মঙ্গলবার | জানুয়ারি ১৯, ২০২১ | ৬ মাঘ ১৪২৭

খেলা

আদিওস ম্যারাদোনা : যখন পড়বে না তার পায়ের চিহ্ন এই বাটে

হাসনাত শোয়েব

“Are idols, like gods, condemned to burn up in their own flames?”
“He played, he won; he peed, he lost”

ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাদোনার সম্পর্কে ওপরের কথাগুলো বলেছিলেন উরুগুয়ের কিংবদন্তি লেখক এদোয়ার্দো গালেয়ানো। হয়তো এরচেয়ে সহজ কথায় ম্যারাদোনাকে, তার জীবনকে তুলে ধরা সম্ভব নয়। সম্ভব নয়, একজন ‘নেপলসের রাজাকে’ ব্যাখ্যা করা; যিনি আসলেন, জিতলেন এবং চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন বর্ণিল এক জীবন। যে জীবন মানুষ হয়তো স্বপ্নে ভাবতে পারে, কিন্তু মানুষ কখনো সে জীবনের নাগাল পায় না। সেই জীবনটাই কাটিয়েছেন ম্যারাদোনা।  না এটা কোন ল্যান্ডস্ক্যাপ জীবন না, এ জীবন গ্রাফিতির। তুমুল অস্থিরতা এবং তুমুল সৌন্দর্য; বিপ্লব ও সম্মোহন যেখানে হাতে হাত রেখে চলে। যে জীবন ‘হ্যান্ড অফ গড’ হয়ে প্রতিশোধ নেয় ফকল্যান্ড যুদ্ধের। 

আজ অনেক কথা হবে। ম্যারাদোনার মৃত্যু নিয়ে কথা হবে না এমন তো হতে পারে না! অনেকে অনেক কথা বলেছেন, বলবেন। যার সঙ্গে অমিমাংসিত এক লড়াইয়ের কোন সমাধান না করেই ম্যারাদোনা বিদায় নিলেন, সেই পেলে বলেছেন, একদিন তারা ‘আকাশে একসঙ্গে ফুটবল খেলবেন!’ আহা! সেটি নিশ্চয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত হবে! 

কিন্তু মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও এতটুকু ভুলিয়ে দিতে পারে না ম্যারাদোনাকে হারানোর যন্ত্রণা। কে ভেবেছিল মাত্র কদিন আগে অপারেশন টেবিলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফিরে আসা এই খেলুড়ে এভাবে চলে যাবেন। কিন্তু ম্যারাদোনা যে এমনই, রহস্যময়! এমন একজন, যাকে পৃথিবী একবারই পেয়েছিল। 

ফুটবল ইতিহাসে বহু কিংবদন্তির আগমন ঘটেছে। যাদের হাত ধরে প্রতি মুহূর্তে নান্দনিকতার চূড়া স্পর্শ করেছে ফুটবল। সামনেও হয়তো আরো অনেকে আসবে। কিন্তু সবার ভিড়ে একজন আলাদা, তিনি ম্যারাদোনা। ফুটবলের গোলকায়নের জন্য সবচেয়ে বড় অবদান তার। গোটা পৃথিবীর আকাশটাই যেন জীবিত থাকার সময়েই দখলে নিয়েছিলেন তিনি, ফুটবলকে করে তুলেছিলেন আলাদা একটি ধর্ম। বুয়েন্স আইরেস ও নেপলসের লোকেরা যে তার নামেই শপথ গ্রহণ করে। তবে কিং দিয়েগো কেবল মাঠে নন, মাঠের বাইরেও রাজা। যে রাজা কখনো প্রশংসায় ভেসেছেন, কখনো কাঁদতে কাঁদতে নিন্দা কাঁধে বেরিয়ে গেছেন। যার মাদকাসক্তি ভক্তদেরও ভাসিয়েছিল চোখের জলে। কিন্তু ম্যারাদোনা যে এমনই। যন্ত্রণা ও বেদনার সমস্ত শর্ত মেনে নিয়েই তাকে ভালোবাসতে হয়, তুমুল শত্রুপক্ষকেও তার সামনে নত হতে হয়। নয়তো ম্যারাদোনার বিপক্ষে খেলতে নামার আগে কেন ক্যামেরুনের খেলোয়াড়রা অমন পাগলের মতো কেঁদেছিলেন, চিৎকার করেছিলেন। কারণ একটাই, তার প্রতিপক্ষ দলে স্বয়ং ঈশ্বর খেলবেন। যার বাম পা মাঠে যেন বিটোভেনের সেভেন্থ সিম্ফোনির সুর রচনা করে, যার বাম পা হয়তো ভ্যান গঘের সেই রঙ-তুলি যা এঁকেছিল ‘দ্য স্ট্যারি নাইট’। সেই পা’ই হয়তো এলিয়টের ’দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ থেকে বিস্তৃত হয়েছে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড’ পর্যন্ত। পৃথিবীর সমস্ত কালজয়ী শিল্প-সাহিত্য-সংগীত এবং চিত্রকলাকে ম্যারাদোনা যেন একসুরে গেঁথেছিলেন মাঠে। 

ম্যারাদোনার সেই সুর থেমেছিল আরো আগে, কিন্তু তিনি তো ছিলেন। যদিও কিংবদন্তিরা মরে না, তাদের মৃত্যু নেই। তবে সত্যি হচ্ছে এখন থেকে তার পায়ের স্পর্শ আর পাবে না পৃথিবী, যার বাঁ পা হয়তো পৃথিবীর বুককে প্রতি নিয়ত গর্বিত করে তুলত। রবী ঠাকুর বলেছিলেন, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’। এই কথা তো ম্যারাদোনাকে নিয়েও বলা যায়। তার স্পর্শ না পেয়ে নিশ্চিতভাবেই পৃথিবী তার গরিমা হারাবে। হয়তো অপেক্ষা করবে আরো একজন দিয়েগোর। কিন্তু এমন কেউ কি বারবার আসে? এমন আরেক জোড়া পায়ের স্পর্শ পাওয়ার অপেক্ষা কি পৃথিবীর আদৌ শেষ হবে? যিনি সর্বকালের সেরা ফুটবলার হওয়ার পরও তারচেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠবেন?

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন