মঙ্গলবার | জানুয়ারি ১৯, ২০২১ | ৬ মাঘ ১৪২৭

প্রথম পাতা

মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীই সবচেয়ে বড় করপোরেশন

বণিক বার্তা ডেস্ক

মিয়ানমারের বৃহত্তম কনগ্লোমারেট মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিং লিমিটেড (এমইএইচএল) খনিজ সম্পদ আহরণ, পানীয়, তামাক, পোশাক, ব্যাংকিং, হোটেল, শিপিং, পরিবহনসহ নানা খাতে ছড়িয়ে আছে কনগ্লোমারেটটির ব্যবসা। এককভাবে নিজস্ব ব্যবসার বাইরে বিদেশী অন্যান্য স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অন্যান্য খাতেও ব্যবসা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

১৯৯০ সালে মিয়ানমারে সামরিক জান্তা ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে গড়ে তোলা হয় প্রতিষ্ঠানটি। কনগ্লোমারেটটির ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত রয়েছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর (তাতমাদো) বর্তমান সাবেক কর্মকর্তারা। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হলেও প্রতিষ্ঠানের মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়ে সবসময়ই গোপনীয়তা বজায় রেখেছে এমইএইচএল। তবে মিয়ানমারের ডিরেক্টরেট অব ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিআইসিএ) চলতি বছর প্রকাশিত নথি বলছে, এমইএইচএলের ব্যক্তি পর্যায়ের শেয়ারহোল্ডারের লাখ ৮১ হাজার ৬৩৬, যারা দেশটির সামরিক বাহিনীর বর্তমান সাবেক সদস্য। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের শেয়ারহোল্ডারের সংখ্যা হাজার ৮০৩, যার মধ্যে তাতমাদোর বিভিন্ন আঞ্চলিক কমান্ড, ডিভিশন, ব্যাটালিয়নভিত্তিক বা যুদ্ধাভিজ্ঞদের সমিতিও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে এমইএইচএলের শেয়ার মালিকানা রয়েছে মোট শেয়ারের এক-তৃতীয়াংশ।

জাস্টিস ফর মিয়ানমার নামে এক অ্যাক্টিভিস্ট সংগঠনের আরেকটি নথির তথ্য বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ২১ বছরে শেয়ারহোল্ডারদের মোট ১০ হাজার ৭৮৭ কোটি কিয়াত (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬৯৬ কোটি টাকা) ডিভিডেন্ড হিসেবে পরিশোধ করেছে এমইএইচএল। এর মধ্যে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে স্থানান্তর হয়েছে হাজার ৫০০ কোটি কিয়াত (৬১২ কোটি টাকার বেশি) এসব সামরিক ইউনিট বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে ব্যয় করেছে, তার হিসাব পাওয়ারও কোনো উপায় নেই।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানাচ্ছে, এসব নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংস্থাটি তাতমাদোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে বর্মী সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে -সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য করা হয়নি। 

দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মিয়ানমার ইকোনমিক করপোরেশন (এমইসি) নামে আরেকটি কনগ্লোমারেট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানেরও খাদ্য পানীয়, আবাসন, পর্যটন, টয়লেট্রিজ, বন্দর, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে।

এমইসি এমইএইচএলের মতো প্রতিষ্ঠান আলাদা সত্তা হিসেবে ব্যবসা চালিয়ে গেলেও এর মূল নিয়ন্ত্রক দেশটির সামরিক বাহিনী। তাতমাদোর নিয়ন্ত্রণাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপ্তি কার্যক্রম বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায়, দেশটির সামরিক বাহিনীকে যদি মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় করপোরেশন অভিধা দেয়া হয়, তাহলে ভুল হবে না মোটেও।

মূলত এমইএইচএল এমইসির মাধ্যমেই অধিকাংশ ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ চালায় বর্মি সেনাবাহিনী। গত বছরও এমইএইচএল মিয়ানমার সরকারকে কর পরিশোধ করেছে প্রায় কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ। দেশটির পঞ্চম বৃহত্তম করপোরেট করদাতা প্রতিষ্ঠান মিয়াওয়াদ্দি ব্যাংকও এমইএইচএলেরই সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এমইসির সাবসিডিয়ারি ড্রাগন বেভারেজেস দেশটির শীর্ষ পাঁচ করপোরেট কর পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম।

দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী কমান্ডারদেরই এমইএইচএলের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল (সামরিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত) লেফটেন্যান্ট জেনারেল অং লিন দুয়ে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব দ্য ডিফেন্স সার্ভিসেস (সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত অডিট তত্ত্বাবধানকারী) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আয়ে উইনের কথা।

জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের এক নথির তথ্য অনুযায়ী, এমইএইচএলের পরিচালনা বোর্ডের কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের জন্য আরেকটি পৃষ্ঠপোষক গ্রুপ রয়েছে, যাদের কার্যক্রম সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাতমাদো প্রধান (বর্তমানে সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং) পদাধিকারবলে প্যাট্রন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তাতমাদোর উপপ্রধান, যিনি একই সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীরও প্রধান থাকেন (বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন ভাইস সিনিয়র জেনারেল সোয়ে উইন) এছাড়া মিয়ানমারের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ, নৌপ্রধান, বিমানবাহিনী প্রধান কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেলকে প্যাট্রন বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিয়োজিত করা হয়।

২০০৩-১৬ সাল পর্যন্ত এমইএইচএল, এমইসিসহ বর্মি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি সরকার গঠনের পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়।

১৯৯০ সালে এমইএইচএল গঠনের সময় এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, সামরিক বাহিনীর চাকরিতে থাকা অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং তাদের নিয়ে গঠিত সংগঠনগুলোর সার্বিক কল্যাণ সাধনের জন্যই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই খুব দ্রুত বাড়তে থাকে এমইএইচএলের ব্যবসা।

ওই সময় রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা পায় প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন বিদেশী চুক্তিতে অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের কর অব্যাহতি এবং দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান খাতে একচেটিয়া কারবার গড়ে তোলার সুযোগ পায় এমইএইচএল।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এমইএইচএলের সাবসিডিয়ারির সংখ্যা ৫০টিরও বেশি। এসব সাবসিডিয়ারির মাধ্যমে কৃষিপণ্য, মেরিন প্রডাক্ট, মূল্যবান পাথর, গয়না রত্ন ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। এছাড়া স্থানীয় বাজারের জন্য আমদানি করা হয় ভোগ্যপণ্য, শিল্প কাঁচামাল, নির্মাণ শিল্পে ব্যবহার্য যন্ত্রাদি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে বড় গৃহস্থালি অ্যাপ্লায়েন্স সামগ্রীর বাজার চেইন স্টোর নিয়ন্ত্রণ করছে এমইএইচএল। পাশাপাশি ব্যাংক, বীমা, হোটেল পর্যটন, শিপিং বন্দর টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পরিবহন লজিস্টিকস, নির্মাণ, রাবার, পোশাক, কেমিক্যাল, নৌকা নির্মাণ এবং খাদ্য পানীয় শিল্পেও ব্যবসা করছে এমইএইচএলের সাবসিডিয়ারিগুলো। এর বাইরেও প্রতিষ্ঠানটি খনি থেকে কয়লা, তামা জেডসহ মূল্যবান রত্নপাথর উত্তোলনের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত প্রতিষ্ঠানটি।

অনেকগুলো ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেই এমইএইচএলকে স্থানীয় বিদেশী অংশীদারদের ওপর নির্ভর করতে হয়। অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ব্যবসায় অর্থায়ন অন্য প্রতিষ্ঠানের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পায় এমইএইচএল। প্রায়ই দেখা যায়, জয়েন্ট ভেঞ্চার বা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে মূল কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা না রেখেই মুনাফা বা ডিভিডেন্ড তুলে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

এমইসির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সাবসিডিয়ারি বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সংখ্যা ৩০-এর বেশি। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তেমনি সেবা খাতেরও প্রতিষ্ঠান রয়েছে বেশ কয়েকটি। এমইসির সাবসিডিয়ারির মধ্যে যেমন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের মতো ব্যবসা রয়েছে, তেমনি ডিসপোজেবল সিরিঞ্জের মতো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট উৎপাদনের কারখানাও রয়েছে। এছাড়া মোবাইলে পেমেন্টের মতো ক্রমবিকাশমান সেবা খাতেও নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে। এছাড়া দেশটিতে উদীয়মান সম্পদশালী এলিটদের জন্য গলফ রিসোর্টের মতো বিশেষায়িত সেবা খাতেও ব্যবসা রয়েছে এমইসির।  টেলিযোগাযোগ খাতে আন্তর্জাতিক একটি কনসোর্টিয়ামেরও অংশ এমইসি। কনসোর্টিয়ামের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন ভিয়েতটেলও রয়েছে। এমইসি নিজস্ব ব্যবসায়িক তথ্যের ক্ষেত্রে বরাবরই বেশ কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার আকার বিকাশের গতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন