মঙ্গলবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

খেলা

মাশরাফির ‘বিদায়’, ২০২৩ বিশ্বকাপ ও কিছু প্রশ্ন

হাসনাত শোয়েব

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাশরাফি বিন মর্তুজার অভিষেকের বেশ আগে থেকেই একটা রব শোনা যাচ্ছিল। ওই তো হাওয়ায় চুল উড়িয়ে আসছেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’! সে সময় এক্সপ্রেস গতির কোন বোলারের দেখা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য ছিল স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্ন পূরণ হল মাশরাফিকে দিয়ে, রচিত হল আরো অনেক ভবিষ্যত স্বপ্নের ভীত। কিন্তু তখনই মুখ লুকিয়ে হাসছিল ‘ইনজুরি’ নামের এক অপয়া দৈত্য। কে জানতো মাশরাফির ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে এই দৈত্যটি। কিন্তু ‘দোষ’ কি কেবল মাশরাফির একার ছিল! সোনার ডিম পাড়া হাঁস মাশরাফিকে ব্যবহারের ন্যূনতম কোন কৌশল ছিল না তৎকালীন টিম ম্যানেজমেন্টের। ফলত ইনজুরিপ্রবণ মাশরাফির খোঁড়া পা বারবার গর্তে পড়েছে। যা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে তার পরিসংখ্যানকেও এবং নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটকেও।

যাই হোক, এটা কোন বিদায়ী ট্রিবিউট নয়, কারণ মাশরাফি এখনো ক্রিকেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় বলেননি। টেস্ট ও টি-২০ তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও, ওয়ানডেতে না খেলার সিদ্ধান্ত এখনো জানাননি তিনি। যদিও বোর্ডের পক্ষ থেকে মাশরাফির বিদায়ী এপিটাফ ইতোমধ্যে লিখে ফেলা হয়েছে। এখন হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিদায় বলার অপেক্ষা। যে অপেক্ষা হয়তো তার আগমনী গানকেই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। দুটোতেই যে ‘অপেক্ষা’ জড়িয়ে!

মাশরাফির বিদায় নিয়ে জলঘোলা করার প্রক্রিয়া শুরু মূলত ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ থেকে। গোটা টুর্নামেন্টজুড়ে ম্লান মাশরাফি ৮ ম্যাচে নিয়েছিলেন মাত্র ১ উইকেট। চিরয়াত মাশরাফি ভক্তদেরও চুপ করিয়ে দিয়েছিল এমন পারফরম্যান্স। অনেকে ভেবেছিল লর্ডসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই হয়তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্পাইক খুলে রাখবেন তিনি। কিন্তু বিদায় নেননি মাশরাফি। অনেকে ভেবেছিল হয়তো দেশের মাটিতে খেলে বিদায় নিতে চান তিনি। সে সময় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচ আয়োজন করে মাশরাফিকে বিদায় দেয়ার কথাও ভাবা হয়েছিল, কিন্তু বিদায় না নেয়ার সিদ্ধান্তেই অটল থেকে যান ম্যাশ। তবে বোর্ডকে অনুরোধ করে নিজেকে সরিয়ে নেন কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে। বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে ভাবছেন না, খেলে যেতে চান ঘরোয়া ক্রিকেট। এরপর গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সিরিজ জেতার পর ছেড়ে দেন নেতৃত্ব। তার ইচ্ছে ছিল সাধারণ সদস্য হিসেবে খেলা চালিয়ে যাওয়ার। কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপে মাঝপথে যোগ দিয়ে দারুণ পারফরম্যান্স দেখান মাশরাফি। সে সঙ্গে জাতীয় দলে জায়গা ধরে রাখার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল করে তোলেন। কিন্তু ততক্ষণে হয়তো ম্যাশকে পেছনে ফেলে সামনে দেখতে শুরু করেছে বোর্ড। বিশেষত লক্ষ্য যখন ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ মাশরাফি সেখানে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকই বটে। প্রাথমিক দলেও তাই জায়গা হলো না তার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আরো কিছু সময় মাশরাফিকে দলের সঙ্গে রাখা যেতো কিনা? তার বিদায়ের মঞ্চকে আরেকটু রঙ্গিন করা যেতো কিনা?

৩৭ বছরের মশরাফি এখনো দেশের অন্যতম সেরা বোলার। সিম পজিশন এবং লাইন লেংথে অন্য অনেকের চেয়ে বেশ নিঁখুত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার মতো ফিটনেস আছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু মাশরাফিকে দলের সঙ্গে রাখলে হয়তো তরুণ ও উদীয়মান পেসাররাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিতে পারতো তার কাছ থেকে, তার অভিজ্ঞতা থেকে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, যেখানে মাশরাফির নেতৃত্ব গুণাবলী বারবার প্রশংসিত হয়েছে। নতুনদের পথ চেনাতে মাশরাফির চেয়ে যোগ্য নেতাইবা কজন আছে!

তবে শুরু থেকেই মাশরাফির বিদায় নিয়ে বোর্ডের অবস্থান ছিল দোদল্যমান, এসেছে তীর্যক মন্তব্যও। অথচ উচিত ছিল বিশ্বকাপের পর মাশরাফিকে নিয়ে বসে একটি যৌক্তিক পথ তৈরি করার। তাকে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহারের পথ বের করার। কিন্তু সেসব কিছুই হয়নি। এক পর্যায়ে হার্ডলাইনে গিয়ে বাদ দেয়ার পথে হাঁটতে হলো বোর্ডকে। যদিও শেষ না বলা পর্যন্ত শেষ বলে কিছু  নেই, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য যা আরো বেশি সত্য। কিন্তু তারপরও বলা যায়, অবিশ্বাস্য কিছু না ঘটলে হয়তো এখানেই মাশরাফির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু শেষটা কি আরো সুন্দর হতে পারত না, পারে না?

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন