মঙ্গলবার | জানুয়ারি ১৯, ২০২১ | ৬ মাঘ ১৪২৭

প্রথম পাতা

সুশাসনের ঘাটতি ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে জীবন বীমা খাত

সম্পদ ও তহবিলের দক্ষ ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে কি?

মেহেদী হাসান রাহাত

বৈশ্বিক আঞ্চলিক পরিসংখ্যান বিবেচনায় বাংলাদেশের বীমা খাত অনেক ছোট। তবে জনগোষ্ঠীর যেটুকু অংশ বীমার আওতায় এসেছে তাতে ২০১৯ সাল শেষে দেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর সম্পদের পরিমাণ ৪১ হাজার কোটি এবং লাইফ ফান্ডের আকার ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু বীমা খাতে সার্বিক সুশাসনের ঘাটতি পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের যে প্রভাব তাতে এই সম্পদ তহবিলের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।

বীমা আইন-২০১০ এবং মূলধন শেয়ার ধারণ বিধিমালা-২০১৬ অনুসারে কোনো বীমা কোম্পানির পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যরা একক কিংবা যৌথভাবে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবেন না। অথচ আইন বিধিমালা লঙ্ঘন করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করছেন একই পরিবারের সদস্যরা। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তা মনজুরুর রহমান তার পরিবারের সদস্যদের দখলে রয়েছে কোম্পানিটির ১৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ শেয়ার। এর মধ্যে মনজুরুর রহমান, তার স্ত্রী সুরাইয়া রহমান, ছেলে জিয়াদ রহমান মেয়ে সাইকা রহমান ডেল্টা লাইফের পর্ষদে পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। তার আরেক মেয়ে আদিবা রহমান কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছিলেন। যদিও সম্প্রতি সিইও হিসেবে তার নবায়নের আবেদন নামঞ্জুর করেছে আইডিআরএ।

শুধু ডেল্টা লাইফ নয়, রকম আরো চার-পাঁচটি কোম্পানি রয়েছে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে। পারিবারিক আধিপাত্যের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো এক বা একাধিক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে পরিচালিত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বেনামে কোম্পানির শেয়ার ধারণ করে পারিবারিক আধিপত্য বজায় রাখছে।

পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের বীমা খাতে সার্বিক সুশাসনের ঘাটতির বিষয়টিও বহুল আলোচিত। লাইফ ফান্ডের অর্থ বেশি দেখানোর জন্য জীবন বীমা খাতের কোম্পানিগুলো সময়মতো বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ করে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করাটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে বীমা খাতে। আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসনের বিষয়ে প্রশ্ন থাকলেও সেগুলোতে বর্তমানে যে ধরনের করপোরেট কাঠামো রয়েছে, তার ধারেকাছেও নেই বীমা খাত। এখানে দক্ষ যোগ্য জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে।

জানতে চাইলে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে সেক্ষেত্রে সমস্যা নেই। পারিবারিক আধিপত্য রয়েছে এমন বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স কিন্তু ভালো। মূল বিষয় হচ্ছে একটি দক্ষ যোগ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে বছর শেষে ব্যবসায়িক আর্থিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। একই সঙ্গে গ্রাহকদের পাওনা যাতে ঠিকমতো পরিশোধ করা হয়, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।

সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরে ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয় করেছে কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় করেছে ১৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কোম্পানিটি আয়ের তুলনায় কোটি ৬৮ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছে। ডায়মন্ড লাইফ ছাড়াও খাতের আরো অনেক কোম্পানিই নির্ধারিত সীমার তুলনায় বেশি ব্যয় করছে। করপোরেট সুশাসনের বিষয়টিও জীবন বীমা খাতে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বীমা আইন অনুসারে ছয় মাসের বেশি পূর্ণকালীন প্রধান নির্বাহীর (সিইও) পদ শূন্য রাখার নিয়ম নেই। অথচ জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানেরই পূর্ণকালীন সিইও নেই। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স অন্যতম।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, পুনর্বীমা, দাবি নিষ্পত্তিসহ কিছু বিষয়ে বড় দুর্নীতির অভিযোগ আছে। অনেক মালিকই মিথ্যা দাবি সাজিয়ে আগের তারিখে কাভার নোট ইস্যু এবং অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে বীমা গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করছেন। খাতে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য, পরিচালকদের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণহীনতার অনেক উদাহরণ রয়েছে। বীমা শিল্পে জনশক্তির মান খুবই দুর্বল এবং তাদের উন্নয়নে তেমন বিনিয়োগ কিংবা সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী জীবন বীমা সাধারণ বীমা কোম্পানির পরিচালনায় ব্যাপক অনিয়ম পাওয়া গেছে। অথচ দেশের বীমা খাতের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিক-রেমিট্যান্স প্রেরণকারী থেকে কৃষিজীবীসহ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনো বীমার আওতার বাইরে রয়ে গেছে।

দেশে বর্তমানে ৭৮টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি জীবন বীমা কোম্পানি আর ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানি রয়েছে। জীবন বীমা খাতের ৩২টি কোম্পানির গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা, যা সর্বশেষ ২০১৯ সালে এসে ৪১ হাজার ৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সময়ে কোম্পানিগুলোর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। ২০১০ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের আকার ছিল ১৪ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সাল শেষে ৩৪ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের আকার দশমিক ৩৩ গুণ বেড়েছে।

২০১০ সালে জীবন বীমা খাতে গ্রস প্রিমিয়াদের পরিমাণ ছিল হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে হাজার ৬০৮ কোটি টাকায়। ১০ বছরের ব্যবধানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ বেড়েছে দশমিক ৬৫ গুণ। আর সর্বশেষ বছরের ৩০ জুন শেষে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত সম্পদ ৪১ হাজার ৪৮৭ কোটি এবং লাইফ ফান্ডের আকার ৩৪ হাজার ১৪১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান শেখ কবীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর সম্পদ, লাইফ ফান্ড গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ বাড়লেও কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে গড়িমসি করে। এতে খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। আমরা বরাবরই অ্যাসোসিয়েশেনের পক্ষ থেকে বলছি, কোম্পানিগুলো বীমা দাবির অর্থ যাতে সময়মতো পরিশোধ করে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও কঠোর হতে হবে।

বীমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানায় অনেক প্রভাবশালী রয়েছেন। সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কতটুকু কঠোর হওয়া সম্ভব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই সম্ভব। এক্ষেত্রে আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সাহায্য করব। প্রভাবশালী যেই হোক না কেন আইন অমান্য করলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য খাতে দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে।

চলতি বছরের জুন শেষে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর মোট পলিসির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৫ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৪। সময়ে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। ২০১৯ সাল শেষে মোট বীমা দাবির পরিমাণ ছিল হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর ৮৮ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আর বছরের জুন শেষে বীমা দাবির পরিমাণ ছিল হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, যার ৪৮ দশমিক ৪২ শতাংশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সময়ে শতভাগ বীমা দাবি নিষ্পত্তি করেছে স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। আর ৯০ শতাংশের বেশি বীমা দাবি নিষ্পত্তি করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এলআইসি, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স। আর ১০ শতাংশেরও কম বীমা দাবি পরিশোধ করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে এরআরবি গ্লোবাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স। সময়ে ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোনো বীমা দাবিই পরিশোধ করেনি।

২০১৯ সালে দেশের বীমা খাত নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্স (পিডব্লিউসি) প্রতিবেদনে দেশের বীমা খাতের অবস্থা, সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৯-১৭ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছরই জিডিপির তুলনায় বীমা প্রিমিয়ামের পরিমাণ কমেছে। জিডিপির অনুপাতে প্রিমিয়ামের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত, শ্রীলংকা পাকিস্তানেরও নিচে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাতে প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল দশমিক ৫৫ শতাংশ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন