মঙ্গলবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

প্রথম পাতা

ম্যারাদোনার জন্য বিশ্বজুড়ে শোক ও শ্রদ্ধা

রূপকথার মৃত্যু নেই

হাসনাত শোয়েব

আজ থেকে কয়েকশ বছর পর, কোনো এক ভোরে বাবা কিংবা দাদার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে রূপকথার গল্প শুনবে একটি শিশু। বয়সের ভারে আরো একটু নুয়ে পড়া পৃথিবীতে দুই প্রজন্মের মানুষের মধ্যে কী হতে পারে সেই গল্প? তারা কি একটি পাখির উড়ে যাওয়ার গল্প বলবে? নাকি তারা গল্প করবে কোনো একটি অজানা উড়ন্ত বস্তু নিয়ে? অবশ্য তারা চাইলে মাত্র ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার একজন মানুষের গল্পও করতে পারে। যিনি মানুষ হয়েও ঈশ্বরের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের ঈশ্বর। সেই রূপকথার গল্পের নায়কের নাম দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাদোনা। ৩০ অক্টোবর ১৯৬০ সালে বুয়েনস এইরেস থেকে সেই রূপকথা শুরু হয়েছিল বটে, কিন্তু সে গল্প আর কখনো শেষ হয়নি, হবেও না। ফুটবল নামক খেলাটির অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন তার ঈশ্বর হয়ে থাকবেন তিনি। 

ফুটবল ঈশ্বর থেকে দূরে, কিন্তু যিনি ম্যারাদোনার সবচেয়ে কাছে যেতে পেরেছিলেন সেই লিওনেল মেসি বলেছেন, ‘দিয়েগো চিরন্তন’। মিগেল দ্য সেরভান্তেসের অমর চরিত্র ‘দন কিহোতো লা মানচার’কে আমরা যেভাবে মনে রেখেছি কিংবা ফিওদর দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের রাসকোলনিকভ যেভাবে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, নিশ্চিতভাবে তার চেয়েও অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে থাকবেন ম্যারাদোনা। যিনি জীবদ্দশাতেই হয়ে উঠেছিলেন রূপকথার নায়ক, অথচ ছিলেন রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। হয়তো মানুষের মাঝে আরো একটু বেশিই মানুষ। তাই পৃথিবীতেই স্বর্গ ও নরক উভয়ের স্পর্শ পেয়েছিলেন তিনি। যেমন দেখেছেন সাফল্যের শীর্ষ চূড়া, তেমনি জুটেছে ব্যর্থতা ও বিতর্কের গ্লানি। কিন্তু সবকিছু নিয়েই তিনি ম্যারাদোনা। তিনি একজন, তার মতো আর কেউ ছিল না। হয়তো কখনো আর আসবেও না।

ম্যারাদোনা ছিলেন এমন একজন যার বাম পা ইচ্ছা করলে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিতে পারত গোটা পৃথিবীকে। পৃথিবীর মহৎ সব শিল্প যেন ভর করেছিল তার পায়ে। ম্যারাদোনার হাতও অবশ্য পায়ের চেয়ে কম ছিল না। ফকল্যান্ডের যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই হাতকেই পরিণত করেছিলেন ‘হ্যান্ড অব গড’-এ। সত্যিকার অর্থেই স্বয়ং ঈশ্বর যেন সারা জীবন ভর করে ছিলেন ম্যারাদোনার ওপর। যার ভার সামলাতে হিমশিম খেয়েছেন নিজেও, কারণ সমস্ত ঈশ্বরত্ব নিয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত মানুষ। তাই হয়তো সারা জীবন জড়িয়েছেন বিতর্কে। শিরোনাম হয়েছেন নেতিবাচক খবরের। কিন্তু তাতেও মানুষের ভালোবাসা কমেনি এতটুকু। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়েছে। তার খেলা না দেখে, এমনকি তাকে না দেখেও মানুষ ভালোবেসেছে ফুটবলকে, ভালোবেসেছে আর্জেন্টিনাকে। এখনো বিশ্বকাপের মৌসুম এলে পৃথিবীর অর্ধেকটা ছেয়ে থাকে আর্জেন্টিনার পতাকায়। কেউ না দেখলেও সেখানে অদৃশ্য যে নামটি জ্বলজ্বল করতে থাকে সেটি ম্যারাদোনার। যার নামে শপথ গ্রহণ করে বুয়েনস এইরেস ও নেপলসের লোকেরা। যার বিপক্ষে খেলাটাও ছিল কারো কারো জীবনের মহৎ প্রাপ্তি।

লিভারপুল কিংবদন্তি বিল শ্যাংকলি একবার বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ ভাবে ফুটবল জীবন মরণ সমস্যা। এটা আমার পছন্দ না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এটা জীবন-মৃত্যুর সমস্যার চেয়েও বেশি কিছু।’ একজন ম্যারাদোনার দিকে তাকালে শ্যাংকলির প্রবাদপ্রতীম এই উক্তিটিকে মোটেই অতিশয়োক্তি বলে মনে হবে না। ফুটবলকে তিনি সেভাবেই ভালোবেসেছেন, মানুষও সেই ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছিল তাকে। তাই বুয়েনস এইরেস ও নেপলসের মানুষের কাছে ‘দিয়েগো’ কোনো ধর্মের চেয়ে কম নন। তার মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি শোক নেমে এসেছে এ দুটি শহরে। কথিত আছে, একবার জুভেন্টাসের বিপক্ষে জয়ের পর বন্ধুদের নিয়ে নেপলসের রাস্তায় হইচই করে উদযাপন করছিলেন ম্যারাদোনা। বিরক্ত হয়ে এক বুড়ি বেরিয়ে এসেছিলেন লাঠি নিয়ে। কে জিজ্ঞেস করার পর বুড়িকে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, আমি ম্যারাদোনা, নেপলসের রাজা। হাসতে হাসতে ফিরে গিয়েছিলেন বুড়ি। তাকে এমনই ভালোবাসত তারা, কারণ তিনি তো রাজা। পেলে নাকি ম্যারাদোনা, সর্বকালের সেরা কে? এই প্রশ্নের যেমন উত্তর নেই, তেমনি ম্যারাদোনা নাকি নেপলস কে কাকে বেশি ভালোবাসত তারও কোনো উত্তর নেই। নেপলসের প্রতি নিজের ভালোবাসা সম্পর্কে ম্যারাদোনা বলেছিলেন, ‘আমি নেপলসের দরিদ্র শিশুদের আদর্শ চাই, কারণ বুয়েনস এইরেসে আমি যেভাবে থাকতাম, তারাও ঠিক সেভাবে এখানে থাকে।’ নিজের আত্মজীবনীতে ম্যারাদোনা বলেছিলেন, ‘নেপলস একটি পাগলাটে শহর, ঠিক আমার মতো।’ সেই পাগলা শহরটি এখন চোখের জলে স্মরণ করছে ম্যারাদোনাকে, ভালোবাসার দিয়েগোকে। ভিনদেশ থেকে এসে হাসতে হাসতে, হাসাতে হাসাতে যিনি নেপলসের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে ম্যারাদোনার ওপর কার অধিকার বেশি, বুয়েনস এইরেস নাকি নেপলসের? এ প্রশ্নের উত্তরও অমীমাংসিত। তবে দুটো শহরের প্রতিটি ধূলিকণায় থেকে যাবে দিয়েগোর নিঃশ্বাস। যাকে মনে করেই হয়তো কিংবদন্তি লেখক এদোয়ার্দো গালেয়ানো লিখেছিলেন, ‘কোনো এক উজ্জ্বল দিনে বাতাসের দেবী চুমু খেয়েছিল একজন মানুষের পায়ে...যে চুমু থেকে জন্ম নেয় একজন কিংবদন্তি...। যখন থেকে তিনি হাঁটতে শেখেন, তখন থেকে তিনি জানেন কীভাবে ফুটবল খেলতে হয়।’ ম্যারাদোনাও তেমনই। অন্য এক জায়গায়ই আবার ম্যারাদোনার নাম ধরে গালেয়ানো বলেছিলেন, নিজের ঈশ্বরত্বের অগ্নিশিখায় প্রজ্বলিত একজন ঈশ্বর। 

৫০ ও ৬০-এর দশকে পেলের হাত ধরে মূলত ফুটবল তার চূড়া স্পর্শ করেছিল। এক পর্যায়ে পেলেকে দিয়ে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকে। কিন্তু কে জানত পেলের ফুটবল থেকে বিদায়ের রেশ শেষ হওয়ার আগেই মঞ্চে আবির্ভাব ঘটবে আরেকজনের। সেই ম্যারাদোনা, যিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। সে সঙ্গে আমৃত্যু পেলের একক শ্রেষ্ঠত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছেন তিনি। অবশ্য দুজন ফুটবল ঈশ্বরের মাঝে বেছে নেয়ার ক্ষমতাইবা মানুষের কোথায়! 

খেলোয়াড় ম্যারাদোনাকে নিয়ে কথা বললে অবশ্য এই লেখা শেষ হওয়ার নয়। একক কৃতিত্বে বিশ্বকাপ জেতানোসহ এত এত কীর্তি তার ঝুলিতে যা বলে শেষ করা যাবে না। তাকে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন বললেও যেন কম বলা হয়। আবার কেবল খেলোয়াড়ি গণ্ডি দিয়েও তাকে আটকানো যাবে না। তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবীও। নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। যার বাহুতে আঁকা ছিল চে গুয়েভারা এবং বিখ্যাত বাম পায়ে আঁকা ছিল ফিদেল কাস্ত্রোর ছবি। বন্ধু ও পিতৃতুল্য ফিদেলের মৃত্যুতে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গিয়েছিলেন কিউবার পাশে দাঁড়াতে। নিজের মৃত্যুর দিনটিও বেছে নিয়েছেন বন্ধুর মৃত্যুর দিনকে। মৃত্যুকে কাছে টেনে নিয়েছেন ঘুমের ভেতর। জাগ্রত ম্যারাদোনার কাছে আসতে মৃত্যুকেও নিশ্চয় একটু বিব্রত হতে হতো।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন