শনিবার | জানুয়ারি ২৩, ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট

দ্রুত শূন্য পদ পূরণ এবং চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিতে তদারকি বাড়াতে হবে

নানা সমস্যায় দেশের উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জেরবার। তার মধ্যে চিকিৎসক সংকট অন্যতম। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, একে তো সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় প্রায় ৬০ শতাংশ পদ খালি রয়েছে, তদুপরি বিদ্যমান চিকিৎসকদের একটি অংশও নিয়মিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। কেউ মাতৃত্বকালীন, কেউবা উচ্চশিক্ষাজনিত ছুটি প্রভৃতি কারণে কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করছেন। যথার্থ কারণে ছুটি গ্রহণ চিকিৎসকদের পেশাগত অধিকার। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেকে অজুহাতকে কারণ হিসেবে ব্যবহারপূর্বক সুনির্দিষ্ট কর্মস্থলে গরহাজির থাকছেন। সব মিলিয়ে তীব্রতর হওয়া চিকিৎসক সংকটে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ উপজেলা পর্যায়ে জরুরি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে শহরমুখী হচ্ছে। নিয়ম হলো, কোনো রোগী প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক সেবা নিয়ে জেলা হাসপাতালে যাবে, সেখান থেকে রেফার্ড হয়ে বিভাগীয় হাসপাতালে এবং সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বিএসএমইউর মতো রাজধানীর বড় বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে বিশেষ সেবার জন্য আসবে। অথচ উপজেলা কমপ্লেক্সগুলোর সংকটজনিত অকার্যকারিতায় এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পেতেও মানুষ শহরের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় ভিড় জমাচ্ছে। এতে দেশে স্তরভিত্তিক চিকিৎসা অবকাঠামো বিনির্মাণের উদ্দেশ্য, রেফারেল ব্যবস্থার কার্যকারিতা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি দুই-ই বাড়ছে সাধারণ রোগীদের। কাজেই গ্রামীণ এলাকার মানুষের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে উপজেলা হাসপাতালের শূন্য পদগুলো জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করতে হবে এবং কর্মস্থলে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিতে নজরদারি বাড়াতে হবে। খোদ প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তাতে দৃশ্যমান উন্নতি নেই। বিভিন্ন উপজেলায় প্রায়ই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক উপস্থিত না থাকার খবর গণমাধ্যমে নিয়মিত বিরতিতে মিলছে, এটি গ্রাম বা মফস্বল এলাকায় থাকতে তাদের গভীরতর অনীহার ইঙ্গিত দেয়। দেশব্যাপী বিস্তৃত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় পদানুযায়ী কতজন চিকিৎসক আছেন, কতজন ছুটিতে আছেন, কতজন ডেপুটেশনে আছেন এবং কতজন অনুপস্থিত থাকছেন, তার হালনাগাদ তথ্য যাচাইয়ে একটি অনুপুঙ্খ বিভাগীয় তদন্ত হওয়া জরুরি। এটি অভ্যাসগতভাবে অনুপস্থিত থাকা চিকিৎসকদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেয়ায় সহায়ক হবে বৈকি। বিষয়টি আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা আশা করি। 

এও ঠিক, প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক থাকলে কিংবা তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেই যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করার জন্য ছয়টি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন—প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, তথ্য-উপাত্ত, সেবাদানের সঠিক নির্দেশিকা এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা। এর যেকোনো একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। কোনো একটি উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে যে পরিমাণ ওষুধ ও যন্ত্রপাতি দরকার, তা না থাকলে সেখানে চিকিৎসক উপস্থিত থাকলেও কোনো লাভ হবে না। চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি এবং সেবিকার মতো জনবলেরও প্রকৃত ঘাটতি রয়ে গেছে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয়। এগুলোও সমাধান করতে হবে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও জরুরি। নইলে সুন্দর স্বাস্থ্য কাঠামো থাকলেও কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা মিলবে না। 

সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ, পেশাগত উত্কর্ষ, উচ্চতর শিক্ষা প্রভৃতি কারণে মূলত চিকিৎসকরা গ্রামে থাকতে চান না। এসব সুবিধা কীভাবে গ্রাম পর্যায়ে বাড়ানো যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত ২৫-৩০ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে ভাবনা কম। এ সময়ে একজন চিকিৎসককে চাকরি দিয়ে গ্রাম বা মফস্বল এলাকায় পদায়ন করলে তার পক্ষে সেবা দেয়া সহজতর হয়। এর সঙ্গে গ্রামে থাকাকালীন পেশাগত উন্নতির ব্যবস্থা করা গেলে ব্যাপারটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। কিছু দেশে গ্রামে কাজ করার সময়টিকে স্নাতকোত্তরের জন্য প্রশিক্ষণকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চতর স্কেল বা পদে উন্নতির ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশেও সেটি অনুসরণ করা যেতে পারে। চিকিৎসাক্ষেত্রে উচ্চতর পড়াশোনার বিকেন্দ্রীকরণও প্রয়োজন, সম্ভব হলে দূরশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। এসব সুবিধা চিকিৎসকদের গ্রাম তথা কর্মস্থলমুখী করতে পারে বৈকি। কর্মস্থলে রাখার জন্য চিকিৎসকদের আরো কীভাবে প্রণোদিত করা যায়, সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। 

উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত শর্ত না হলেও অবশ্যই অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। আলোচ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আজকের নাজুক অবস্থার জন্য তারা অনেকাংশে দায়ী। এ দায় তারা এড়াতে পারেন না। চিকিৎসা পেশা আর দশটি সেবার মতো নয়। সেবা প্রদানের মহান ব্রত নিয়েই এ পেশায় কাজ করতে হয়। চিকিৎসাবিদ্যার শুরুতে চিকিৎসকরা মানবসেবায় নিজেদের নিবেদনের শপথ নেন। কাজেই গ্রাম হোক, শহর হোক, সব পর্যায়ে তারা স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিষয়টি মনে রেখে নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে তাদের নিজ কর্মস্থলে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন এবং চিকিৎসা প্রদান জরুরি। সর্বোপরি, জেনেবুঝে তারা সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। বদলি ও পদায়ন হলে এমনকি প্রত্যন্ত এলাকার সরকারি হাসপাতালগুলোয় যেতে হবে, এটিই নিয়ম। সুতরাং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই এ অজুহাতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ নেই। কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিতে নিজ নিজ এলাকায় নিয়োগের সুযোগ রেখে নিয়োগ আইনের সংশোধনের পরামর্শ দিচ্ছেন কেউ কেউ। এটি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন