শনিবার | জানুয়ারি ২৩, ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

টকিজ

আলী যাকেরের প্রস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ নভেম্বর, ২০২০। ভোরের স্নিগ্ধ আলোকরশ্মি তখনো বিস্তর হয়নি। পাখিদের কলতান তখনো মুখর হয়নি। আড়মোড়া ভাঙার আগেই যেন ম্রিয়, মৌন এক সকাল জানান দেয় সংস্কৃতি অঙ্গনের এক নক্ষত্রের পতনের কথা। এই নক্ষত্রের নাম আলী যাকের। একাধারে অভিনয়শিল্পী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। গতকাল ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে জীবনযুদ্ধের মঞ্চ ছেড়ে পরপারে চলে যান একুশে পদকপ্রাপ্ত এ অভিনেতা। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। চার বছর ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে আসা এ অভিনয়শিল্পীর শরীরে দুদিন আগে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। বার্ধক্য ও হূদরোগের সমস্যাসহ বেশকিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় সেখানে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। অবশেষে করোনাভাইরাসের কাছেই হার মানতে হলো নূরলদীনখ্যাত নন্দিত এ অভিনেতাকে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকেরের মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমেছে শোকের ছায়া। বরেণ্য অভিনেতার প্রয়াণে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, দেশের শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলী যাকেরের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। গতকাল আলী যাকেরকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তার মরদেহ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নেয়া হয়। সেখানে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয় তাকে। এরপর বিকালে বনানী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয় তার। 

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে আলী যাকেরের কফিন নিয়ে যাওয়া হয় বনানীতে তার কর্মস্থল এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটি ডিগ্রির কার্যালয়ে। সেখানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম। জাদুঘর প্রাঙ্গণে আলী যাকেরের কফিন জাতীয় পতাকায় মুড়ে দেন জাদুঘরের ট্রাস্টিরা। অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, তারিক আনাম খানসহ আরো অনেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে, যারা ছিলেন আলী যাকেরের সহযোদ্ধা, সহকর্মী।

এশিয়াটিক থেকে আলী যাকেরের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। বিকাল পৌনে ৫টায় জানাজা শেষে সেখানেই তাকে দাফন করা হয় বলে এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রয়াত এ অভিনেতার মরদেহ গতকাল বেলা ১১টার পর শেরেবাংলা নগরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ট্রাস্টি।

আলী যাকের ১৯৪৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রতনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়। তার বাবা মোহাম্মদ তাহের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় বাবার চাকরির বদলির সুবাদে খুলনা, কুষ্টিয়া ও মাদারীপুরে কাটান।

১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের কথা। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ মঞ্চনাটকে প্রথম অভিনয় করেন আলী যাকের। এটিই ছিল নাট্যসংগঠন আরণ্যকের প্রথম মঞ্চনাটক। এর মধ্য দিয়েই আলী যাকেরের অভিনয়জগতে পথচলা শুরু। তবে ওই বছরই আরণ্যক থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। যোগ দেন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে। মঞ্চসারথি আতাউর রহমানের নিদের্শনায় প্রথম ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে অভিনয় করেন। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে আলী যাকেরের নির্দেশিত প্রথম নাটক ছিল বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’। এরপর নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ই হয়ে ওঠে তার ঠিকানা। এখানে থেকেই অসংখ্য দর্শকপ্রিয় ও কালজয়ী মঞ্চনাটক ও চরিত্র উপহার দেন দর্শকদের। মঞ্চের আলো-আঁধারি পর্দায় কখনো প্রতিবাদী নূরলদীন, কখনো গ্যালিলিও, কখনোবা দেওয়ান গাজী হয়ে ধরা দিয়েছেন। জনপ্রিয় এ তিন চরিত্রের জন্য মঞ্চপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আলী যাকের। কেবল অভিনয়ই নয়, নিদের্শক হিসেবেও তার মুন্সিয়ানা প্রশংসনীয়। তার নির্দেশিত ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘অচলায়তন’, ‘দর্পণ’, ‘খাট্টা তামাসার কথা’ নাটকগুলো উল্লেখযোগ্য। এগুলো ছাড়া আরো অনেক দর্শকপ্রিয় মঞ্চনাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। 

আশির দশকের সাড়া জাগানো মঞ্চনাটক ‘গ্যালিলিও’ ২০১৮ সালে আবার মঞ্চে ফিরে আসে নাগরিক নাট্যদলের মাধ্যমে। ক্যান্সারে আক্রান্ত অভিনেতা আলী যাকের সেই নাটকের মাধ্যমে আবার মঞ্চে ফিরেছিলেন নাম ভূমিকায়। তাই মঞ্চে ‘গ্যালিলিও’ হয়ে থাকল এ অভিনেতার শেষ নাটক। 

বাংলাদেশের দর্শক দর্শনীর বিনিময়ে নাটক দেখবে, এ ধারণা আগে ছিল না। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবের একটা অংশ ছিল নাটক। দর্শনীর বিনিময়ে নাটকের চিন্তাটা কিন্তু প্রথম আসে আলী যাকেরের মাথায়। বাকি ইতিহাস নাটকটি ব্রিটিশ কাউন্সিলে তিন সন্ধ্যার জন্য বুকিং দেয়া হয়। যাকের বললেন, পরের সপ্তাহেও বুকিং দিই।

বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকেরের অভিনয়শৈলী কেবল মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মঞ্চের পাশাপাশি টিভি নাটকেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। ১৯৮০ ও ’৯০-এর দশকে আলী যাকের অভিনীত বেশকিছু নাটক দর্শকদের মনে স্থান করে নিয়েছিল। ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, কালজয়ী নাটকগুলো তার উদাহরণ। তিনি বেতারে ৫০টিরও বেশি নাটকে অভিনয় করেন। অভিনয় করেন বেশকিছু চলচ্চিত্রেও। ‘নদীর নাম মধুমতি’ ও ‘লালসালু’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় আজও দর্শক হূদয়ে গেঁথে রয়েছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা নাট্যচর্চায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন আলী যাকের। এক কথায় বলতে গেলে তিনি ছিলেন বাংলা নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে রেনেসাঁস। দর্শনীর বিনিময়ে নাটক প্রদর্শনী শুরুর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন আলী যাকের। টেলিভিশনের জন্য লিখেছেন মৌলিক নাটক। দৈনিক পত্রিকায়ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখতেন। তার প্রকাশিত বই ‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। আলোকচিত্রের প্রতিও তার আগ্রহ কম ছিল না। শখের বশে ফটোগ্রাফিও করেছেন। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির পূর্ণ সদস্য তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে করাচিতে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন আলী যাকের। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি এশিয়াটিকের দায়িত্ব নেন। মৃত্যুর সময় তিনি কোম্পানির গ্রুপ চেয়ারম্যান ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আলী যাকের প্রথমে ভারতে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাংবাদিক আলমগীর কবির তাকে উদ্বুদ্ধ করেন প্রচারযুদ্ধে অংশ নিতে। আলী যাকের যুক্ত হন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। ১৯৯৫ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ভাবনায় অন্যতম কারিগর ছিলেন আলী যাকের। তার সেই ভূমিকার কথা শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে স্মরণ করেন জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি মফিদুল হক। নাটকে অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

আলী যাকের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। আলী যাকের তার কালজয়ী সব চরিত্র ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবেন সংস্কৃতিপ্রেমীদের মনে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন