মঙ্গলবার | জানুয়ারি ১৯, ২০২১ | ৬ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

পর্যটনের সুবাতাস

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে, বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন দেশে নানা বিপর্যয় নেমে এসেছে। একসঙ্গে গোটা বিশ্বে মহাবিপর্যয় নেমে আসার ঘটনা এবারই প্রথমে প্রত্যক্ষ করছে পৃথিবীর সব মানুষ। কভিড-১৯ নামের মরণঘাতী এক ভাইরাসের প্রকোপে আজ সারা বিশ্ব প্রকম্পিত। ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এরই মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। গোটা বিশ্বে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দুই কোটি। আমাদের বাংলাদেশে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিড-১৯ আতঙ্ক কিছুটা কেটে গেছে। তবে জনমনে অস্বস্তি এখনো কাটেনি। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারও কমছে না। অবশ্য বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের একই অবস্থা। এর পরও বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুরু হয়েছে প্রায় সব রকমের অর্থনৈতিক কর্ম। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আকাশপথও চালু করছে দেশগুলো। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। অভ্যন্তরীণ রুটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোও ধীরে ধীরে খোলা হচ্ছে। ফলে গতি ফিরছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

বাংলাদেশে পর্যটন একটি উদীয়মান শিল্প। গত কয়েক বছরে পর্যটন শিল্পে উন্নতি চোখে পড়ার মতো। নভেল করোনাভাইরাসের রাহুগ্রাসের প্রভাবে এ শিল্পে ধস নেমে এসেছে। সব প্রকার হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মোট পাঁচ মাসে সার্বিক পর্যটন শিল্পে ৯ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার ৫০০ জন তাদের চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। ২০১৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের ভূমিকা ছিল জিডিপি খাতে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশ। করোনার প্রভাবে এখন পর্যন্ত পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, চাকরি হারাবেন প্রায় ৭ দশমিক পাঁচ কোটি পর্যটনকর্মী। শুধু পর্যটন খাতে গত বছরের তুলনায় এ বছর আয় কমবে প্রায় ২৬৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। ব্যবসা খাতে ভ্রমণ বাবদ ক্ষতির সম্মুখীন হবে ৮১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। 

কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কার মধ্যেও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছে দেশের পর্যটন খাত। চলতি শীত মৌসুমের শুরুতেই লোকে লোকারণ্য বিভিন্ন পর্যটন বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পর্যটন শিল্প। শীত যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য। শীতের আগমনে বদলাতে শুরু করেছে জনশূন্য পর্যটন স্পটগুলোর চিত্র। ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনা বেড়েছে দর্শনীয় স্থানগুলোয়। ধস কাটিয়ে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে চাঙ্গা হয়ে উঠছে দেশের অর্থনীতিও। শীতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে বেড়ানোর জন্য অনেকে ছুটে যাচ্ছেন দূরদূরান্তে।

এরই মধ্যে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। বিভিন্ন স্পটে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তাছাড়া যান্ত্রিক জীবনে নানা কর্মব্যস্ততায় জীবনের ছক থেকে বেরিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় ভিড় জমাচ্ছে ভ্রমণপিপাসু মানুষ। চিরসবুজের ছোঁয়া পেতে পাহাড়ি জেলাগুলোয় পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে পর্যটকরা। শীতের হিমেল পরশে সজীবতা এসেছে পাহাড়ের প্রকৃতিতে। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সাগরকন্যা কুয়াকাটা, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, সিলেট, মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলের হোটেল-মোটেলগুলো আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বুকিং। এ সময়ে নতুন কোনো বুকিংও নিচ্ছে না অনেক হোটেল। একই অবস্থা বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রেও। অনেক আগে বুকিং না দিলে আসন পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে পর্যটন খাত ফের ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।  

সংশ্লিষ্টরা জানান, পর্যটন শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। মোট দেশজ উত্পাদন জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ অবদান রাখছে পর্যটন শিল্প। করোনা মহামারীতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে এ খাতের। কিন্তু এরই মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর বড় অংশই অভ্যন্তরীণ পর্যটক। তবে বিদেশী পর্যটকদের সংখ্যা এখনো তেমন বাড়েনি।  

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও কভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটকদের ভ্রমণ করতে উত্সাহিত করছে। কভিড-১৯ পরবর্তী ভ্রমণবিধিও তৈরি করেছে সংস্থাটি।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী করোনাকালে পর্যটন ব্যবসা সচল রাখতে একটি নীতিমালা করা হয়েছে। পর্যটন খাত যাতে ঘুরে দাঁড়ায়, সেজন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এতে পর্যটক বাড়ছে।  

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্প চাঙ্গা হতে শুরু করায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। এতে কভিড-১৯ বিপর্যয় কাটিয়ে পর্যটন খাত লাভবান হচ্ছে। কক্সবাজার হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউজ, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী কোথাও রুম খালি নেই। সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে পর্যটন খাতের অবস্থা রমরমা। পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় রয়েছে কক্সবাজারে।

ইতিহাসের ভয়াবহতম বিপর্যয় কাটিয়ে আবারো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্প। সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মানুষের হাতে টাকার সরবরাহ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাপী চলমান কভিডের প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া অর্থনীতির খাতগুলো আবারো ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে। স্থবির হয়ে পড়া শিল্প-কারখানার চাকা ঘুরছে। বাড়ছে উত্পাদনও। এক্ষেত্রে সরকারের দেয়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রণোদনা প্যাকেজ ও দ্রুত নেয়া কৌশলগুলো বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে । 

পর্যটন শিল্পের বিকাশে আবাসিক হোটেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেস্টুরেন্ট ও হস্তশিল্পের তৈরি শোপিজ,  তাঁতের কাপড়ের দোকানসহ পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও। স্থানীয় অধিবাসীদের তৈরি কোমর তাঁতের পোশাক এবং বাঁশ, কাঠের তৈরির হস্তশিল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্রের প্রধান ক্রেতা হচ্ছে পর্যটক। বেড়াতে আসা দেশী-বিদেশী পর্যটকরাই এসব জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যায়। এখন প্রতিদিন বিভিন্ন পর্যটন স্পটে আগমন ঘটছে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের। সরকারি ছুটির দিনগুলোয় হয় উপচে পড়া ভিড়। এতে আর্থিক আয় বেড়েছে সরকারি-বেসরকারি পর্যটন স্পটগুলোর। চাঙ্গা হয়ে উঠেছে পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পোশাক ও স্থানীয় উত্পাদিত পণ্যসামগ্রী বিপণিসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য। পর্যটকবাহী গাড়িগুলোসহ পরিবহন ব্যবসাও অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। পর্যটকবাহী গাড়িগুলোসহ পরিবহন ব্যবসাও অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্ক কাটিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করেছে। অর্থনীতি বাঁচাতে ও পর্যটক বাড়াতে দেশে দেশে সীমান্ত খুলে দেয়া হয়েছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে পৃথিবীর কোনো দেশ পুরোপুরি লকডাউনে নেই। কভিড-১৯-এর কারণে বন্ধ থাকা পর্যটনকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। যেগুলো এখনো বন্ধ রয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে সেগুলোও খুলে দেয়া হবে। পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক ও পর্যটনের সঙ্গে জড়িত সবাই যেন স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলে, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বিষয়টি কঠোরভাবে দেখছে জেলা প্রশাসন। জনগণ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটনকেন্দ্রে যায়, সেজন্য বিভিন্নভাবে জনসচেতনতা তৈরি করার জন্য কাজ চলছে।

এই মহামারীতে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে ওঠাটা রাতারাতি সম্ভব নয়। এজন্য সময় প্রয়োজন। করোনার ভয়াবহ আতঙ্ক কবে পুরোপুরি কাটবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে জীবন ও জীবিকার তাগিদে এবং দেশের সামগ্রিক ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন অর্থনীতিকে আগের স্বাভাবিক সমৃদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটন ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। গত ছয়-সাত মাসের অচলাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যারা পুঁজি হারিয়েছেন, তারা নতুন নতুন ব্যবসা উদ্যোগের কথা ভাবতে শুরু করেছেন। এরই মধ্যে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পট ও রিসোর্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে চালু করে দেয়া হয়েছে। ফলে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা পর্যটন শিল্পে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করলে আমাদের পর্যটন ব্যবসায় প্রাণ ফিরে আসবে। এরই মধ্যে পর্যটন খাতে বিরাট ধস নেমেছে করোনার প্রকোপে। এই ধস কাটিয়ে উঠতে সময়োপযোগী নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আসতে চাইছেন এ খাতের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা। 

লেখক:

চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন