ধুর বিশেষ নির্দেশ ছিল, শুধু বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ নয়, বরং প্রাপ্তি সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার যেন নিশ্চয়তা বিধান হয়। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর পরই ভাবনা শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে তিনি যখন জাপানে সরকারি সফর করেন, তখন প্রস্তাবিত যমুনা সেতু নির্মাণে জাপানের সহযোগিতা বিশেষভাবে কামনা করেন। জাপান একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে সম্মত হয়, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে। পরবর্তীকালে ইআরডি সচিব হিসেবে যখন সেতুটার অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নির্মাণের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর করি, তত্পূর্ববর্তী আলোচনায় সমীক্ষা সহায়ক হয়।

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সূচনাতেই বঙ্গবন্ধু গঙ্গা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নদীর সুষম পানিবণ্টন ছিটমহল হস্তান্তরের প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান যে বাংলাদেশের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়, বঙ্গবন্ধু তা প্রথমেই অনুধাবন করেন।

ভারতের একজন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জেএন দীক্ষিত, যিনি শুরুতেই ঢাকায় তিন বছর ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন, তার প্রকাশিত বই লিবারেশন অ্যান্ড বিয়ন্ডে লিখেছেনশেখ মুজিব ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইতেন, তবে তিনি এও চাইতেন যে বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারিগরি সম্পর্ক গড়ে উঠুক, যাতে বাংলাদেশকে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হতে হয়। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বতন্ত্র সত্তা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ তার বিবেচনায় সর্বাগ্রে স্থান পেত।

১৯৭২ সালের মে মাসে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ তখনো জাতিসংঘের সদস্য হয়নি এবং চিলি তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানায়নি। তবে বাণিজ্য সম্প্রসারণ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিকরণের জন্য আঙ্কটাডের (এবং গ্যাট) সদস্য পদলাভের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। তা বিবেচনা করে অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু তদানীন্তন বাণিজ্যমন্ত্রী এমআর সিদ্দিকী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আমি এবং টিসিবির উপপ্রধান মোহসিন (পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্র সচিব) সমন্বয়ে একটি ডেলিগেশন চিলিতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। শেষ মুহূর্তেও চিলির স্বীকৃতি না আসায় বাণিজ্যমন্ত্রী আর চিলিতে গেলেন না। তাই আমার নেতৃত্বেই ছোট ডেলিগেশনটি সান্তিয়াগো গেল। বয়ে নিয়ে গেলাম চিলির প্রেসিডেন্ট আয়েন্দেকে লেখা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের চিঠি। প্রেসিডেন্ট আয়েন্দে অত্যন্ত সম্মানসহকারে বঙ্গবন্ধুর চিঠি পড়ে তার মহান নেতৃত্বের প্রশংসা করে বললেন, আমরা স্বীকৃতি জানানোর চেষ্টা করছি, সব প্রতিবন্ধকতা উতরে অদূর ভবিষ্যতেই তা করব বলে আশা করছি। সদস্য লাভের ব্যাপারে চীনকেঅ্যাপ্রোচকরার পরামর্শ তিনি দিলেন। সান্তিয়াগো, চিলি থেকে নিউইয়র্কে অবস্থানরত তদানীন্তন বাণিজ্যমন্ত্রী এমআর সিদ্দিকীর মাধ্যমে সদস্যপদ লাভ বিষয়ে উদ্ভূত সমস্যা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ কামনা করেছিলাম। তার বলিষ্ঠ নির্দেশ ছিল—‘দেশের স্বার্থ মঙ্গলের জন্য যা প্রয়োজন, তা- নির্ভয়ে করবে। আমাদের নীতি হচ্ছে সমতার ভিত্তিতে সবার সঙ্গে সখ্য সহযোগিতা। বৈরিতা নয়।বঙ্গবন্ধুর মৈত্রী মনোভাবাপন্ন নির্দেশের কথা জানাতেই বিরুদ্ধচারীরা সহযোগিতামূলক আচরণের আশ্বস্ততা দিয়েছিল।

পাকিস্তান ডেলিগেশনে আমার একজন সাবেক সিএসপি সহকর্মীর সহযোগিতায় চীনা ডেলিগেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছুটা নাটকীয়ভাবেই সবার সহযোগিতায় জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার আগেই প্রথম ইউএন সংস্থাআঙ্কটাড’-এর সদস্যপদ লাভ করলাম, যা আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যক্ষেত্র সম্প্রসারণের চেষ্টাকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেল (বিস্তারিত বিবরণ অ্যাডর্ন পাবলিকেশন প্রকাশিত আমার বইধায় গাড়ী ধূম ছাড়িচিলি তীর্থেদ্রষ্টব্য) বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা, একাগ্রতা আন্তর্জাতিক সম্মানের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছিল।

আঙ্কটাড ছিল প্রথম অন্তর্জাতিক সংস্থা, যার সদস্যপদ বাংলাদেশ লাভ করে। তারপর ডব্লিউএইচও (হু) এবং জিএটিটি (গ্যাট)

প্রসঙ্গে অনেক উদাহরণের মধ্যে আরো দু-একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। চীন যদিও তখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা যেতে পারে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৫ সালের মে মাসে এক ডেলিগেশনকে চীন প্রেরণ করেন। তার সব ধরনের ব্যবস্থা চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং তখন বার্মায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত কেএম কায়সারের উদ্যোগে সম্ভব হয়েছিল। সে প্রতিনিধিদলে ছিলেন তিনজন বেসরকারি সদস্য (পাট ব্যবসায়ী মরহুম লুত্ফুর রহমান এবং অবসরপ্রাপ্ত সিএসপি একেএম মুসাসহ আরেকজন) এবং একমাত্র সরকারি সদস্য রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর প্রধান, আমি। আমার ওপর বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশ ছিল চীনের বা চীনের কোনো সংস্থার (সবই সরকারি ছিল) সঙ্গে আমদানি-রফতানির চুক্তি করা এবং তা সম্পাদনের পূর্ণক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আমাকে দেয়া হয়েছিল। তখনো চীন বাংলাদেশকে সরকারি স্বীকৃতি দেয়নি। ওই অবস্থায় এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ সফর। কিন্তু দূরদর্শী বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ চিন্তাধারায় ভেবেছিলেন আমাদের বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক যোগাযোগ যথাসাধ্য বাড়াতে হবে। যথাযথ আলোচনার পর ওদের দুটো করপোরেশনের সঙ্গে একটি রফতানি এবং একটি আমদানির চুক্তি স্বাক্ষর করি। ফিরে এলে এতে বঙ্গবন্ধু সপ্রশংস সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। চুক্তিটির এবং -সম্পর্কিত আরো কিছু কথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী . একে আবদুল মোমেন মাসিক উত্তরণের ২০২০ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যায় একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন। প্রায় প্রতিটি বাণিজ্যিক চুক্তি বা ডেলিগেশনে যাওয়ার প্রাক্কালে যথাসম্ভব বঙ্গবন্ধু প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন, যা আমাদের যথাযথভাবে পরিচালিত করত।

নিজের দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে একক সিদ্ধান্তেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের স্বীকৃতির পর লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে এবং ওআইসিতে যোগদান করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিরাট সম্প্রসারণ সম্ভবপর করে তোলেন। পরে ইআরডির সচিব এবং এর পরবর্তী সময়ে জেদ্দায় আইডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আমি দেখেছি আইডিবির অর্থনৈতিক সহযোগিতা আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা সমস্যায় মিয়ানমারের আগ্রাসী আচরণ এবং গণহত্যার প্রতিবাদে ওআইসি সদস্য ক্ষুদ্ররাষ্ট্র গাম্বিয়াই আসে পুরোভাগে।

সদিচ্ছা থাকার জন্যই সম্ভব হয়েছিল ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সৌদি আরবে প্রথম বিদেশ সফরের সময় তাকে সর্বদলীয় নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা। তখন (সম্ভবত এখনো) সৌদি সরকার কোনো সফররত বিদেশী রাজনীতিবিদ, সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে গণসংবর্ধনা জানানোর অনুমোদন দিত না। কিন্তু শেখ হাসিনার ব্যাপারে এর সম্মানজনক ব্যতিক্রম ঘটেছিল। আইডিবির নির্বাহী বোর্ডের এবং সৌদি সরকারের অনুমোদনক্রমে আমি (তখন আইডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট) ওই সভার আহ্বায়ক এবং সভাপতি হই। কষ্টসাধ্য ওই সভার আয়োজন অনুষ্ঠান করতে পেরে আমি কৃতার্থ বোধ করি। মনে পড়ে, সর্বদলীয় ব্যতিক্রমী ওই বিরাট সভায় প্রয়াত বঙ্গবন্ধু এবং সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক শ্রদ্ধা সম্মান জানানো হয়। অনুসঙ্গীদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারা ছাড়াও ব্যবসায়ী শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে সালমান এফ রহমান, কাজী জাফরুল্লাহ প্রমুখ অনেকেই ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সুচিন্তিত বক্তব্য পরবর্তী সময়ে সৌদি-বাংলা সম্পর্ক দৃঢ়তর করতে বিশেষ সহায়ক হয়।

প্রশাসনের এবং অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুর তীক্ষ নজর ছিল। আগস্ট ১১, ১৯৭৫। আমি তখন রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর প্রধান। সংস্থাপন বিভাগ থেকে হঠাৎ ফোনে খবর পেলাম লন্ডনে ইকোনমিক মিনিস্টার হিসেবে আমার পদায়ন হয়েছে, মহামান্য প্রেসিডেন্টের নির্দেশে। সংস্থাপন সচিব ছিলেন মাহবুবুর রহমান। তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি ফাইল দেখালেন। লন্ডনে ইকোনমিক মিনিস্টার পদায়নের প্রস্তাবের বিপরীতে প্রেসিডেন্ট স্বহস্তে লিখেছেন ( মর্মে) ‘ পদে একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তার নিযুক্তি আবশ্যক। ইনাম আহমদ চৌধুরীকে নিযুক্ত করা হইল মনে পড়ে, কৃতজ্ঞতা জানাতে এবং নির্দেশ নিতে তার সঙ্গে দেখা করি সচিব আবদুর রহিমের আয়োজনে ১৩ আগস্ট। ওই সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধু বিশেষভাবে রফতানি বৃদ্ধি করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন এবং লন্ডনে অবস্থানরত শহীদ-জায়া বোন নাসিম হাইয়ের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেন। পরের দিনই ইতিহাসের নৃশংসতম বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে আত্মবলিদান দিলেন জাতির জনক। তার সঙ্গে শহীদ হলেন ঢাকায় তার পরিবারের সব সদস্যও। রচিত হলো বাংলার ইতিহাসের কলঙ্কতম অধ্যায়। বাংলার কারবালা।

নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। নিঃসন্দেহে তিনি বাঙালি জাতির সার্বভৌম বাংলাদেশের স্রষ্টা, জাতির জনক। কিন্তু এটা শুধু তার একটি পরিচয়। বৃহত্তর পৃথিবীর গণ্ডিতে তার আরেকটি অত্যুজ্জ্বল পরিচয় রয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের বন্ধু, সংগ্রামী মানুষের বন্ধু, শান্তিকামী মানুষের বন্ধু। বহুবার তিনি বলেছেন, শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পরাক্রমশালীর আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে তার আজীবনের সংগ্রাম। যেখানে মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছে, যেখানে মানুষ আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদ, বঞ্চনা, অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে, সেখানেই আমরা দেখি নিঃস্বার্থ প্রতিবাদী লড়াকু শেখ মুজিবুর রহমানকে। জীবনের প্রারম্ভে, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনকালেই তিনি জীবনে প্রথম কারারুদ্ধ হন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে (পৃ. ১২) আমরা দেখি কী করে হিন্দু মহাসভার স্থানীয় সভাপতি সুরেন ব্যানার্জি, রমাপদ দত্ত এবং ওদের সহযোগী কতিপয় হিন্দু সরকারি কর্মচারী ষড়যন্ত্র করে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা প্রচেষ্টার বানোয়াট অভিযোগ এনে তাকে জেলবন্দি করেন। পরে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মামলার নিষ্পত্তি হয়। আত্মজীবনীতে আছে, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিমাতাসুলভ আচরণ ছাড়াও (পৃ. ২৩) ‘হিন্দু মহাজন জমিদারদের অত্যাচারেও মুসলমানেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।কিন্তু এসব সত্ত্বেও প্রতিবাদী তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন সর্বতোভাবে অসাম্প্রদায়িক। বস্ততপক্ষে সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা, দ্বেষ, অবিচার, অন্যায়, শোষণ, মানবাধিকার হরণ এসবের বিরুদ্ধেই তো ছিল তার আপসহীন আজীবন সংগ্রাম। আমৃত্যু। কোনো প্রলোভন, অত্যাচার বা ভীতি প্রদর্শন তাকে কখনো লক্ষ্যচ্যুত করতে বা তার আদর্শের স্খলন ঘটাতে পারেনি। আমাদের সৌভাগ্য যে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ কিছু অনিশ্চিত কালের পর তারই যোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা তারই নির্দেশিত পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।

বিশ্বনেতৃত্ব গ্রহণে বঙ্গবন্ধুর যে অপার সম্ভাবনা ছিল, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সুপরস্ফুিট ছিল। আমি বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের - সেপ্টেম্বর আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিতন্যামশীর্ষ সম্মেলনের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করতে চাই। ওই মাসে ইরাক মিসরে একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সফর নির্ধারিত ছিল। আমার নেতৃত্বে গঠিত দলের সদস্য ছিলেন রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর একজন পরিচালক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব। আলজেরীয় সরকারের অনুমতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব করা হলো যে টিমযদি দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে আলজিয়ার্স যায়, তাহলে সেখানে অনুষ্ঠেয় একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (আলজেরীয় সরকারের আয়োজিত) অংশগ্রহণ ছাড়াও সম্ভব হলে অন্যান্য ডেলিগেশনের সঙ্গে যোগাযোগের পরিচিতির চেষ্টা করতে পারে। বাণিজ্য সম্প্রসারণে সদা উদগ্রীব প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব অনুমোদন করলে কায়রোর পরে পরেই আমরা আলজিয়ার্স যাই। যদিওন্যামসম্মেলনের সঙ্গে আমাদের তেমন সম্পর্ক ছিল না। তবুও উপস্থিতির কল্যাণে আমরা ওই সম্মেলনের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করি এবং পরোক্ষভাবে অবগত থাকি। বাস্তবিকই বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সেখানে ছিল অবিস্মরণীয়। সম্মেলনে ভাষণে তিনি উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ বর্ণবাদবিরোধী বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সমর্থনে জোরালো বক্তব্য দেন। তিনি বিশ্ব শান্তি স্থাপন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক সহযোগিতার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। ফিলিস্তিনের সমস্যা সমাধানে ইসরায়েলি আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে এবং সেখানে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সমর্থনে তার বলিষ্ঠ আহ্বান ভূমিকা যথেষ্ট উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। বহু রাষ্ট্রপ্রধান সরকারপ্রধানের সঙ্গে, কখনো তাদেরই আগ্রহে, বঙ্গবন্ধু দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎ মতবিনিময় করেন। এক কথায় বলতে পারি, তার অতুলনীয় নেতৃত্বসুলভ আচরণ সেই ভূমিকার স্বীকৃতি আমাদের সবার মধ্যে প্রবল গর্ববোধের সৃষ্টি করে।

আগেই বলেছি, তৃতীয় বিশ্ব আঙ্কটাড সম্মেলনে যেখানে বাংলাদেশের সদস্যপদ গৃহীত হলো, সেখানে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রেরিত হয়ে বাংলাদেশ ভেলিগেশনের নেতা হিসেবে আমার যোগদানের সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল রমেশ চন্দ্র এবং চিলির শান্তি পরিষদের সেক্রেটারি মারিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। রমেশ চন্দ্রের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বও ছিল। রমেশ চন্দ্রকে দেয়ার জন্য আজাদ একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। মারিয়া মালুয়েন্দা থাকেন কবি পাবলো নেরুদার ক্রিস্টোফারবাল পাহাড়ের একটি বাড়িতে, সম্ভবত ভাড়াটে হিসেবে। প্রথম হোটেলে জায়গা না পেয়ে দুদিন আমি সে বাড়িতে থাকি। ওই মহলে বঙ্গবন্ধু একজন আদৃত মহাসম্মানিত এবং প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। পাবলো নেরুদা আবার প্রেসিডেন্ট আয়েন্দের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। বিভিন্ন আলোচনায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত অনুভূতি প্রকাশ পেত। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক, সমাজতান্ত্রিক, মানবপ্রেমী শান্তিবাদ এবং লক্ষ্য অর্জনে অবিচল সংগ্রাম তাদের আকৃষ্ট করেছিল। একটি সামাজিক আমন্ত্রণের জবাবে পাবলো নেরুদা বলেন, অবশ্যই আমিমুজিবের বাংলাদেশদেখতে যাব। মারিয়া মালুয়েন্দা যোগ দিয়ে বলেন, ‘আমার জন্য সেটা তো হবে এক তীর্থযাত্রাপিলগ্রিমেজ।ফিরে এসে আমি লিখেছিলামচিলি তীর্থে মারিয়া মালুয়েন্দাকে শুধিয়েছিলাম, আসছ কবে বাংলাতীর্থে। দুই বছরের আগেই চিলির