রবিবার | মার্চ ০৭, ২০২১ | ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

এজেন্ট ব্যাংকিং

নতুন সম্ভাবনা যেন নতুন শঙ্কা তৈরি না করে

বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত এক দশকে গ্রাম বিশেষত পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক খাতের আওতায় আনায় সাফল্য এসেছে। গত কয়েক বছরে আনুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটকও এজেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং। কেবল সময় ও অর্থ সাশ্রয়ই নয়, এজেন্ট ব্যাংকিং সঞ্চয়ের প্রবণতাও বাড়াচ্ছে। এসব সুবিধার কথা বিবেচনা করেই গ্রাহকরা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। সঞ্চয়ের জন্য গ্রাহকরা বেশি যাচ্ছেন এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলোয়। এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবের ৮০ শতাংশ গ্রামে হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তবে সমপ্রতি প্রবাসী আয় দেশে প্রেরণের ক্ষেত্রে সরকার ২ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া শুরু করার পর গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকরা রেমিট্যান্স তোলার জন্য ব্যাপক হারে এজেন্ট আউটলেটগুলোর ওপর আস্থা রাখছেন। করোনাজনিত অর্থনৈতিক স্থবিরতার সময়ে এই রেমিট্যান্সই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কাজেই বোঝা যাচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং কেবল গ্রামাঞ্চলে আর্থিক সেবার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে তা নয়, পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে শক্তিসঞ্চারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

শুধু বাংলাদেশ নয়, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে ব্যাংকিংয়ের এ মডেল। এখন অনেক ব্যাংক সাব এজেন্ট ব্যাংকিং মডেলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সন্দেহ নেই, গ্রামীণ অঞ্চলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং বড় ভূমিকা রাখছে। জনগণের দোরগোড়ায় এ সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে জালিয়াতি রোধ করা কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। খবর মিলছে, এরই মধ্যে কিছু এজেন্ট গ্রাহকের অর্থ নিয়ে পালিয়েছে, কিছু সীমাবদ্ধতাও ধরা পড়েছে। চার্জ কমানো বা সেবার মান বাড়ানোর মতো সংস্কারের বেশকিছু সুযোগ রয়েছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত তিন পর্বের ধারাবাহিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সাফল্য, ব্যাংকগুলোর অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা কিছু সুপারিশও করেছেন। ক্রমেই জনপ্রিয় ও বড় হয়ে উঠছে অনলাইননির্ভর এমন সেবা। করোনার অভিঘাত একে আরো ত্বরান্বিত করেছে। 

বাংলাদেশে শহর ও গ্রামের মানুষের আয়-সম্পদের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কমিয়ে আনতে ব্যয়সাশ্রয়ী একটি ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল অনেক দিন থেকে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি বিশেষত ইন্টারনেটের সম্প্রসারণ ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের নতুন করে চিন্তা করতে সহায়তা জুগিয়েছে। গ্রামের মানুষের আয় কম হওয়ায় তাদের পক্ষে বর্তমান ব্যয়বহুল ব্যাংকের সেবা নেয়া কঠিন। আবার ব্যাংকের পক্ষেও ভবন ভাড়া নিয়ে জনবল নিয়োগ করে ব্যয়সাশ্রয়ী সেবা দেয়া কঠিন ছিল। এমন প্রেক্ষাপট থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে হাজির হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত ব্যাংকিং থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং ২৫ শতাংশ ব্যয়সাশ্রয়ী। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সঞ্চয়ের অর্থ আনুষ্ঠানিক খাতে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আমানত বা সঞ্চয় নয়, ঋণের প্রবাহ তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

এত কিছুর মধ্যেও প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। আবার ব্যাংকের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতায় গ্রাহক বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে নতুন নতুন সেবা পণ্য উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। খবর মিলছে, এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণে ব্যাংকগুলো পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের চেয়ে লাভজনকতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংকের শাখা স্থাপনের মতো করে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে একটি এবং সমৃদ্ধ অঞ্চলে একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা খোলার নির্দেশনাও বাংলাদেশ ব্যাংক দিতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখা গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোকে প্রাধান্য দিতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এটি চালু করা যেতে পারে। 

এজেন্ট ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ায় এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর একদিকে এজেন্ট ও আউটলেট সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বেড়েছে হিসাব খোলা ও আমানতের পরিমাণও। এ সেবার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে আমানত বাড়লেও বিপরীতে ঋণ বিতরণ কম করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীদের সেবা প্রদানে পিছিয়ে রয়েছে ব্যাংকগুলো। আগামীতে এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক দিকনির্দেশনা দেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সেলফোন অপারেটররা। ব্যাংক কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের নেতৃত্বাধীন সব ধরনের মডেলেই এক্ষেত্রে ভিন্ন ভূমিকা পালন করছে তারা। ব্যাংক নেতৃত্বাধীন মডেলে কেনিয়ায় এম সোয়ারি, পাকিস্তানে ইজিপয়সা, নেপালে হ্যালোপয়সা এবং ভারতে ফিনো ও ইকো নামে এ সেবা চালু রয়েছে। আর টেলিকম সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন মডেলে কেনিয়ায় এম পেসা, তানজানিয়ায় এমটিএন মানি ও ইন্দোনেশিয়ায় এক্সএল তুনাই সেবা চালু আছে। এছাড়া পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন মডেলের আওতায় ভারতে অক্সিজেন ও কম্বোডিয়ায় উইংয়ের সেবা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে এতদিন নেটওয়ার্ক সেবা দিয়ে গেলেও এই প্রথম সরাসরি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়েছে দুটি সেলফোন অপারেটর। এক্ষেত্রে কঠোর তদারকি, মানসম্পন্ন সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়াকে চালিত করতে পারে। তবে এ যাত্রাপথে কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীনও হতে পারে। এক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে হলে অবশ্যই তদারকি বাড়িয়ে যেতে হবে। তথ্য-উপাত্ত ও আইনের নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং ও ঋণের ইকোসিস্টেমের ওপর জোরালো দৃষ্টি দিতে হবে, যাতে গ্রাহকদের সুরক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোতে অসদাচরণ ও জালিয়াতির বিষয়টিও সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা চাই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন