রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

প্রথম পাতা

ম্যারাদোনার প্রয়াণ

বণিক বার্তা ডেস্ক

ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাদোনা আর নেই। আর্জেন্টিনার তাইগ্রেতে নিজ বাড়িতে গতকাল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। কাকতালীয়ভাবে এমন এক দিনে মৃত্যু হলো, যে দিনটি ছিল ম্যারাদোনার দীর্ঘদিনের বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী।

কিছুদিন আগেও ৬০ পেরিয়ে ৬১-তে পা বাড়ানোর দিনটি ঘটা করেই উদযাপন করেছিলেন ম্যারাদোনা। এর কয়েকদিন পরই দুর্বলতা অবসাদ অনুভূত হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই সময় লা প্লাতা ক্লিনিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে ধরা পড়ে, তার মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধেছে। পরে চিকিৎসকরা সফল অস্ত্রোপচারও করেন। চলতি মাসের প্রায় পুরোটা সময় হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন তিনি। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় তাকে বাড়িতেও নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যেই গতকাল আকস্মিকভাবে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ বিজয়ী কিংবদন্তির জন্ম বুয়েনস এইরেসের লানুস শহরে ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর। দিয়েগো ম্যারাদোনা সিনিয়র দালমা সালভাদর ফ্রাঙ্কোর চতুর্থ সন্তান তিনি।

বস্তিবাসী দরিদ্র পরিবারের সন্তান ম্যারাদোনা ২৬ বছর বয়সে অবিশ্বাস্য অসামান্য ফুটবল খেলে নিজ দেশের জন্য বিশ্বকাপ জয় করে আনেন। বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষ আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের আজীবন ভক্ত হয়েছে শুধু তার খেলা দেখে। কারণেই ম্যারাদোনা অবসর গ্রহণের পর আর্জেন্টাইন জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সিটিকে তার সম্মানে চিরতরে উৎসর্গ করার কথাও ভাবা হয়েছে কিছুদিন। 

ম্যারাদোনার পর যারাই জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন, তাদের সবাইকে ঘিরেই অন্য রকম প্রত্যাশা উৎসাহ তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের ভক্তদের। এর কারণ একটাই জার্সিতে ম্যারাদোনা খেলতেন।

শৈশবেই ফুটবলের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে যান ম্যারাদোনা। যদিও তার পেশাদারি জীবনের শুরুটা খেলোয়াড় নয়, বলবয় হিসেবে। কাজটি ভালো লাগত, সেই সঙ্গে কিছু উপার্জনও হতো। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে যাত্রা ১৯৬৮ সালে, স্থানীয় দল এসত্রেয়া রোজার হয়ে। এরপর আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে যোগদানের মাধ্যমে সিনিয়র দলের অংশ হন তিনি। জাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পান ১৯৭৭ সালে। ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৬ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে খেলেন প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১৯৭৯ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে ১৮ বছর বয়সে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে অংশ নেন। ফাইনালে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। আসরে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে নজর কাড়েন ম্যারাদোনা।

১৯৮২ সালে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নামেন ম্যারাদোনা। তবে যেকোনো কারণেই হোক আলো ছড়াতে পারেননি। ব্রাজিলের সঙ্গে লাল কার্ড দেখে দ্বিতীয় পর্ব থেকেই বিদায় নেন।

চার বছর পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে দুর্দান্ত খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। মেক্সিকো বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই ভালো খেলছিল আলবিসেলেস্তেরা। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। দুই দেশের মধ্যে চার বছর আগেকার ফকল্যান্ড যুদ্ধের উত্তেজনার ঝাঁজ খেলাটি নিয়ে অন্য রকম উত্তেজনা তৈরি করেছিল দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটে গোল করেন ম্যারাদোনা। বল দখলের লড়াইয়ে শূন্যে লাফিয়ে নিজের চেয়েও ২০ ইঞ্চি লম্বা ইংরেজ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে পরাস্ত করে গোল করেন ম্যারাদোনা। রেফারি আলী বিন নাসের ধরতেই পারেননি হেড থেকে নয়, বাঁ হাতের আলতো ছোঁয়ায় বলটিকে জালের দিকে ঠেলে দিয়েছেন ম্যারাদোনা। পরে ভিডিও রিপ্লেতে বিষয়টি ধরা পড়লেও তা আর বদলের উপায় ছিল না। কারণ ততক্ষণে রেফারির বাঁশি বেজে গিয়েছে। গোল বাতিলের কোনো সুযোগ ছিল না। খেলাশেষে গোলটি নিয়ে ম্যারাদোনার মন্তব্য এখনো অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ওই গোলের উৎস ছিল কিছুটা মাথা, কিছুটা ঈশ্বরের হাত।

ঈশ্বরের হাতসংক্রান্ত ভবিষ্যতের যাবতীয় সমালোচনাকে ধামাচাপা দিতেই যেন ওই ম্যাচে অবিশ্বাস্য এক গোল করে বসেন ম্যারাদোনা। অসামান্য ড্রিবলিং আর বল নিয়ন্ত্রণের জাদু দেখিয়ে করা ম্যারাদোনার সে গোলটিকে বলা হয়, গত শতকের শ্রেষ্ঠ গোল।

এরপর সেমিফাইনাল-ফাইনাল সব জায়গায়ই ম্যারাদোনা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির ফুটবলাররা তাকে শুরু থেকেই কড়া নজরদারিতে রাখে। এর মধ্যেও তার পাসে জয়সূচক গোল করেন বুরুচাগা। - গোলের জয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। ওই আসরে আর্জেন্টিনার ১৪টি গোলের ১০টিতেই কোনো না কোনোভাবে অবদান ছিল ম্যারাদোনার। আসরে সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি হিসেবেও প্রশ্নাতীতভাবেই গোল্ডেন বল জিতে নেন তিনি। এর আগে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপেও গোল্ডেন বল জিতেছিলেন ম্যারাদোনা।

১৯৯০ বিশ্বকাপে আবারো সুযোগ এসেছিল। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বাধা অতিক্রম করতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। রানার্সআপ হয়েই শেষ হয় ম্যারাদোনার বিশ্বকাপ যাত্রা। এরপর এল দুঃস্বপ্নের ১৯৯৪ বিশ্বকাপ। নিষিদ্ধ মাদক এফিড্রিন নেয়ার দায়ে বিশ্বকাপ থেকে ম্যারাদোনাকে বহিষ্কার করে ফিফা। দ্বিতীয় পর্ব থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের পরই ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ম্যারাদোনা। পুরো ক্যারিয়ারে ৯১টি ম্যাচে ৩৪টি গোল করেছেন তিনি।

ক্লাব ক্যারিয়ারে খেলেছেন বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া, নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে। কোচিং ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল ছাড়াও তিনি দুবাইয়ের ক্লাব আল ওয়াসলের কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ দ্য জিমনাসিয়া ক্লাবের কোচ ছিলেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন