শনিবার | জানুয়ারি ২৩, ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলুর দামে ঊর্ধ্বগতি

নিম্নমধ্যবিত্তের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা

ড. মোছা. ইসমত আরা বেগম , ড. মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

বাংলাদেশ যদিও দানাদার (সিরিয়াল) খাদ্যশস্য উৎপাদন ও ভোগে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, গৃহস্থালি এবং স্বতন্ত্র খাদ্যবৈচিত্র্য, শিশু ও মাতৃপুষ্টির অবস্থা চ্যালেঞ্জ হিসেবে শীর্ষস্থানীয়। ভারসাম্যহীন খাদ্যগ্রহণ (ইমব্যালেন্স ডায়েট) পুষ্টিহীনতা ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকির কারণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি। কিছুদিন ধরে অন্যান্য সবজির মতো আলুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। প্রতি কেজি আলু খুচরা বাজারে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ধরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। আলুর দাম আগে কখনো এতটা বাড়েনি। এমনকি গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) আলুর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা। এ বছর আলুর দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী, যারা অনেকে আলুকে খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের পুষ্টি গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে আনতে হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। তাদের ভোগ বাজেটে করতে হয়েছে কাটছাঁট। 

বাংলাদেশের একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের গড়ে দৈনিক ২ হাজার ৪৩০ কিলোক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন (বাংলাদেশের জন্য ডায়েটরি গাইডলাইনস, ২০১৩)। এজন্য দৈনিক ৪০০ গ্রাম দানাদার খাদ্য, ৫০ গ্রাম ডালজাতীয় খাদ্য, ২৬০ গ্রাম প্রাণিজ খাদ্য, ১০০ গ্রাম ফল ও ৪০০ গ্রাম সবজি (যার মধ্যে অবশ্যই ১০০ গ্রাম আলু) থাকতে হবে (বারডেম ২০১৩)।  আলুতে অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম রান্না করা আলুতে (উপরের আবরণসহ) অনেক ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে। আলুতে পানি ছাড়াও পরিমিত পরিমাণে প্রোটিন ও ফাইবার আছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী।  একটি ছোট আলু (১৩৮ গ্রাম ওজনের) বাহ্যিক আবরণসহ রান্না করা হলে ১৩৮ কিলোক্যালোরি শক্তি, ৪ গ্রাম প্রোটিন, ৩০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেড, শূন্য দশমিক ৮ গ্রাম সুগার, ৩ গ্রাম ফাইবার ও শূন্য দশমিক ১ গ্রাম চর্বি পওয়া যায়। এছাড়া নির্বাচিত মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সামগ্রীর মধ্যে একই আকারের আলুর মধ্যে ১১ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, শূন্য দশমিক ১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, শূন্য দশমিক শূন্য ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২, ১ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-৩, শূন্য দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-৬, ৩৬ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট, ৭৫৯ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪১ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ১ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম আয়রন ও শূন্য ৪৮ মিলিগ্রাম জিংক রয়েছে (ইউএসডিএ, ২০১৮)। তাই আলুকে অনেক সময় নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের সস্তা পুষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, অনেক সবজির তুলনায় আলুর জন্য আমরা যে দাম পরিশোধ করি, তার চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টি উপাদান পেয়ে থাকি।

এ বছর অধিক বৃষ্টি ও অসময়ে বন্যার কারণে সবজি উৎপাদন অনেক কম হয়েছে। কারণ অনেক সবজি মাঠেই নষ্ট হয়েছে। কৃষকও সময়মতো সবজির মাঠ তৈরি করতে পারেনি। তাই বাজারে নিয়মিত সবজির জোগান ছিল কম। এ কারণে সবজির দাম অনেক বেড়ে যায়। যেহেতু মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের উৎস কিছু সময়ের জন্য করোনার কারণে থমকে গিয়েছিল এবং সবজির দাম অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল, তাই অনেকেই আলুকে বিকল্প সবজি হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। তাছাড়া করোনার কারণে ভোক্তাদের বাজারে উপস্থিতিও কমে গিয়েছিল। যেসব ভোক্তা প্রায় প্রতিদিন বাজারে যাতায়াত করতেন এবং প্রয়োজন মতো কাঁচাবাজার অর্থাৎ সবজি ক্রয় করতেন, তারা অন্যান্য সবজির পরিবর্তে বেশি পরিমাণে আলুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কারণ আলু অল্প সময় হলেও ঘরে রাখা যায়। এসব কারণে অন্য সবজির পরিবর্তে মানুষ আলু দ্বারা তাদের আপত্কালীন ভোগ প্রয়োজন মেটায়। এ কারণে বাজারে আলুর চাহিদা বেড়ে যায়। 

এফএও ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ১৯৯৫-৯৯ সাল পর্যন্ত দেশে জনপ্রতি দৈনিক আলুর চাহিদা ছিল গড়ে প্রায় ২৯ গ্রাম। ২০১৭ সালে (সর্বশেষ) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৩৬ গ্রাম। সে হিসাবে জনপ্রতি বার্ষিক আলুর ভোগ ছিল ৪৯ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম (FAOSTAT, 2020)। এ হিসাবকে বিবেচনায় নিলে দেশে স্বাভাবিক অবস্থায় (করোনা পরিস্থিতি ছাড়া) আলুর ভোগ ছিল ৮২ দশমিক শূন্য ৬ লাখ টন। বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষিত আছে প্রায় ৭ দশমিক ৬৫ লাখ টন আলু। ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত আলু রফতানির পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ৪৫ লাখ টন (হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, ২০২০)। এ বছর আলুর চাহিদা বৃদ্ধির আরো একটি কারণ হলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলু সরবরাহ। রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণকৃত আলুর পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ লাখ টন (৭ নভেম্বর, ২০২০, বণিক বার্তা)। প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ব্যবহূত আলুর পরিমাণ প্রায় শূন্য দশমিক ১৫ লাখ টন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশে মোট আলুর চাহিদা ৯৭ দশমিক ৩১ লাখ টন। কিন্তু এ বছর (২০১৯-২০) আলুর মোট উৎপাদন ছিল ১ দশমিক শূন্য ৯ কোটি টন (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ২০২০)। (উৎপাদনের একটি আংশ আবার পোস্ট হারভেস্ট ক্ষতি হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়, যা এখানে বিবেচনায় নেয়া হয়নি) সে হিসাবে বলা যায় আলুর অতিরিক্ত চাহিদার কারণেই বাজারে দাম বেড়ে চলেছে। 

এই দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী। আয় ও ব্যয়ের সর্বশেষ খানা জরিপের (২০১৬) মতে, বাংলাদেশের সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মাসিক আয় পরিবারপ্রতি মাত্র ৪ হাজার ৬১০ টাকা। যেখানে বাংলাদেশে গড় মাসিক আয় পরিবারপ্রতি ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। একই জরিপের তথ্যমতে, পরিবারপ্রতি মাসিক ভোগব্যয় ১৫ হাজার ৪২০ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ। মোট ভোগব্যয়ের মধ্যে ২৭ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ ব্যয় হয় দানাদার খাদ্যশস্য ভোগে। আর মাত্র ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ ব্যয় হয় সবজি ক্রয়ে। এই সবজির মধ্যে অধিকাংশ ব্যয়ই হয় আলু ক্রয়ে। কারণ আলু বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সবজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর মোট ভোগব্যয়ের ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ব্যয় করে সবজি ক্রয়ে। তাই এ বছর সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই জনগোষ্ঠী মারাত্মকভাবে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। আলু যেহেতু ভূমিহীন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অন্যতম সবজির উপকরণ। তাই দাম বাড়ার ফলে তারা ভোগ ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের জনগোষ্ঠী আরো বেশি পরিমাণে পুষ্টি সমন্বয়হীনতায় পড়েছে। 

নিম্নমধ্যবিত্তদের পুষ্টি সমন্ব্বয় করার জন্য সবজির দাম, বিশেষ করে আলুর দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা আবশ্যক। বর্তমান সরকার যেহেতু সম্প্রতি খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, সেহেতু কৃষিপণ্যের বিশেষ করে আলুর দাম স্থিতিশীল রাখা একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য আলুর চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও স্টেকহোল্ডারদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। আশা করা যায়, বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য কৃষক ভাইদের উৎসাহিত করে উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে জোগানের সামঞ্জস্য বিধান করে আলুর দাম পূর্বাবস্থায় ফিরে আসবে এবং নিম্নমধ্যবিত্তদের খাদ্যাভ্যাস আগের অবস্থায় আসবে।


ড. মোছা. ইসমত আরা বেগম: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

ড. মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন: অধ্যাপক কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন