শনিবার | জানুয়ারি ২৩, ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

কভিড-১৯

দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর সামনে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ

সৈয়দ মুনির খসরু

জনস্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কাঠামোগত ধাক্কা দেয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের বিড়ম্বনায় ফেলেছে কভিড-১৯। মহামারীর কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অনুমান করছে যে ২০২০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জিডিপি সংকুচিত হবে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে আশ্চর্যজনক হলেও ধারণা করা হচ্ছে, চলমান সংকট উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিতে যেতে পারে। 

এর আংশিক কারণ হলো, উন্নত দেশগুলোয় মহামারীটি সাধারণ স্বাস্থ্যগত প্রভাবের মাত্রাকে যতদূর সম্ভব বিপর্যস্ত করে তুলেছে। উন্নততর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা ও শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা জাল থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর জনগণ দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ভারতের অবস্থান ১১২তম, এদিকে এ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৩৭তম। অথচ লাখ হিসাবে ভারতে ৬ হাজার ৪০০ জন কভিডে আক্রান্ত হলেও আমেরিকায় এর সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেশি।

কিছু উন্নয়নশীল দেশ যেমন ভিয়েতনামে করোনা শুরুর প্রথম দিকেই কঠোর পরীক্ষা, শনাক্তকরণ ও কোয়ারেন্টিন জোরদার করা হয়। উন্নত অনেক দেশও যা করতে সক্ষম হয়নি। এমনকি দরিদ্র দেশগুলোর ভুল রিপোর্ট ও ভুল তথ্য প্রদান সম্ভাবনার বিপরীতে উন্নত অর্থনীতির আপেক্ষিক কর্মক্ষমতার বিষয়টি এখনো একটি প্যারাডক্স।

উপরন্তু, ধনী দেশগুলো যখন মহামারী-পরবর্তী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন কৌশলের দিকে মনোনিবেশ করতে শুরু করেছে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো ততক্ষণে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) অনুমান করছে ২০২০ সালে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বহিরাগত বেসরকারি অর্থপ্রবাহ (ইন্টারনাল প্রাইভেট ফাইন্যান্স ইনফ্লো) ৭০০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক সংকটের ফলে সৃষ্ট ৬০ শতাংশ প্রভাবের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের হিসাব অনুযায়ী শুধু ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্তই উদীয়মান বাজারগুলো থেকে নন-রেসিডেন্ট পোর্টফোলিও আউটফ্লোর পরিমাণ ছিল মোট ৮৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন। ওইসিডি আরো অনুমান করছে, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ বছরে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হ্রাস পাবে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে যা আরো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ-জাতীয় প্রবণতা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর জন্য একটি গুরুতর অবস্থার ইঙ্গিত দেয়, বিশেষ করে ঐতিহাসিকভাবে যারা উত্তর গোলার্ধের উন্নয়ন সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। 

বিভিন্ন গবেষণা অনুসারে, উন্নয়ন সহায়তা ও মানবিক সহায়তা অগত্যা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে উৎসাহিত করে না। ওইসিডির সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ থেকে ৯৪ শতাংশ উত্তরদাতাই বিশ্বাস করেন না যে মানবিক সাহায্য তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করে। মানুষ দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নয়, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন চায়। 

যদিও উন্নয়ন সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্কের বিষয়গুলো পুরনো। সমালোচকরা দাবি করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য ধনী রাষ্ট্রগুলো একে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং রফতানি বিলের বেশির ভাগ সুবিধা যাতে দাতাদের ঝুলিতে যায়, তা নিশ্চিত করতে প্রায়ই বিভিন্ন শর্তারোপ করে। তবে উন্নত অনেক রাষ্ট্রই মহামারীবিষয়ক অসামঞ্জস্য প্রতিক্রিয়ার কারণে তাদের স্বাভাবিক ক্ষমতার অনেকটাই খুইয়ে ফেলেছে। 

এমনকি কভিডের আঘাত আসার আগে থেকেই অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতিই সাহায্যনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে স্বনির্ভরতার দিকে টেকসই স্থানান্তরের উপায় খুঁজছিল। ২০১৮ সালে রুয়ান্ডা তার দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে উচ্চতর মূল্যযুক্ত পোশাক উৎপাদনে উৎসাহিত করতে সেকেন্ড হ্যান্ড পোশাক রফতানি নিষিদ্ধ করে; দেশটির শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা স্থগিতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়। এদিকে গত বছর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি ও এফডিআই আকর্ষণে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পগুলোয় সহায়তা করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্য সরকার ১৪ বিলিয়ন পাউন্ড (১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ দেয়।   

বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে স্বনির্ভর হওয়ার অনেক বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রথমত, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতে, মহামারী চলাকালীন পশ্চিমের তুলনায় পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য তুলনামূলক কম সংকুচিত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো, সাধারণত মন্দার সময় উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পগুলো অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি স্বল্পমূল্য সংযোজনীয় ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ওপর তাদের নির্ভরতা থেকে উদ্ভূত। ভিয়েতনামের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে এটি স্পষ্ট। মহামারীজুড়ে দেশটির উৎপাদন কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং ২০২১ সালের মধ্যে আঞ্চলিক অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় তাদের দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ই-কমার্সকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে ডিজিটালাইজেশন। বিশ্বজুড়ে উৎপাদনকারীদের জন্য যা দুর্দান্ত একটি প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। চলতি বছরের আগস্ট নাগাদ বাংলাদেশের ই-কর্মাস সেক্টরের বৃদ্ধি ঘটেছে ২৬ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোয়ও একই প্রবণতা দেখা যায়। 

তৃতীয়ত, মানুষ যেহেতু স্বাস্থ্য ও ফিটনেসের গুরুত্ব সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হচ্ছে, তাই মহামারী-পরবর্তী অর্থনীতিতে স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতগুলোর সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধানগুলোর সুবিধা নিতে পারে, যেখানে পেটেন্ট সম্পর্কিত কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না। 

পরিশেষে, দক্ষিণ গোলার্ধের সরকারগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদগুলো একত্র করে বহিরাগত উন্নয়ন অর্থায়ন হ্রাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত বর্ধমান ডিজিটাল অর্থনেতিক ক্রিয়াকলাপ থেকে আয়ের জন্য করনীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা কাজটি করতে পারে। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে জিডিপিতে নিম্নস্তরের কর রাজস্বের পরিমাণ ১০ থেকে ২০ শতাংশ, উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় পরিমাণটি ৪০ শতাংশ। স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও শিক্ষার মতো জনবিষয়গুলোয় সরকারের বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। 

স্বাবলম্বী বা স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশকিছু বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। শুধু দুর্বল সুশাসন, প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ ও নাগরিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং তাদের অবশ্যই ১৯৪৫ পরবর্তী বহিরাগত উন্নয়ন অর্থায়নের দৃষ্টান্তগুলোও ভেঙে বের হতে হবে; যা মূলত উত্তর গোলার্ধ দ্বারা পরিচালিত ও তাদের ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে গঠিত। এরা মনে করেন সবকিছু সম্পর্কে তারাই অনেক ভালো জানে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোও তাদের হিতোপদেশ শুনতে বাধ্য হয়েছে। তাই আজ থেকে উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলোকে তাদের উন্নয়ন এজেন্ডা ঘিরে একটি পরিকল্পনা করতে হবে, যা হবে সম্পূর্ণভাবে দাতাদের শর্তমুক্ত।

প্রতিটি সংকটের মধ্যেই দারুণ সম্ভাবনা নিহিত থাকে, কভিড-১৯ মহামারীও ভিন্ন কিছু নয়। এটি বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে তাদের অর্থনীতিতে নতুনত্ব তৈরি ও নতুন কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে বহিরাগত সহায়তা নির্ভরতার বিকলাঙ্গ উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ এনে দিয়েছে।  

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


সৈয়দ মুনির খসরু: পলিসি, অ্যাডভোকেসি ও গভর্ন্যান্স ইনস্টিটিউটের (আইপিএজি) চেয়ারম্যান 

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস  

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন