বৃহস্পতিবার | ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম পাতা

পোশাককর্মীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণে এইউডব্লিউ

বণিক বার্তা ডেস্ক

মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের ভরণপোষণের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন (২৩) যোগ দিয়েছিলেন পোশাক কারখানায়। ভেবেছিলেন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বা সুযোগ সেখানেই শেষ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাবিনা ইয়াসমিনের জীবনের ঘটনা খুবই সাধারণ চেনা একটি গল্পের পুনরাবৃত্তি। অসচ্ছল দরিদ্র পরিবারের নারীদের এমন গল্প হরহামেশাই শুনতে পাওয়া যায়। এসব নারীর শ্রমেই বৈশ্বিক পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান হাব হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। এইচঅ্যান্ডএম বা ওয়ালমার্টের মতো বৈশ্বিক নামিদামি পোশাক ব্র্যান্ডের পণ্যগুলোও তৈরি হচ্ছে তাদের হাত দিয়েই। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানও বলছে, দেশের পোশাক শিল্পে কর্মরত কর্মীদের ৮০ শতাংশই নারী।

ঘটনাটি সাধারণ হলেও সাবিনা ইয়াসমিনের জন্য চাকরিতে ঢোকার সিদ্ধান্তটি সহজ কোনো বিষয় ছিল না। কারণ চাকরিতে ঢোকা মানেই পড়াশোনার ইতি। কিন্তু পরিবারের প্রয়োজনে এর বাইরে তার আর কোনো উপায়ও ছিল না। সাবিনা ইয়াসমিনের নিজের ভাষায়, বিষয়টি আমার জন্য অনেক কঠিন ছিল।

তবে সাবিনা ইয়াসমিনের গল্পটির এখানেই শেষ নয়। ২০১৭ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) পাথওয়েজ ফর প্রমিজ প্রোগ্রামের আওতায় আবারো পড়াশোনায় ফিরে আসার সুযোগ পান তিনি। পোশাক শিল্পের কর্মীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীভুক্ত নারীদের জন্য গৃহীত প্রোগ্রামের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রতি শেষ হয়েছে।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর প্রোগ্রামটির উদ্যোগ নেয়া হয়। পাথওয়ে ফর প্রমিজ প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য হলো পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীভুক্ত মেধাবী নারীদের চিহ্নিত করে তাদের শিক্ষিত করে তোলার ব্যবস্থা করা। কোর্সে ভর্তির আগে প্রয়োজন হলে শিক্ষার্থীদের এক বছর প্রস্তুতিমূলক শিক্ষারও ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে প্রোগ্রামের আওতায়।

ধরনের প্রোগ্রামের ব্যয় নির্বাহে তহবিল সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যভুক্ত কেমব্রিজে এইউডব্লিউর একটি দপ্তরও রয়েছে। এইউডব্লিউর কার্যক্রমের আওতায় মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার ১৮টি দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। 

কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে প্রথম প্রজন্মের কলেজ শিক্ষার্থীদের (যাদের পরিবারের আগের প্রজন্মগুলোর কেউ কখনো কলেজ শিক্ষার সুযোগ পায়নি) বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা কামাল আহমেদের ভাষ্য হলোনিজ নিজ সমাজের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করা এবং অন্যদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে ওঠার মাধ্যমে তারা যে ভূমিকা রাখতে পারেন, তা অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী। এক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো কোনো কিছু করার মধ্য দিয়ে তারা পরিবারের গতিপথটুকুও বদলে দেয়ার রাস্তা তৈরি করে নিতে পারেন।

নারীদের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার পেছনে বড় একটি বাধা হলো খরচ। পাথওয়ে ফর প্রমিজ প্রোগ্রামে অংশ নেয়া নারীদের শিক্ষাগ্রহণকালে মাসিক বৃত্তি দেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো চাকরি না করার আর্থিক ক্ষতিটুকু পুষিয়ে দেয়া।

প্রসঙ্গে কামাল আহমেদ বলেন, এখানে আসতে ইচ্ছুক কোনো তরুণীর পরিবার যদি তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, সেক্ষেত্রে আয়ের ব্যাঘাত ঘটলে তাকে তারা আসতে দেবে না।

পাথওয়ে ফর প্রমিজের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে। এখন পর্যন্ত কার্যক্রমের আওতায় ভর্তি হয়েছে ৪৭০ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রথম ২৫ শিক্ষার্থী গত মে মাসে স্নাতক সম্পন্ন করেছে। এছাড়া এইউডব্লিউর প্রাক-স্নাতক কার্যক্রম অ্যাকসেস একাডেমি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছে ৪৩০ জন।

এইউডব্লিউতে শিক্ষার্থীদের নাচ, সংগীত পারফরমিং আর্টসের অন্যান্য শাখা নিয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন মাসুদ রহমান। তিনি জানালেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বেশ লাভজনক হতে পারে। 

তিনি বলেন, তারা অনেক বেশি মাত্রায় সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী। প্রতিবেশই তাদের অনেকটা অন্তর্মুখী করে তোলে। পারফরমিং আর্টস তাদের অন্তর্মুখিতা কাটিয়ে নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের দ্বিধা বা ভয় ছাড়াই তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার নতুন ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন।

মাসুদ রহমান জানান, তার এক শিক্ষার্থী আছেন, যিনি তালেবানদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সে শিক্ষার্থী অপরিচিতদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে ভয় পেতেন। কোর্সে অংশ নেয়ার পর ওই শিক্ষার্থী এখন দর্শকদের সামনে বেশ স্বচ্ছন্দেই দাঁড়াতে পারছেন এবং অপরিচিত লোকদের সঙ্গেও কথা বলতে পারছেন।

তিনি বলেন, এমন অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই পারফরমিং আর্টস তাদের জীবনের অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডিং কম্প্রিহেনশন অ্যান্ড রাইটিং বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন হান্নাহ কিম। তিনিও জানালেন, এখানকার অনেক শিক্ষার্থীকেই অনেক সংগ্রাম করে নিজের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশী অনেক শিক্ষার্থী আমাকে জানিয়েছেন, শুধু অর্থের অভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসাটা তাদের জন্য কতটা কঠিন ছিল। এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, এমন কোনো সম্পদও তাদের নেই। সুতরাং এইউডব্লিউর উদ্দেশ্য লক্ষ্য হলো নাজুক জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে আসা নারীদের তাদের অবশ্য প্রয়োজনীয় শিক্ষায় প্রবেশাধিকার তৈরি করে দেয়া।

বর্তমান মহামারী পরিস্থিতিতে এইউডব্লিউর জন্য কাজ অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। মহামারীর কারণে মার্চে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সুবিধা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এইউডব্লিউ। ফলে অন্তত চলতি মাস পর্যন্ত অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি। অনেক বিদেশী শিক্ষার্থী এরই মধ্যে তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরেও গিয়েছে।

কিন্তু এর মধ্যেও অনেকের বাড়ি ফেরার সুযোগ নেই বলে জানালেন কামাল আহমেদ। কারণ তাদের অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। আবার কেউ কেউ এখন নিজ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিকে নিরাপদও মনে করছেন না।

তিনি বলেন, এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বর্তমানে ক্যাম্পাসে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫০- নামিয়ে আনতে হয়েছে আমাদের। বিষয়টি আমাদের জন্য বেশ হূদয়বিদারক।

এনবিসি নিউজ থেকে ভাষান্তরিত ঈষৎ সংক্ষেপিত

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন