শনিবার | জানুয়ারি ১৬, ২০২১ | ২ মাঘ ১৪২৭

ফিচার

ইউরোপের দামি ক্রিসমাস ট্রির নেপথ্যে সস্তা শিশুশ্রম আর জীবনঝুঁকি

বণিক বার্তা অনলাইন

আজ ২৫ ডিসেম্বর।  খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। বিশেষ করে ইউরোপের পরিবারগুলো এই উত্সব মৌসুমে আলো ঝলমলে, বুনো গন্ধের ক্রিসমাস ট্রি দিয়ে বাড়ি সাজায়। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে বা ভাবার প্রয়োজন মনে করে যে এই গাছগুলো কোথা থেকে আসে। 

জর্জিয়ার অন্যতম দরিদ্র অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ পর্বতের গায়ে জন্মানো ক্রিসমাস ট্রির বীজ সংগ্রহ করতে জীবনের ঝুঁকি নেয়।  মারাত্মক ঝুঁকির এই কাজে জড়িত আছে শিশুরাও।  এখানেই পাওয়া যায় নর্ডম্যান ফার নামে ক্রিসমাস ট্রি।  ঘ্রাণ, ঘনসবুজ সুঁচাল পাতা আর সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌণিক আকৃতির কারণে ইউরোপের সর্বাধিক জনপ্রিয় ক্রিসমাস ট্রির এই প্রজাতিটি। 

ক্রিসমাস ট্রির পরিপক্ব ফল সংগ্রহের জন্য উত্তর জর্জিয়ার আমব্রোলৌরি বনে ৫০ মিটার (১৬৫ ফুট) উচ্চতা পর্যন্ত উঠতে হয়।  এখান থেকেই সংগৃহীত সর্বাধিক পরিমান নর্ডম্যান ফারের বীজ। 

স্থানীয় গ্রামের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মেরিনা গোসিরিজ বলেন, আমি জানি যে শিশুরা ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠে ফল সংগ্রহ করে।  প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে বীজ সংগ্রহের সময় বাবা-মায়েরা আমার কাছে আসেন এবং অনুরোধ করেন যেন তাদের বাচ্চাদের এই সময়টাতে একটু ছুটি দেয়া হয় যাতে তারা ক্রিসমাস ট্রির ফল সংগ্রহের তাদের বাবাকে সহায়তা করতে পারে। 

তিনি বলেন, এই শিশুরা গাছে ওঠার সময় একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। কারণ যতো উপরে ওঠা যাবে ততো বেশি ফল সংগ্রহ করা যাবে।  জর্জিয়ার রাছা-লেখখুমী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ককেশাস পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত ছোট্ট ত্লুগি গ্রাম থেকে টেলিফোনে রয়টার্সকে এসব কথা বলেন মেরিনা।

সেপ্টেম্বরে ফল সংগ্রহের মৌসুমটি ত্লুগি এবং আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের উপার্জনের এক বিরাট সুযোগ।  প্রতিবছর এই সময়টাতে কয়েকশ শ্রমিক এখানে কাজ করতে আসেন। 

ফল থেকে বীজ বের করার পর তা ক্রিসমাস ট্রির চাষী এবং নার্সারিগুলোতে রফতানি করা হয়। যেখানে এক একটি ক্রিসমার্স ট্রির পরিপক্বতা পেতে ১১ বছর সময় লাগে। 

চারা উৎপাদনকারীরা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করেন অথবা ছোট ব্যবসায়ী থেকে বড় শপ চেইনগুলোর কাছে  সরবরাহ করে।  ব্রিটেনে একটি নর্ডম্যান ফার ৪০ পাউন্ড থেকে ১০০ পাউন্ডেরও বেশি (৫৫ ডলার থেকে ১৩৫ ডলার) দামে বিক্রি হয়।

জর্জিয়ার এই আমব্রোলৌরি বন সরকার কয়েকটি প্লটে বিভক্ত করে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে লাইসেন্স দেয়। তারা আবার  ফল সংগ্রহের সময় ঠিকাদার নিয়োগ করে।  এই ঠিকাদাররাই স্থানীয়দের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করে।

তবে বাস্তবে দারিদ্র্যপীড়িত স্থানীয় লোকেরা প্রায়শই লাইসেন্সের ধার ধারে না।  তারা পুরো বনাঞ্চলে ফল সংগ্রহ করে।  প্রতি কেজি ফল বিক্রি করে মাত্র ১ লারি (৪০ সেন্ট) দরে। এসব কিনে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। 

সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরের মধ্যবর্তী রেখাটি ভোক্তা পর্যন্ত যেতে যেতে ঝাপসা হয়ে যায়।  কারণ মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কেনাবেচার কারণে ফলের আসল উত্সটি অস্পষ্ট হয়ে যায়।  

তাছাড়া এখানে বৃক্ষ আরোহীরা প্রায়শই দড়ি এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই বিশাল বিশাল গাছে উঠে ফল সংগ্রহ করে।  কারণ এসব সুরক্ষা ব্যবস্থা নিলে দ্রুত গাছে উঠতে তাদের সমস্যা হয়।  এর চেয়ে বরং খালি হাতে লাফিয়ে লাফিয়ে গাছে শাখাপ্রশাখা ধরে তড়তড় করে উঠে যেতে পারেন তারা।

যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় নার্সারি স্নোবার্ড ক্রিসমাস ট্রি-এর মালিক অ্যাড্রিয়ান মরগান বলেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত জর্জিয়ান অংশীদারের কাছ থেকে বীজ নিতে গিয়ে কৌতূহলবশত তিনি বীজ সংগ্রহ দেখতে বনে গিয়েছিলেন।  গিয়ে দেখেন লোকেরা বানরের মতো গাছে উঠছে!

তবে জর্জিয়ার জাতীয় বন বিভাগের কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে ফোন এবং ই-মেইলে কোনো মাধ্যমেই মন্তব্যের জন্য অনুরোধের জবাব দেননি।

ঐতিহাসিক আমব্রোলৌরির শহরের সাবেক মেয়র রাতি নামগালাদজে বলেন, সরকারকে অবশ্যই এখানে বিনিয়োগকারীদের কর্মপরিবেশ আরো নিরাপদ করতে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে হবে।  কারণে লোকেরা তো জীবিকা অর্জন করতে গিয়ে জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। 

নামগালাজির ভাই ১৯৯৪ সালে লাফিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে চড়তে গিয়ে পড়ে গিয়ে মারা যান। তিনি রেখে গেছেন  স্ত্রী এবং দুই বছরের এক কন্যা শিশু।

লাইসেন্স হোল্ডিং সংস্থাগুলো তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে সুরক্ষার মান উন্নত করেছে, তবে তিনি বলেন, স্থানীয়রা এখনও কোনো নিয়মকানুন ছাড়া ফল সংগ্রহ করছে।  সেই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের খুব কম মজুরি দিচ্ছে। 

১৯৯০-এর দশকে জর্জিয়ার সোভিয়েত-পরবর্তী অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পর ক্রিসমাস ফল সংগ্রহ করতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ছিল খুবই সাধারণ।  ২০১২ সালে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।  জার্মানি এবং ডেনমার্কে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার ক্রিসমাস ট্রি সরবরাহ করে ফেয়ার ট্রিস নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের হিসাব অনুসারে মৃত্যুর সংখ্যাটি এমন।

২০০৯ সালে ডেনিশ ক্যাম্পেইনার ও ক্রিসমাসের চারা উৎপাদক মেরিয়ান বোস প্রতিষ্ঠিত ফেয়ার ট্রিস আম্ব্রোলৌরিতে তাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রতি কিলো ফলের জন্য প্রায় ৫ লারি (২ ডলার) দেয়।  এটি স্থানীয় দামের চার থেকে পাঁচগুণ বেশি।

রয়টার্সকে তিনি বলেন, কেউ কল্পনাও করতে পারবে না এখানে দরিদ্র মানুষেরা কীভাবে কতো করুণ পরিস্থিতির মধ্যে বাঁচে। গ্রামগুলোতে কোনো পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই।  টয়লেট বলতে মাটিতে গর্ত। 

ফেয়ার ট্রিস তাদের বিক্রিত প্রতিটি গাছের বিপরীতে সামান্য সারচার্জ রাখে। এই টাকায় শিক্ষার্থী এবং শিশুদের জন্য একটি বিনামূল্যে ডেন্টাল ক্লিনিক করেছে তারা। 

বোলস বলেন, অন্যান্য ইউরোপীয় ক্রেতারা এখনও তাদের পথ অনুসরণ করতে পারেনি।  শিশুদের গাছে ওঠার ঐতিহ্য এখনো অব্যাহত।

গ্রামের সেই প্রধান শিক্ষক অবশ্য বলেন, এই শিশুরা খুব গর্বিত যে, তারা ইউরোপের বাচ্চাদের জন্য বড়দিনের আয়োজন করে দিচ্ছে।!

সূত্র: রয়টার্স

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন