বুধবার | জানুয়ারি ২০, ২০২১ | ৭ মাঘ ১৪২৭

খেলা

ম্যারাদোনা: শরীর আর অর্থ দুটোই কেড়ে নেয় মাদক

ক্রীড়া ডেস্ক

ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাদোনার মৃত্যুতে কাঁদছে বিশ্ব। আর্জেন্টিনায় চলছে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক। প্রেসিডেন্ট প্যালেসে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো দামি কফিনে শুয়ে আছেন বিশ্ব ইতিহাসের সেরা ফুটবলার বিবেচিত ম্যারাদোনা। তিনি ফুটবলের জন্য যা করেছেন তাতে আর্জেন্টিনা তো বটেই, গোটা ফুটবল দুনিয়ারই যেন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা নেই। জাদুকরি পারফরম্যান্সে তিনি এমন সব কীর্তি গড়েছেন, যা এই খেলোয়াড়টিকে এনে দিয়েছে অমরত্ব। 

যদিও সুস্থ্য জীবনযাপন করলে আরো দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারতেন তিনি, এমনটা মনে করেন অনেকেই। বিশেষ করে, জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি মাদকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন, তাতে একদিকে তিলে তিলে ক্ষয় হয়েছে তার দেহতরি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্যারিয়ার, সেসঙ্গে হারিয়েছেন অর্জিত অর্থও। তাইতো এত বড় তারকা হওয়ার পরও মৃত্যুর সময় তিনি রেখে যেতে পেরেছেন মাত্র ১ লাখ ডলার!

ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ঈশ্বর প্রদত্ত মেধাবী ফুটবলার মাঠের বাইরে লাগামহীন জীবন নিয়েও কম আলোচনায় ছিলেন না। দুটি পা আর মাথার শৈল্পিক প্রদর্শণীতে ফুটবল মাঠে যা করেছেন তা তাকে অমরত্ব এনে দিয়েছে, পাশাপাশি তার নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসও সুদীর্ঘ। তিনি মাদক, যৌনকর্ম ও মাফিয়া কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন। 

১৯৮২ সালের শুরু থেকেই কোকেন নিতেন ম্যারাদোনা। ১৯৮৪ সালে বার্সেলোনা থেকে ন্যাপোলিতে নাম লেখানোর পরই মাদকের অন্ধকার জীবনে পুরোপুরি ডুবে যান। আর্জেন্টাইন বিস্ময় জড়িয়েছেন মাদক ও যৌনকর্মীতে। এর মধ্য দিয়েই তিনি মাফিয়াদের ফাঁদেও পড়ে যান। কামোরা ভিত্তিক মাফিয়া ও সন্ত্রাসীদের কুখ্যাত সংগঠন জিউলিয়ানো ক্লান যাকে ধরতো তার কোনো মুক্তি ছিল না। ম্যারাদোনাও তাদের খপ্পড়ে পড়ে যান।  

২০১৪ সালে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে ম্যারাদোনা নিজেই বলেছেন, আমার অসুস্থতার কারণে প্রতিপক্ষকে আমি বড় সুযোগ করে দিয়েছি। ড্রাগ না নিলে আমি যে খেলোয়াড় হতে পারতাম, তাকে আপনারা কি চিনতে পারতেন? আমার বয়স ৫৩ হলেও মনে হয় ৭৮, কারণ আমার জীবনটা স্বাভাবিক ছিল না। আমি যার মধ্য দিয়ে গেছি তাতে আমার জীবনটা ৮০ বছরেরই মনে হয়।

বেশ কয়েকটি মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ম্যারাদোনারই পক্ষে গেছে। তিনি বলেন, ন্যাপোলিতে মাদক ছিল সর্বত্র। তারা কার্যত ট্রেতে করেই এগুলো আমার কাছে নিয়ে আসতো। 

মাদকের সঙ্গে আসক্তির মধ্যেই তিনি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সফলতাও পেয়ে যান! ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোয় তার নেতৃত্বেই বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। পরের বছরই ম্যারাদোনার হাত ধরে ন্যাপোলি তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইতালিয়ান সিরি-এ লিগ শিরোপা জিতে নেয়। ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে আসে তাদের দ্বিতীয় লিগ শিরোপা। এর মাঝে দুবার রানার্সআপ (১৯৮৭-৮৮ ও ১৯৮৮-৮৯)। অবিশ্বাস্য এই সফলতা তাকে ন্যাপোলির ‘রাজা’র আসনে বসিয়ে দেয়। আজো তিনি ন্যাপোলিতে রাজা কিংবা দেবদূত। তার মৃত্যুতে আর্জেন্টিনার মতো কাঁদছে হাজার হাজার মাইল দূরের শহরটির ভক্তরা। 

মাদকের জন্য কী-ই না করেছেন ম্যারাদোনা! ইতালিতে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ সামনে রেখে কীভাবে ড্রাগ টেস্টকে ফাঁকি দেয়া যায় সেই বিদ্যা রপ্ত করতে পেরেছিলেন তিনি। এ কাজে তিনি ব্যবহার করতে নকল ও প্লাস্টিকের লিঙ্গ। এর মধ্যে বাইরের কোনো পরিচ্ছন্ন মানুষের প্রস্রাব আগে থেকেই ঢুকিয়ে রেখে তা ড্রাগ টেস্টের সময় কৌশলে দিতেন। ফলে তিনি ড্রাগ নিলেও তা টেস্টে ধরা পড়তো না! তার এই উপাঙ্গগুলোর একটি এখনো শোভা যায় বুয়েন্স আয়ার্সের জাদুঘরে!

নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৯১ সালে ইতালির পুলিশের স্টিং অপারেশনে অবশেষে ধরা পড়ে যান ম্যারাদোনা। মাফিয়া যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ভোর তিনটার সময় দুজন যৌনকর্মীকে ডেকে পাঠিয়েই বিপত্তিও ডেকে আনেন তিনি। ফোনে আগে থেকেই আড়ি পাতে কর্তৃপক্ষ, যা পরে তার বিরুদ্ধে কোকেন রাখা ও বিতরণের মামলায় প্রমাণ হিসেবে দায়ের করা হয়। কেননা তিনি যৌনকর্মীদের পাউডার নেয়ার প্রস্তাব করেন। এতেই ফেঁসে যান। 

এটা ছিল তার সাপ্তাহিক রুটিন। ম্যারাদোনার কথাতেই তা পরিষ্কার, রোববার থেকে বুধবার আমি কোকেনের পার্টি করতাম। ড্রাগ নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে বাসায় ফিরতাম। 

মাফিয়া চক্র মাদক ও নারীতে ম্যারাদোনার দুর্বলতার সুযোগটি ভালোভাবেই কাজে লাগায়। তারা খেলোয়াড়টির নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বুনো পার্টিতে তাকে সম্পৃক্ত করতো। 

ওই বছরই মাদকের কারণে প্রথম নিষেধাজ্ঞা পান ম্যারাদোনা। কোকেনে পজিটিভ হওয়ায় তার নিজের দলই ১৫ মাস নিষিদ্ধ করে আর্জেন্টাইন সুপারস্টারকে। একই বছর শেষের দিকে ৫০০ গ্রাম কোকেন বহন করায় বুয়েন্স আয়ার্স বিমানবন্দরে গ্রেফতার হন তিনি এবং ১৪ মাসের জেল দেয়া হয় তাকে। 

যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলে ফেরেন ম্যারাদোনা। যদিও ড্রাগ টেস্টে নিষিদ্ধ এফেদ্রিনের নমুনা খুঁজে পাওয়ায় গ্রুপ পর্বের শুরুর দিকেই তার বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়ে যায়। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনই স্বউদ্যোগী হয়ে তাকে বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনে। পরে ফিফা তাকে ১৫ মাস নিষিদ্ধ করলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যায়। 

ওই সময় ম্যারাদোনা অভিযোগের সুরে বলছিলেন, তারাই আমাকে ফুটবল থেকে অবসরে পাঠিয়ে দিল। আমি তো মনে করি না, আমি আর কোনো প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম, আমার হূদয়টা ভেঙে গেল। 

অবসরের পরও জীবনটা কম বিতর্কিত ছিল না। ১৯৯৪ সালে এক সাংবাদিককে রাইফেল দিয়ে গুলি করায় ১৯৯৮ সালে তাকে দুই বছর ১০ মাসের স্থগিত জেল দেয় আদালত। তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে যায় ১৯৯৭ সালে। তখন ড্রাগ টেস্টে ব্যর্থ হন, যা ছয় বছরের মধ্যে তৃতীয়বার। 

প্রকাশ্যেই নিজেকে মাদকাসক্ত হিসেবে স্বীকার করেছেন ম্যারাদোনা। বলেছেন, এই বোঝা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। বয়েছেনও।  

মাদকের সঙ্গে সখ্যতার কারণে অর্জিত লাখ লাখ ডলার হারিয়েছেন ম্যারাদোনা। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, ন্যাপোলির সঙ্গে চুক্তিতে বছরে ৩০ লাখ ডলার পেতেন ম্যারাদোনা, সঙ্গে এনডোর্সমেন্ট ছিল এক কোটি ডলার। দুটি মিলে বছরে তার আয়কৃত ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বর্তমান সময়ের ২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের সমান। 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস বলছে, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ন্যাপোলিতে খেলে করপরিশোধ ছাড়া ৩ কোটি ৭০ লাখ ইউরো আয় করেন ম্যারাদোনা। ২০০৯ সালে ইতালির কর্তৃপক্ষ জানায়, ম্যারাদোনার কাছে তাদের কর পাওনা সুদসমেত ২ কোটি ৩০ লাখ ইউরো। পরবর্তীতে ম্যারাদোনার কিছু গহনা জব্দ করে ইতালির পুলিশ, যার দাম ৪২ হাজার ইউরোর মতো। যদিও ২০১৬ সালে কোরিয়েরে দেলা সেরাকে ম্যারাদোনা জানান, ২০০৩ সালেই তিনি কর পরিশোধ করে ফেলেছেন। তার কথায়, কারো কাছে আমার ঋণ নেই। তারা কর খেলাপির অভিযোগে ৪০ মিলিয়ন ইউরো চাইছে, যার ৩৫ মিলিয়ন ইউরোই জরিমানা এবং যা সব বিচারকই নাচক করে দিয়েছেন। তারা আমাকে অন্যায়ভাবে ২৫ বছর ধরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। 

তিনি আরো বলেন, আমি চাই না কেউ আমার অবস্থায় পড়ুক। আমি কারো কাছে দেনা নেই। আমার দুর্ভোগের জন্য অনেককেই অনুশোচনা করতে হবে, কারণ নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তারা আমার সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করছে যেন আমি ভয়ংকর সন্ত্রাসী। 

বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, ন্যাপোলি, সেভিয়া, নিওয়েলস ওল্ডবয়েজ ও সর্বশেষ বোকায় খেলে তিনি অনেক অর্থ আয় করেছেন। এরপর আর্জেন্টিনা জাতীয় দল ছাড়াও মোট সাতটি ক্লাবের কোচ ছিলেন। সর্বশেষ মেক্সিকোয় একটি ক্লাবের কোচ হিসেবে মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার পেতেন তিনি, সেখানে ছিলেন ১১ মাস। 

ন্যাপোলিকে দুটি লিগ শিরোপা আর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো এই কিংবদন্তি অবশ্য ধনী ফুটবলার হিসেবে মরতে পারেননি! 

১৯৯১ সালে ন্যাপোলির হয়ে কোনো ম্যাচে অনুপস্থিত থাকার কারণ ইতালির ফুটবল ট্রাইব্যুনাল ম্যারাদোনাকে ৭০ হাজার ডলার জরিমানা করেন। এছাড়া মাদক নিয়ে ক্লাবের সুমান ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে ক্লাবটিও তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়।

মাদকের পেছনে খরচ ছাড়াও মামলা-মোকদ্দমার মতো বেশ কিছু আর্থিক ধকল সইতে হয়েছে, যা আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে প্রায় শূন্য করে দেয়।  

মূলত মাদকের ওপর অতিনির্ভরতা তাকে শারীরিক ও আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। ২০০০ সালে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিউবায় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ছিলেন। এরপর কয়েকটি বছর সুস্থ থাকলেও মাদক আর অর্থের দীর্ঘমেযাদী প্রভাবই তাকে শেষ পর্যন্ত ঠেলে দেয় মৃত্যুর দিকে।  

সূত্র: নিউজ.কম.এইউ ও এক্সপ্রেস.কো.ইউকে, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টইমস 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন